সংগৃহীত
ঢাকার বাসিন্দাদের যে কত মারাত্মক অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে ভবনগুলোতে বসবাস করতে বাধ্য হতে হচ্ছে, শুক্রবার উত্তরার একটি ভবনে তিন শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু ও সাতজনের আহত হওয়ার ঘটনা এর বড় দৃষ্টান্ত। ছয়তলা ভবনটিতে আগুন নেভানোর কোনো সরঞ্জাম ও বিকল্প সিঁড়ি ছিল না। ছাদ ছিল তালাবদ্ধ। প্রাণ বাঁচাতে ছাদে উঠতে গিয়ে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ভাড়াটেদের মৃত্যু হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে শুক্রবার সকালে ভবনটির দোতলায় আগুনের সূত্রপাত হয় এবং তিনতলা পর্যন্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের দোতলার একাংশ এবং তৃতীয় তলা মিলে ‘ডুপ্লেক্স’। সেখানে কাঠের সিঁড়ি আছে। এ কারণে আগুন সহজেই তৃতীয় তলায় পৌঁছে যায়। বাসাটিতে প্রচুর আসবাব থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ফায়ার সার্ভিস আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভবনটির বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা জানান, দোতলা ও তিনতলায় আগুন সীমাবদ্ধ থাকলেও ধোঁয়া বের হওয়ার কোনো পথ না থাকায় ওপরের দিকে উঠতে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ১৩ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা ছয়জনকে মৃত ঘোষণা করেন। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়েই তাঁদের মৃত্যু হয়।
উত্তরার অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিরা দুটি পরিবারের। একটি পরিবারের মা–বাবা ও সন্তান এবং অন্য পরিবারের বাবা, সন্তান ও ভাতিজি নিহত হন। আমরা মনে করি, স্বজনদের এই শোক ও ক্ষতি অপূরণীয়। জীবিত স্বজনদের এই ট্র্যাজেডি আজীবন তাড়া করে বেড়াবে।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, উত্তরার অগ্নিকাণ্ডে এমন মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল। ভবনটিতে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে, ছাদে ওঠার গেট খোলা থাকলে এবং ধোঁয়া নির্গমনের পথ থাকলে এমন ট্র্যাজেডি ঘটতে পারত না। এই দুর্ঘটনা ও হতাহতের পেছনে ভবনমালিকের দায় ও গাফিলতি তদন্ত করে বের করতে হবে।
শুধু উত্তরার এই ভবন নয়, রাজধানীর অনেক ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাখ লাখ মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে। চুরি, ডাকাতির মতো অপরাধের কথা বিবেচনায় অনেক ভবনে ছাদের গেট, রাতের বেলা প্রধান গেট তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। চাবি থাকে শুধু মালিকের কাছে। ফলে দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে ভবন থেকে বের হওয়ার উপায় থাকে না। এটি নিশ্চিত করে নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উত্তরার অগ্নিকাণ্ড ঢাকার নাগরিকদের মধ্যে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এবার গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানীতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হওয়ার সংকেত দিচ্ছে। গত অক্টোবর মাসে মিরপুরে পোশাক কারখানা ও রাসায়নিকের গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহত হন। সেই অগ্নিকাণ্ডেও এত মৃত্যুর একটি বড় কারণ ছিল ছাদের দরজা তালাবদ্ধ রাখা।
ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়টা অগ্নিকাণ্ডের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। পুরান ঢাকার নিমতলী থেকে শুরু করে মাইলস্টোন কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান ভেঙে পড়া—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ফায়ার সার্ভিসের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, রাজধানীর ৫৪ শতাংশের বেশি বহুতল ভবন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে।
উত্তরার অগ্নিকাণ্ড ঢাকার ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে। আগুন লেগে তালাবদ্ধ ভবনে নাগরিক মৃত্যুর এই মিছিল বন্ধ করতেই হবে।
সূত্র: প্রথম আলো









