সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনে ভোটের সমীকরণে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সামনে এসেছে। সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী এই আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের তুলনায় বেশি। ফলে নির্বাচনী প্রচারণা ও নারী ভোটারদের গুরুত্ব আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
৫৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনে রয়েছে ২২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা। এবারের নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১১ হাজারে। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭২ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৪ জন। গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৫ জন। সে সময় পুরুষ ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪৪ হাজার ৯০৩ জন এবং নারী ভোটার ছিলেন ২ লাখ ৪২ হাজার ২৬৮ জন। অর্থাৎ গত নির্বাচনের তুলনায় এই আসনে নারী ভোটার বেড়েছে ১ হাজার ৫১৯ জন। নারীভোটার বৃদ্ধি ও তাদের অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত এবার নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
ভোটার তালিকার এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে নির্বাচনী মাঠেও। বড় সমাবেশের পাশাপাশি এখন গ্রামভিত্তিক উঠান বৈঠক, পাড়া-মহল্লার ঘরোয়া সভা ও ছোট পরিসরের আলোচনায় গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা। এসব আয়োজনের একটি বড় অংশজুড়ে থাকছেন নারী ভোটাররা। এসব বৈঠকে নারীরা তাদের দৈনন্দিন সমস্যা, সংসার ও সামাজিক জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরছেন। প্রার্থীরাও এসব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছেন এবং নিজেদের পরিকল্পনার কথা জানাচ্ছেন। আর নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, নারীর নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নারী ভোটারদের ভোটের আগ্রহ বাড়াতে বিভিন্ন এলাকায় আলাদা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী নেত্রীদের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যাতে নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হয়। কোথাও কোথাও উঠান বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হচ্ছে নারীদের সুবিধা অনুযায়ী।
আকচা, সালান্দর ও রুহিয়া ইউনিয়নের কয়েকজন নারী ভোটার ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবারের নির্বাচন আমাদের আগ্রহ আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা খুব একটা আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসতেন না, কিন্তু এবার উঠান বৈঠক ও ঘরোয়া আলোচনার মাধ্যমে সরাসরি কথা বলা হচ্ছে। এতে আমরা নিজেদের কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি। স্বাস্থ্যসেবা, সন্তানের শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো আমরা তুলে ধরতেছি।
শহরের গোয়ালপাড়, টিকাপাড়া ও হাজিপাড়া এবং আশ্রমপাড়া এলাকার কয়েকজন নারী ভোটার ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের গুরুত্ব দেওয়ায় আমরা ভালোভাবে বিষয়টি নিয়েছি। প্রার্থীরা এখন শুধু বড় সমাবেশে সীমাবদ্ধ না থেকে মহল্লাভিত্তিক সভা ও ছোট পরিসরের আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। এসব আলোচনায় কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সুবিধার মতো বিষয় উঠে আসছে। ফলে কাকে ভোট দেবো সে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা আগের তুলনায় বেশি সচেতন হচ্ছি।
বিএনপি-জামায়াতের কয়েকজন নেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে এবারের নির্বাচনী বাস্তবতা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন। ভোটার তালিকায় নারী ভোটার সংখ্যায় এগিয়ে আছেন এবং এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সে কারণে প্রচারণার কৌশলেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে বড় সমাবেশ ও পুরুষ ভোটারকেন্দ্রিক প্রচারণা ছিল মুখ্য।
তারা আরও বলেন, তবে এবার মাঠের চিত্র বদলেছে। গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের মহল্লা পর্যন্ত নারী ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। উঠান বৈঠক, ঘরোয়া আলোচনা ও ছোট পরিসরের সভার মাধ্যমে নারী ভোটারদের মতামত শোনা এবং তাদের ভোটকেন্দ্রমুখী করতে কাজ চলছে। নারী ভোটাররা এখন শুধু সংখ্যায় বেশি নন, তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আগের তুলনায় সচেতন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো তাদের ভোটের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে মাঠপর্যায়ে নারী নেত্রীদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় তিনটি সংসদীয় আসনে এবার মোট ২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে দুইজন নারী প্রার্থী রয়েছেন। ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দুইজন প্রার্থী নির্বাচনে লড়ছেন। ঠাকুরগাঁও-২ আসনে, যা বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা, হরিপুর উপজেলা ও রানীশংকৈল উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত, সেখানে একজন নারীসহ সাতজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। আর ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে, যা পীরগঞ্জ ও রানীশংকৈল উপজেলা নিয়ে গঠিত, সেখানে একজন নারীসহ মোট ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তিনটি সংসদীয় আসন মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলায় এবার মোট ভোটার সংখ্যা ১২ লাখ ৫৫ হাজার ১৭ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৪৮৮ জন, পুরুষ ভোটার ৬ লাখ ৭০ হাজার ২২ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৭ জন।
এদিকে পোস্টাল ব্যালট পেপারে ভোট দেওয়ার জন্য জেলায় নিবন্ধন করেছেন ১০ হাজার ২৯২ জন ভোটার। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ হাজার ৩২৬ জন এবং পুরুষ ভোটার ৭ হাজার ৯৬৬ জন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জেলার ৪১৭টি ভোটকেন্দ্রের ২ হাজার ৩৩৬টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সেদিন ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার ও জেলা প্রশাসক ইসরাত ফারজানা বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সর্বশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি। আমরা আশা করি, সব ভোটার শান্তিপূর্ণভাবে এবং নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ভোট দেবেন। ভোটকেন্দ্রে নারীসহ সব ভোটারের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদানের জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ করা হয়েছে। এ ছাড়া, ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও কোনো ধরনের অশান্তি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট









