সংগৃহীত
একটানা টানা হচ্ছে হাপর। সেই বাতাস পেয়েই কয়লার স্তূপ থেকে গনগনে আগুন ঠিকরে বের হচ্ছে। সেই আগুনে পুড়িয়ে লাল টকটকে করা লোহায় পড়ছে ভারী হাতুড়ির সজোর আঘাত। লোহায় লোহায় টুং-টাং শব্দের সেই চেনা ছন্দই বলে দিচ্ছে, দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। কোরবানি ঈদ আসলে দেশের সব কামার পট্টিগুলোতে কর্মচঞ্চলতা দেখা দেয়।
তাদের হাতুড়ির প্রতিটি আঘাতে আকৃতি পাচ্ছে ছুরি, চাপাতি, দা আর বঁটি। আগুনের তীব্র গরমে কারিগরদের শরীর বেয়ে নামছে ঘাম, কপালে ক্লান্তির রেখা। তবুও ক্লান্তি ভুলে কাজ করে চলেছেন তারা। যদিও এখনও সেভাবে জমেনি রাজধানীর কামারপট্টিগুলো। আরও কয়েক দিন পর অর্থাৎ ঈদের ৫/৭ দিন আগে খুব জমজমাট থাকবে এসব কামারপট্টিগুলো।
বছরের বাকি সময়টা অলস কিংবা ম্লান কাটলেও, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই ভোল বদলে যায় দেশের কামারশালাগুলোর। ঢাকার কারওয়ান বাজার, খিলগাঁও, ভাটারা কিংবা ধোলাইখালের কামারপট্টিগুলো কয়েকদিনের মধ্যে জমজমাট হয়ে উঠবে। যদিও এখন উৎসবের আমেজে সেভাবে লাগেনি, তবে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিছু কিছু কাজ আসছে। কেউ আসছেন নতুন ছুরি-চাপাতি বানানোর অর্ডার দিতে, কেউবা পুরোনোগুলোতে শান দিয়ে চকচকে করে নিতে।
সব মিলিয়ে কোরবানির পশু জবাই এবং মাংস কাটার সরঞ্জামের চাহিদা এখন কেবল শুরু হচ্ছে মাত্র। তবে কারিগররা জানালেন, লোহা ও কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার প্রতিটি উপকরণের দাম অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি দাম লাগবে।
রাজধানীর ভাটারা এলাকায় কামার শিল্পের ব্যবসা ১০ বছর ধরে করছেন কমল সরকার। এর আগে তার দোকান ছিল বাড্ডা এলাকায়।ব্যবসার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কমল সরকার বলেন, বছরের অন্য সময়টা প্রায় ফাঁকাই যায়। কিন্তু ঈদের এই ৭ দিন আমাদের প্রচুর চাপ থাকে। এখনও সেভাবে কাজ শুরু হয়নি। তবে ঈদের ৭ দিন প্রচুর কাজ আসবে।
এবারে কোরবানি সময় দা, বটি, চাপতি এসবের দাম কেমন যাবে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাজের মূল উপকরণ রেলের লোহা, আর পাথরের কয়লা। লোহা এখন কিনতে হচ্ছে কেজি বেশি দরে আর পাথর কয়লা প্রতি বস্তার দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে অনেক। দামও আগের চেয়ে বেশি না ধরলে, টেকা যাবে না।
বাজারের দরদাম সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে তিনি জানান, এবার বাজারে একটি ভালো মানের চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায়। চামড়া ছাড়ানোর ছোট ছুরি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং পশু জবাইয়ের বড় ছুরি মিলছে ৫০০/৬০০ টাকার মধ্যে। এছাড়া দা ও বঁটি পাওয়া যাচ্ছে ৪০০ থেকে ১০০০ টাকায়।
লোহা, কয়লা আর ঘামের এই চিরচেনা লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই ঢাকার কামারপট্টিগুলো জানান দিচ্ছে, কোরবানি ঈদ আর বেশি দূরে নেই। এরমধ্যে বনানী এলাকা থেকে এই ভাটারার কামারপট্টিতে এসেছেন খায়রুল আলম। তিনি বনানীর একটি বাসার ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করেন।
খায়রুল আলম বলেন, আমার স্যাররা ঢাকায় কোরবানি দেয়। গতবছর কোরবানির জন্য দা, ছুরি, বটি, চাপাতি সহ প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কেনা হয়েছিল। সামনে কোরবানি ঈদ আসছে, কামারপট্টিগুলোর ব্যস্ততা বেড়ে যাবে, তাই একটু আগেভাগেই স্যার পাঠিয়েছেন এগুলো শান দিয়ে চকচকে করে নিতে। সঙ্গে দুই একটি নতুন জিনিসও কিনবো। তবে দেখছি দাম আগের চেয়ে অনেক বাড়তি।
হাঁপড়ে পোড়া লাল টকটকে লোহার বুকে একের পর এক পড়ছে ভারী হাতুড়ির ঘা। ছিটকে বেরোচ্ছে আগুনের ফুলকি। সেই ফুলকির আলোয় দেখা যায় কারিগরের কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম। এটি শুধু লোহা পেটানোর শব্দ নয়, এ যেন বাপ-দাদার পুরোনো ঐতিহ্যকে সম্বল করে বেঁচে থাকার এক নীরব আকুতি। তবে বর্তমানে বাজারের বাস্তবতা, শপিং মল থেকে শুরু করে ফুটপাত, সবখানেই এখন সয়লাব চকচকে, আধুনিক ও রেডিমেড চাইনিজ দা-ছুরি আর চাপাতিতে। মেশিনে তৈরি এসব বিদেশি পণ্যের ফিনিশিং যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি দামেও কামারদের দেশি লোহার তৈরি জিনিসের প্রায় সমান। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশই এখন ঝুঁকে পড়ছেন ওইসব চাকচিক্যের দিকে। আধুনিকতার এই জোয়ারে ম্লান হয়ে যাচ্ছে কামারশালার কয়লার আগুন, চরম সংকটে পড়েছে তাদের বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরে রাখা এই মানুষগুলো। কোরবানি ঈদ এলে কয়েকদিন একটু ব্যস্ততা বাড়লেও, বছরের বাকি সময়টাতে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ যেন চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে এই কামারপট্টির এক দোকানি উত্তম কুমার বলেন, এই ব্যবসা আমার দাদা, বাবা করেছে, এখন আমি করছি। কিন্তু এখন বাজার ভরে গেছে চকচকে চাইনিজ জিনিসে। মানুষ ওইসব সুন্দর জিনিস দেখে কিনে নেয়, আমাদের কষ্ট বোঝে না। তারা বোঝে না যে, মেশিনে তৈরি ওইসব চাকচিক্য জিনিসের ধার বেশিদিন থাকে না, কিন্তু আমাদের হাতুড়ি পেটানো খাঁটি লোহার জিনিস বছরের পর বছর টিকে থাকে। বর্তমানে আমাদের বাজার খুব খারাপ হয়ে গেছে। বলতে গেলে এখন টিকে থাকাই কঠিন।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট




.jpg)







