মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১

পুরো বাজেটই গরিবের জন্য : অর্থমন্ত্রী

পুরো বাজেটই গরিবের জন্য : অর্থমন্ত্রী

২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পুরোটাই গরিব মানুষের জন্য বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, ‘দেশের মানুষের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও আমরা সাত লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হব না। সরকারের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা রয়েছে।

জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের পরদিন সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁকে উত্তর দিতে সহায়তা করতে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, অর্থসচিব ফাতেমা ইয়াসমিন প্রমুখ।

নির্বাচন ও বাজেট প্রসঙ্গ : নির্বাচনী বছরে জনতুষ্টির প্রচেষ্টা বাজেটের মাধ্যমে চালানোর বিষয়ে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘নির্বাচন আর বাজেট পরস্পর সম্পর্কিত। বাজেট নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য উপকারী হতেই পারে।

আমি আগেই বলেছি, আমাদের বাজেট হচ্ছে দেশের মানুষের জন্য আর নির্বাচনও হচ্ছে দেশের মানুষের জন্য।’ সরকার সব বাজেটেই পরবর্তী নির্বাচনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এতে অন্যায় কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন কৃষিমন্ত্রী।

আইএমএফের পরামর্শে বাজেট করা হয়নি : এই বাজেটে আইএমএফের শর্ত পূরণের চেষ্টা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেট আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ মেনে করা হয়নি।

আমাদের নিজেদের প্রয়োজন মোতাবেক করা হয়েছে, তবে সংস্থাটির যেসব পরামর্শ আমাদের জন্য ভালো কিংবা গ্রহণযোগ্য, সেগুলো নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশও সেটা করে থাকে।’ মুস্তফা কামাল বলেন, ‘অনেকেই বলছেন, আমরা ঋণ নিয়ে চলছি।

আইএমএফ থেকে সর্বশেষ যে ঋণ নেওয়া হয়েছে এই অর্থ আমাদের প্রবাসীরা দুই মাসেই দেশে প্রেরণ করেন। অর্থাৎ দুই মাসের রেমিট্যান্সের অর্থ আমরা ঋণ নিয়েছি। এটা খুব একটা বেশি নয়।’

আমরা দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষকে চাকরি দিয়েছি : অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দুই কোটি মানুষের চাকরির ব্যবস্থার জন্য বলেছিলাম। আমরা দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষকে চাকরি দিয়েছি। এটা খারাপ না, আমাদের ভালোই অর্জন। আস্তে আস্তে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং কর্মসংস্থানের পরিধিও বেড়ে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।’

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম জানান, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তখন দেশে মোট কর্মসংস্থানের পরিমাণ ছিল চার কোটি ৭৩ লাখ। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে সাত কোটি ১১ লাখ। এই সময়ে প্রায় তিন কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মেড ইন বাংলাদেশ : তিনি বলেন, ‘আমি চাকরির ব্যাপারে যেসব কমিটমেন্ট বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাজেটে করেছিলাম সেগুলো দিয়েছি। আমরা মেড ইন বাংলাদেশ কালচারটা জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছি। এ দেশে যা জিনিস তৈরি হবে, তা দিয়ে আমাদের প্রয়োজন মিটবে। এর মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’

আমরা ফেল করিনি, করব না : সংবাদ সম্মেলনে অতীতের বাজেটের ধারাবাহিকতায় সফলতা অর্জনে এবারও আশাবাদ ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত পাঁচ বছরের বাজেটে আমাদের প্রজেকশন কী ছিল, আমরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি, তা অ্যানেক্স (সংযুক্তি) হিসেবে দিয়েছি। আমরা ফেল করিনি। ইনশাআল্লাহ এবারও ফেল করব না, আগামী দিনেও আমরা ফেল করব না। এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।’

মানুষের কর্মদক্ষতা ও দায়বদ্ধতার ওপর ভর করেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান জানিয়ে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘সব কিছুর মূলে হচ্ছে এ দেশের মানুষ, জনগোষ্ঠী—তাদের কর্মদক্ষতা, দেশের প্রতি তাদের মায়া-মমতা, মানুষের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, এটা অসাধারণ এক উদাহরণ আমি মনে করি। সে জন্য আমার বড় বিশ্বাস, আপনার মতো করে আমি বিশ্বাস করি যে আমাদের পরাজয় নেই। আমরা বিজয়ী হবই হব।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখানে যারা উপস্থিত হয়েছি প্রত্যেকের দেশপ্রেম আছে। দেশপ্রেম আছে বলেই আমরা বারবার বিজয়ী হয়েছি। আমরা ফেল করি না।’

মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে রাখা সম্ভব : দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের মধ্যে রাখা সম্ভব উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘যখন আমরা ক্ষমতায় আসি, তখন মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশ। এরপর সেটি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। করোনা অতিমারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্বে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে; কিন্তু সম্প্রতি বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমতে শুরু করায় সেটি ৬ শতাংশে রাখা সম্ভব হবে।’ মূল্যস্ফীতি নিয়ে সরকারও শঙ্কিত উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বিশ্বই এখন মূল্যস্ফীতিতে ভুগছে। আমরা খাবার তো বন্ধ করতে পারব না। মানুষকে খাবার না দিয়ে রাখা যাবে না। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি।’ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচুর খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব : মুস্তফা কামাল বলেন, আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে যেসব পদক্ষেপ বা প্রাক্কলন গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। যেটা বাদ আছে সেটা আগামী দিনে করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তাহলে আমরা যেখানে এখনো পৌঁছতে পারেনি, সেখানে পৌঁছতে পারব।’

একজনও কালো টাকা সাদা করেনি : গত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও এবারের বাজেটে এ ধরনের কোনো সুযোগ কেন রাখা হয়নি—জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত বছরের বাজেটে বলেছিলাম, কেউ যদি অপ্রত্যাশিত টাকা দেশে নিয়ে আসে, তাহলে সেই টাকার কোনো কর দিতে হবে না। গত বাজেটে এ সুযোগটি দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রত্যাশিত টাকা বাংলাদেশে আসেনি। তাই এবারের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়নি।’

রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে ২০০০ টাকা বাধ্যতামূলক : টিআইএনধারীদের দুই হাজার টাকা রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার সমালোচনা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারাই আগে বলতেন, এ দেশে মিডল ইনকাম জনসংখ্যার হার বেশি, কিন্তু তারা ট্যাক্স দেয় না। এরা সবাই যদি ট্যাক্স দিত তাহলে অন্যদের ভাগে কম ট্যাক্স দিতে হতো। আমি মনে করি, এখন সময় এসেছে সবাইকে ট্যাক্স পেমেন্ট করতে হবে।’

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী এনবিআর চেয়ারম্যানকে উত্তর দিতে বললে আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করযোগ্য নয়—এমন ব্যক্তিদের রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে টিআইএন সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যেমন—আমদানি-রপ্তানিকারক কিংবা বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছে। গরিব মানুষের জন্য কিন্তু টিআইএন বাধ্যতামূলক নয়।’

সরকার ব্যাংক থেকে টাকা নিলে সমস্যা হবে না : ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার ঋণ নেবে বলে লক্ষ্য ঠিক করেছে। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সমালোচনা প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছেন, এই ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে কোনো সমস্যা হবে না। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতিও বাড়বে না।

গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার সংকট মোকাবেলায় প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজারে বিক্রি করেছে। তার মানে দুই লাখ কোটি টাকা বাজেট থেকে সেন্ট্রাল ব্যাংকে ঢুকে গেছে। এই টাকা যদি বাজারে থাকত তাহলে সরকারের এক লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া কোনো বিষয় হতো না। এখন যেহেতু বাজারে তারল্য সংকট রয়েছে, সে জন্য সরকার বন্ডের মাধ্যমে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়লে যে মূল্যস্ফীতি বাড়বে তার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ দুই লাখ কোটি টাকা তুলে এনে ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়লে টাকার সরবরাহ (ক্যাসেল আউট) কম থাকছে।

গভর্নর বলেন, ‘আমাদের মানি সাপ্লাই যদি দেখেন ওয়ান অব দ্য লোয়েস্ট এই রিজিওনের মধ্যে। জিডিপির মাত্র ৪০ শতাংশ মানি সাপ্লাই। যেটা ইন্ডিয়াতে ডাবল, ৭৬-৭৭ শতাংশ। থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়াতে প্রায় ১০০ শতাংশ। তাই সরকার ঋণ নিচ্ছে বলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, এটা ঠিক নয়। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে বিশ্ববাজারে তেলের দাম, গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে।

পুঁজিবাজার প্রসঙ্গ : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পুঁজিবাজারের বিষয়ে বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের বিষয়ে সুস্পষ্ট করে কোনো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ না থাকলেও বাজার গতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার সেটি নিয়মিত করে যাচ্ছে।’

গত বৃস্পতিবার সংসদে উপস্থাপিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয় সাত লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ঠিক করা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। প্রসঙ্গত, প্রস্তাবিত বাজেট ২৬ জুন অনুমোদিত হবে। আর ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হবে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: