• বুধবার   ৩০ নভেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৯

  • || ০৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ভাসমান সবজি চাষের ‘নতুন পদ্ধতিতে’ সাফল্য

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২২  

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা মিত্রডাঙ্গাসহ কয়েকটি গ্রাম। বছরের একটি লম্বা সময় এসব এলাকা থাকে পানিবন্দি। এজন্য দীর্ঘদিন ধরেই সনাতন পদ্ধতিতে ভাসমান সবজি চাষ করে আসছিলেন স্থানীয় কৃষকরা। তবে বেডের আকার বড় হওয়ায় বাতাস ও পানির স্রোতে ভেঙে যেত সেসব বেড। এ অবস্থায় এগিয়ে আসে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। উদ্ভাবন করে নতুন পদ্ধতির চাষ। এসব বেডে বছর জুড়ে চাষ হচ্ছে সবজি, ফল, শাক ও মসলা। আর এতেই সুফল পেতে শুরু করেছেন চাষিরা।

কৃষি অধিদপ্তর জানায়, জেলার ৫ উপজেলার ১,৮০০ কৃষক ভাসমান বেডে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, ‘‘শত বছর ধরে জেলায় কচুরিপানার ভাসমান বেডে সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরাই এই পদ্ধতি ব্বের করেছেন। তবে তাদের বেডগুলো আকারে বড় হওয়ায় স্রোতে ও বাতাসে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এ নিয়ে তারা ভীষণ বিপাকে ছিলেন। ওই সময় তারা বেডে ঢেঁড়স, লাল শাক, ডাটাসহ পাতা জাতীয় সবজির আবাদ করতেন।''

‘‘তবে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পাঁচ বছর আগে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে ভাসমান কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করে সবজি ও মসলা চাষ গবেষণা সম্প্রসারণ এবং জনপ্রিয়করণ প্রকল্প নেয়। পরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে গবেষকরা কৃষকদেরও যুক্ত করে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে।''

‘‘শুরুতেই ছোট আকারের বেড তৈরি করে এতে পাতা, লতা , ফল ও মসলা জাতীয় ফসলের চাষাবাদ শুরু করেন। এতেই আসতে শুরু করে সফলতা।''

‘‘ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষ গবেষণা সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয় করণ প্রকল্পের'' পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘‘দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও কৃষি উৎপাদন ব্যহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্ষাকালেও জমির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার এই প্রকল্প নেয়। গত পাঁচ বছর ধরে আমরা ভাসমান কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি। সেখানে সাফল্যও এসেছে।'' 

সম্প্রতি টুঙ্গিপাড়া উপজেলার মিত্রডাঙ্গা গ্রামে ভাসমান কৃষির আধুনিক প্রযুক্তির চাষাবাদ পরিদর্শন করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব রবীন্দ্র শ্রী বড়ুয়া।

সেখানে তিনি স্থানীয় কৃষক, গবেষক ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।

এই কর্মকর্তা জানান, এই সফলতার বিষয়টি তিনি দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করবেন। ভাসমান কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারিত হলে দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত সম্ভব হবে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গোপালগঞ্জ সরেজমিন গবেষণা বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মহসীন হাওলাদার এবং এইচ.এম খায়রুল বাসার বলেন, ‘‘গোপালগঞ্জের বেশিরভাগ জমি বছরের আট মাসই পানির নিচে থাকে। আগে এই জমিতে এক ফসল বোরো ধান উৎপাদিত হতো। এ কারণে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে জলজ জঞ্জাল কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে কৃষক পানির ওপর ভাসমান বেড তৈরি করেন। সেখানে চাষাবাদ করে পাতা জাতীয় সবজি উৎপাদন করতেন।  এতে তারা পারিবারিক প্রায়োজন মেটাতে পারতেন। আমরা ভাসমান বেডে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি কৃষককে শিখিয়ে দিয়েছি।''

‘‘এসব বেডে এখন কৃষকরা তরমুজ, বাঙ্গি, পেঁয়াজ, মরিচ, আদা, হলুদ, শসা, লাউ, কুমড়া, টমেটো, ঢেঁড়ম, চিচিঙ্গা, ফুলকপি, ঝিঙে, বাঁধাকপি, ব্রোকলি, লাল শাক, ঘি-কাঞ্চন শাক, পালংশাকসহ বিভিন্ন ফসল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছেন। এগুলো নিজেরা খাচ্ছেন। বাড়তি ফসল বাজারে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছেন। এই পদ্ধতির চাষাবাদ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।''

মিত্রডাঙ্গা গ্রামের কৃষক শক্তিপদ কীর্ত্তনীয়া (৬৫) বলেন, ‘‘আমরা ১৫-২০ জন কৃষক সারা বছর ভাসমান বেডে আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করি। যে ফসল উৎপাদিত হয় তা বাজারে বিক্রি করে আয় করতে পারি। আমাদের দেখাদেখি অনেকেই সারা বছর ভাসমান বেডে চাষাবাদে ঝুঁকছেন। এই পদ্ধতির চাষাবাদে বিষমুক্ত নিরাপদ ফসল উৎপাদিত হয়। তাই বাজারে আমাদের ফসলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।''

মিত্রডাঙ্গা গ্রামের কৃষাণী চম্পা কীর্ত্তনীয়া (৫০) বলেন, ‘‘আগে বাপ-দাদার দেখানো পদ্ধতিতে ভাসমান বেডে চাষাবাদ করতাম। সেখানে ফসল তেমন ভাল হতো না। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করার পর ফসল ভালো হচ্ছে। আমরা এখন ভালো আছি।''

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব রবীন্দ্র শ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘‘গোপালগঞ্জে ২২৯টি বিল ও জলাভূমি রয়েছে। বর্ষাকালে এগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। এখানে প্রচুর কচুরিপানা পাওয়া যায়। তাই কচুরিপানা দিয়ে পানির ওপর ভাসমান বেড তৈরি করে ২২৯টি বিল ও জলাশয়ে  চাষাবাদ সম্প্রসারণ করতে পারলে এই জেলা থেকে উৎপাদিত ভাসমান বেডের সবজি দেশের বিশাল একটি অংশের সবজির চাহিদা মেটাতে পারবে।''

তিনি আরও বলেন, ‘‘এই পদ্ধতির চাষাবাদে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কচুরি দিয়ে বেড তৈরির অধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। এখানে এই চাষাবাদে ওইসব আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করার সুপারিশ করা হবে। আমি ভাসমান বেডে চাষাবাদ এলাকা পরিদর্শন করেছি। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছি। এটি আমি নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করবো। তারা এই চাষাবাদের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে এই পদ্ধতির চাষাবাদ ভূমিকা রাখবে।''

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ