সংগৃহীত
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার হেতামপুর গ্রামের কৃষক এনামুল হক এ বছর ১২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেন। বিঘা প্রতি প্রায় ১০০(একশত) মণের বেশি পেঁয়াজের উৎপাদন হয় । পেঁয়াজের উচ্চ ফলনে খুশি হয়েছিলেন তিনি । তবে তার এই খুশি বেশি দিন স্থায়ী হয়নী ।
১০ থেকে ১৫ দিনের মাঝেই ৭ বিঘা জমির প্রায় ৭০০ (সাতশত) মণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার প্রায় ৭ (সাত) লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে ।
এমন হাহাকার শুধু কৃষক এনামুল হকের নয় , এই হাহাকার চলছে শত শত প্রান্তিক কৃষক পরিবারে। এই দৃশ্য দেশের পঞ্চম ও খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বেশী পেঁয়াজ উৎপাদিত এলাকা ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রতিটি গ্রামে। অন্যদিকে দেখতে অনেকটা আপেলের মতো বড় বড় সাইজের উজ্জ্বল লালচে রঙের হাজার হাজার মন পেঁয়াজ কৃষকের বাড়ির আশপাশের ডোবা-নালায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পঁচা-দুর্গন্ধ ভাসছে আকাশে-বাতাসে। গৃহবধুরা প্রতিদিনই বস্তা আর ঝুড়ি ভরে ঘরের মাচা থেকে এনে ঢালছে পানিতে। চাষীদের স্বপ্নের ফসলের এ এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য ।

কৃষকদের অভিযোগ মেহেরপুর, ফরিদপুর সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপার অসাধু ব্যবসায়ী ও বীজ প্রতারক চক্র নিন্মমানের ভেজাল বীজ এনে প্রান্তিক চাষীদের কাছে বিক্রি করছে । আবার অনেক কৃষক অসাধু বীজ ব্যবসায়ীদের পরামর্শে চলতি মৌসুমে মেহেরপুর ও ফরিদপুর থেকেও নিজেরা গিয়ে সুখসাগর ও লালতীর এই বীজ সংগ্রহ করেন । সেসব বীজে সুখসাগর, লালতীর বা দেশীয় ভালো মানের পেঁয়াজ না হয়ে ভারতীয় নিম্ন মানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ হয়েছে, যা সংরক্ষণ যোগ্য নয় এবং দ্রুত পচনশীল। এসব পেঁয়াজ বিঘা প্রতি দেড়শ মণের বেশী ফলন হলেও নেই কোনো দাম। প্রতিমন ১’শ থেকে ২শ টাকাও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা উৎপাদিত সমস্ত পেঁয়াজ ডোবা-নালা, খালে-বিলে ফেলে দিচ্ছে।
শৈলকুপার প্রান্তিক চাষী পাঠান পাড়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন , “আমি এবছর ৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছিলাম। এর মাঝে তিন বিঘা জমির পেঁয়াজ পচে গেছে । আমরা এই বীজ বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলাম । বিঘা প্রতি ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে । এখন ঘরে যে পেঁয়াজ আছে তারো দাম নেই । যদি দাম হয় তবে আমরা একটু বাঁচব ।
একই গ্রামের আলম শেখ জানান , “৫০ শতক জমিতে পেঁয়াজ লাগিয়েছিলাম ১২ আনা পেয়াজই পচে গেছে আর ৪ আনা ভাল আছে । আগে দেশাল পেঁয়াজ লাগাতাম এখন এই জাতের পেঁয়াজ লাগাতে গিয়ে আমরা বিপদে পড়ে গেছি। এখন আমাদের আয় ব্যায় সবই শেষ হয়ে গেছে।”
শৈলকুপা বাজারের ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, অনেক প্রান্তিক চাষির সব পেঁয়াজই এভাবে পচন ধরছে, তারা বাজারে আনলেও ব্যবসায়ী, পাইকার সেসব পেঁয়াজ কিনছেন না। তিনি বলেন, অনেক কৃষক ক্ষোভে বাজারেই ঢেলে খালি বস্তা হাতে নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে।
খুলনা বিভাগের সর্বাধিক পেঁয়াজ উৎপাদিত এলাকা হিসাবে খ্যাত ঝিনাইদহের শৈলকুপায় লক্ষমাত্রার চেয়ে প্রায় ১হাজার হেক্টর বেশি জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করে কৃষকেরা। তারা মোট ১২হাজার ৮শ৩৬ হেক্টর জমি জুড়ে আবাদ করে পেঁয়াজের। তবে পেঁয়াজ তোলার পর চাষীরা দেখতে পায় কাঙ্খিত জাতের বদলে তাদের জমিতে হয়েছে ভারতীয় নিন্মমানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ। যা দুই থেকে ৫দিনও সংরক্ষণ করা যায় না, ধরে পঁচন। অধিকাংশ প্রান্তিক চাষীর ১বিঘা, ২বিঘা বা পুরো জমির সবই হয় এ জাতের। অনেকে তড়িঘড়ি বাজারে আনলেও ১টি পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে সেখানেই ঢেলে ফেলছে, কয়েক হাজার কৃষকের হয়েছে এমন সর্বনাশ।
ব্যবসায়ী ও পাইকাররা বলছেন, সুখসাগর বা লালতীর কিংবা দেশীয় জাত ছাড়া এই নাসিক জাতের পেঁয়াজ ক্রয়যোগ্য নয়, ফলে কেউ কিনছে না, সংরক্ষণ অযোগ্য এসব পেঁয়াজ।
শৈলকুপার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের নাসিক জাতের বিপরীতে বাজারে সুখসাগর,লালতীর, কিং সহ দেশীয় জাতের পেঁয়াজ ৮শ থেকে হাজার টাকা মন দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এতেও খুশী নন অন্যান্য চাষীরা। উৎপাদন খরচ বেশী হওয়ায় বিঘা প্রতি এবার তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শৈলকুপায় ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮০৫ হেক্টর বেশি। হেক্টর প্রতি উৎপাদন লক্ষমাত্রা ছিল ২০.২টন, তবে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ২০.৭ টন। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ২লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশী পেঁয়াজ ।
এদিকে বীজ প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশীয় বা উন্নত জাতের বদলে কেজি প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় নাসিক জাতের বীজ কিনে প্রান্তিক চাষীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে, এমন কথা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করলেও তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান খান বলছেন, “ গত বছরের থেকে হেক্টর প্রতি ২ থেকে ৩ টন বেশি উৎপাদন হয়েছে । বীজ কিনে কিছু কৃষক প্রতারিত হয়েছেন ,ক্ষতিগ্রস্থ কিছু কৃষকের বীজের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এভাবে ক্ষতিগ্রস্থরা আবেদন করলে তাদের বীজের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।”
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

.webp)







