শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ

সংগৃহীত

দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি, টেকসই এবং দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে শিল্পায়নকে গুরুত্ব দিয়ে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় একশর মতো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বেশ কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতিমধ্যে চালুও হয়ে গেছে, যেখানে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্প-কারখানা। আরও বেশ কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে চলেছে পূর্ণ মাত্রায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সিরাজগঞ্জে স্থাপিত এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এটি পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এ কারণে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামও দেওয়া হয়েছে সিরাজগঞ্জ গ্রিন ইকোনমিক জোন। যতটুকু জানা গেছে, তাতে এটি হবে দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল।

যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে ১ হাজার ৮১ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে মোট শিল্প প্লটের সংখ্যা রাখা হয়েছে ৪০০টি। এ ছাড়াও থাকবে খেলার মাঠ, জলাধার, বন, বিনোদনকেন্দ্র, হাসপাতাল, কারিগরি ইনস্টিটিউট বা প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সোলার প্যানেল পার্কসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। জাপান ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের প্রকৌশল ও কারিগরি সহায়তায় এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এস্কয়ার, এপেক্স, প্যারাগন এবং কন্টিনেন্টালসহ মোট ২৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প স্থাপনের জন্য প্লট বরাদ্দ নিয়েছে। কয়েকটি বড় প্লট নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য।

যেহেতু বিশেষ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের সুযোগ হিসেবে গড়ে তোলা হবে, তাই এখানে মোট জমির প্রায় ৪০ শতাংশ উন্মুক্ত রাখা হবে, যেখানে সবুজের বেষ্টনী গড়ে তোলা হবে। এখানে থাকবে উন্নত মানের কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জ্য পরিশোধনের সুব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বা রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত সব প্রতিষ্ঠান শতভাগ ভূমির উপরিভাগের বা সারফেস ওয়াটার ব্যবহার করতে পারবে। যেহেতু যমুনা নদীর কোল ঘেঁষে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে, তাই এই নদীর পানি ব্যবহার করা যাবে। এমনকি অত্যাধুনিক পানি শোধনাগার বা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ব্যবস্থা থাকায় এখানকার কারখানায় ব্যবহৃত পানি শোধনের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করে তোলা হবে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির কোনো প্রয়োজনই হবে না। মোটকথা, যমুনা নদীর পারে প্লাটিনাম গ্রিন কনসেপ্টে সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে।

বিশেষভাবে নির্মিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে এমনিতে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা থাকে, যা মূলত বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য প্রদান করা হয়ে থাকে। এসব বাড়তি সুযোগ-সুবিধা অবশ্যই সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে থাকবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এসব সুযোগ-সুবিধার বাইরেও সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের আছে আরও বেশ কয়েকটি অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা যা অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে সেভাবে দেখা যায় না। এসব অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-১. সড়ক, রেল এবং নৌপথের সমান্তরাল যোগাযোগ সুবিধা; ২. সৌর এবং বায়ুবিদ্যুৎ ব্যবহারের একান্ত সুযোগ; ৩. উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত কাঁচামাল ব্যবহারের সুযোগ; ৪. তুলনামূলক সস্তা এবং পরিশ্রমী শ্রমের সরবরাহ; ৫. জীবনযাত্রার ব্যয় অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় মজুরি হারও কম; ৬. ঐতিহাসিকভাবেই ব্যবসায়ী অধ্যুষিত এলাকা এবং ৭. ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে ঢাকা থেকে অফিস করার সুযোগ।

সিরাজগঞ্জের যে এলাকায় এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করা হচ্ছে সেখান থেকে দেশের সর্বত্র, বিশেষ করে স্থল ও সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে বহুমুখী যোগাযোগের সুবিধা বিদ্যমান। শুধু তাই নয়, এখান থেকে সড়ক এবং রেলপথে দেশের যেকোনো স্থানে বা বন্দরে মাত্র চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এর বাড়তি সুবিধা হিসেবে থাকছে নৌপথে যোগাযোগের সুবন্দোবস্ত। যমুনা নদীর পার ঘেঁষে এই অঞ্চল গড়ে উঠেছে ফলে মাত্র ১২-২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নৌপথে ঢাকা, চট্টগ্রাম শহর এবং সমুদ্রবন্দরে পৌঁছা সম্ভব হবে। শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি রেলপথ এবং নৌপথের যোগাযোগ থাকা যেকোনো মাপের বিশেষ সুবিধা তা বলে শেষ করা যাবে না। কেননা বিশাল পরিমাণ পণ্যসামগ্রী সবচেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে পরিবহনের মাধ্যম হচ্ছে রেলপথ এবং নৌপথ। এ দুটো সুবিধাই পুরোমাত্রায় বিদ্যমান সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে। বঙ্গবন্ধু সেতুর উত্তরে বিশেষ রেল সেতু নির্মাণ হওয়ায় এই রেল যোগাযোগের সুযোগ এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এখন যদি রেলপথ এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া যায় তা হলে তো আর কথাই নেই। আমদানি করা কাঁচামাল বন্দরে খালাস হওয়ার পর সরাসরি ট্রেন বা কার্গোর মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চলে আসবে। আবার এই অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য এখানকার ফ্যাক্টরি থেকে রেলে বা কার্গো যোগে সরাসরি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বা রফতানির জন্য সরাসরি বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে পরিবহন ব্যয় এবং সময় দুটোই পর্যাপ্ত পরিমাণে হ্রাস পাবে, যা শিল্পায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। 

এমনকি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিমানবন্দরে নামার পর মাত্র এক ঘণ্টার ড্রাইভে সড়কপথে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে পৌঁছে যেতে পারবে। ঢাকা থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার সড়কপথের দূরত্ব হওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, নির্বাহী এবং সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট ঢাকা থেকেই অফিস করতে পারবেন। এতসব বহুমুখী বিশেষ সুযোগ-সুবিধা অন্য কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যমান আছে কি না আমার জানা নেই।

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, নৌপথের সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে হলে যমুনা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। যমুনা দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং সবচেয়ে খরস্রোতা নদী হলেও এখন মৃতপ্রায়। আমরা ছোটবেলায় যে যমুনা দেখেছি তা এখন শুধুই গল্প। চৈত্র মাসেও নদীর একূল-ওকূল দেখা যেত না এবং নদীর স্রোতের গর্জন এক মাইল দূর থেকে শোনা যেত। অথচ চৈত্র মাসে সেই নদী বলা চলে হেঁটেই পার হওয়া যায়। এক প্রজন্মে একসময়ের খরস্রোতা নদীর এমন মৃতপ্রায় অবস্থা একেবারেই অবিশ্বাস্য। 

শুধু কিছু অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণেই আজ যমুনা নদীর এই করুণ অবস্থা। তারপরও সব শেষ হয়ে গেছে এমনটা বলা যাবে না। এখনও কিছু পদক্ষেপ নিয়ে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য অবশ্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। বর্তমান সরকার যেহেতু আগামী একশ বছরের উন্নয়নের পরিকল্পনা মাথায় রেখে ডেল্টা প্রকল্প হতে নিয়েছে, তাই সেই প্রকল্পের সঙ্গে এই যমুনা নদী সংস্কার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করলে দেশ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগতভাবে লাভবান হবে। ড্রেজিং এবং খনন করে নদীর প্রবাহ বা চ্যানেলগুলো সচল করলে মৎস্য চাষ, নৌপথ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপন্নের কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব। যমুনার উত্তরে ড্যাম নির্মাণ করে পদ্মার সঙ্গে সংযোগ করে স্লুইসগেট স্থাপন করতে পারলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ইরিগেশন এবং মৎস্য চাষ একযোগে সম্ভব। আর যমুনা নদীর দুই পার বাধিয়ে নদী শাসনের কাজটা করতে পারলে বনায়নের কাজটিও ভালোভাবে সম্পন্ন হবে। বিষয়টি আমার নয় বিধায় এখানে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে দেশে যারা নদী বিশেষজ্ঞ আছেন তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে পারেন।

যা হোক সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এ রকম বহুমাত্রিক বিশেষ সুবিধা থাকার কারণে দেশি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারীও এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করবেন। সম্প্রতি জলবায়ু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা দেওয়ায় সিরাজগঞ্জের পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশেষ আবেদন রাখতে সক্ষম হবে। তা ছাড়া সম্প্রতি আমেরিকা এবং চীনের মধ্যকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক ব্যবসায়ী তাদের সাপ্লাই সোর্স চীন থেকে সরিয়ে অন্য সাশ্রয়ী বাজারে নিতে শুরু করেছে। এর ফলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের এক বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটার চিপস, মোবাইল ফোন এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনে বিশাল বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর এই সুযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা দেখা দিলেও সেই সুযোগ আপনাআপনি আসবে না। এই সুযোগ ধরে নিয়ে আসার জন্য কাঠখড় পোড়াতে হবে এবং স্বউদ্যোগী হয়ে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন, বিদেশের যেসব কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান এসব খাতে বিনিয়োগ করে থাকে তাদের দৃষ্টিতে এই বিনিয়োগ সুবিধার বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।

এই তুলে ধরার কাজটি সঠিকভাবে করতে হলে যে পদক্ষেপগুলো নিতে হবে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

১. সেসব প্রতিষ্ঠান বা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা; ২. সেসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতা গ্রহণ করা; ৩. সেসব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে এবং ৪. এ কাজে সেসব দেশের কিছু প্রতিষ্ঠিত এজেন্সি বা থিঙ্ক ট্যাঙ্ককে কাজে লাগাতে হবে। 

মোটকথা, সিরাজগঞ্জ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করা হচ্ছে তাতে সেখানে পর্যাপ্ত দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখন এই বিনিয়োগ সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ এখন থেকেই গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।