শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মাঠ প্রশাসন সামলাতে হার্ডলাইনে সরকার

মাঠ প্রশাসন সামলাতে হার্ডলাইনে সরকার

সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা ঘটছে। একটি প্রকল্পের তথ্য চেয়ে সম্প্রতি শেরপুরের নকলা ইউএনও কার্যালয়ে আবেদন করেছিলেন স্থানীয় সাংবাদিক শফিউজ্জামান রানা। তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী এ ধরনের আবেদন বৈধ ও যৌক্তিক হওয়ার পরও এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন নকলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৪তম ব্যাচের কর্মকর্তা সাদিয়া উম্মুল বানিন।

এ আবেদনের জের ধরে গত ৫ মার্চ ইউএনও’র সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে তার কার্যালয়ে গিয়ে রানাকে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় থানা পুলিশ। এর পর নকলা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শিহাবুল আরিফ সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন সাংবাদিক রানাকে। এ ঘটনায় গত ১৫ এপ্রিল শিহাবুল আরিফকে জামালপুর সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বদলি করা হয়েছে। 

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৪ মার্চ লালমনিরহাট জেলার সদরে ভূমি অফিসে গিয়ে হেনস্থা হতে হয় স্থানীয় ৫ সাংবাদিককে। জমি খারিজসংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়েছিলেন তারা। তাদের তালাবদ্ধ করে রাখেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল নোমান। বিতর্কের মুখে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলায় বদলি করেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার হাবিবুর রহমান। 

গত কয়েক বছরে এ ধরনের বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন মাঠ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। যার ফলে প্রশাসন সম্পর্কেই নেতিবাচক ধারণা জন্মাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কর্মকর্তাদের অনেকেও বিব্রত হচ্ছেন। বিভিন্ন সময় মাঠ প্রশাসনে সংঘটিত বিতর্কিত ঘটনায় দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও গৃহীত পদক্ষেপগুলো একদিকে প্রচারে আসেনি, অন্যদিকে প্রভাবও ফেলেনি। পর্যবেক্ষকদের মতে, কঠোরভাবে এসব ঘটনার রাশ টেনে না ধরায় মাঠ প্রশাসনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাঠ প্রশাসনে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিশেষত, গত দুই-তিন মাসের ব্যবধানে শেরপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের মাঠ প্রশাসনে সংঘটিত ঘটনায় সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বিব্রত বোধ করছেন। 

বিভাগীয় কমিশনারদের সভায়ও আলোচনা ‘আচরণ’ নিয়ে

প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ প্রশাসনের কোনো কোনো কর্মকর্তা এখন চাইছেন রাজনৈতিক তকমা নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নিজেদের ক্ষমতাবান ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায় তারা আর  ক্ষমতার ভারসাম্য রাখতে পারছেন না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও তারা চাইছেন না আমলে নিতে। সেবাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাই কর্মকর্তাদের দুর্ব্যবহারের ঘটনা বেড়ে চলেছে। এসব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসায় সরকারকেও বিব্রত হতে হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা তাই মাঠ প্রশাসনে বিতর্কিত ঘটনা রোধে অতি উৎসাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরার পথে এগোচ্ছেন। প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড সুদৃঢ় রাখতে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে চাইছেন তারা।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় কমিশনারদের সমন্বয় সভায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) আচরণ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বলা হয়, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সংযত ও মানবিক আচরণ করেন। এজন্য কমিশনারদেরও নিয়মিত তদারকি বা কাউন্সিলিং করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অভিজ্ঞ হওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন কর্মকর্তারা

জনপ্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, আগে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা উপসচিব পদে পদোন্নতির অন্তত ৩ বছর পর জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পদায়ন করা হতো। প্রশাসনে চাকরির সময়সমীমা ১৫-১৬ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাদের ডিসি পদে পদায়ন করা হতো। আবার কমপক্ষে ১১-১২ বছর চাকরি করার পর পদায়ন করা হতো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে। কিন্তু বর্তমানে মাঠ প্রশাসনে চাকরির ৬-৭ বছরের মধ্যে অনেকেই ইউএনও হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে পদায়নপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অধিকাংশই পরিণত না হওয়ায় বিভিন্ন সময় মাঠ প্রশাসনে বিতর্কিত ঘটনা ঘটিয়ে বসছেন। 

উল্লেখ্য, প্রশাসনে তৃণমূল পর্যন্ত নিয়মনীতি এবং সরকারি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মাঠ প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) একেকটি উপজেলা, জেলা এবং বিভাগে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ দায়িত্বশীল পদে যাওয়ার পর তাদের অনেকেই আর এমনকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছেও জবাবদিহি করতে চাইছেন না। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

অধিকাংশ ঘটনাই অমীমাংসিত ও বিচারের বাইরে

সম্প্রতি কয়েক মাসের ব্যবধানে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনায় প্রশাসনে এবং প্রশাসনের বাইরেও আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে। শেরপুরের নকলা ও লালমনিরহাটের ঘটনা তো বটেই, আরও কয়েকটি ঘটনার মধ্য দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন মাঠ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। কেউ কেউ নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গেও জড়িয়েছেন। অভিযোগ, সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গে অহরহ দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের কর্তাদের সবচেয়ে বেশি ঝামেলার ঘটনা ঘটছে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে। 

প্রসঙ্গত, গত বছর মানিকগঞ্জের সিংগাইয়ের ইউএনও রুনা লায়লাকে ‘স্যার’ না বলে ‘আপা’ বলায় পুলিশ দিয়ে ব্যবসায়ীকে পেটানোর খবর সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করেছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয়ের বাগানের ফুল ছাগল খেয়েছিল। এই ঘটনায় ছাগলের মালিককে দুই হাজার টাকা জরিমানা করে সমালোচনার ঢেউ বইয়ে দেন বগুড়ার আদমদিঘী উপজেলার ইউএনও সীমা শারমীন। সরকার এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলকেও লজ্জায় ফেলে দেন তিনি। 

একইভাবে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে কুড়িগ্রামের রিপোর্টার আরিফুল ইসলাম রিগ্যানের একটি প্রতিবেদনের জের ধরে পরের বছর ২০২০ সালের মার্চে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন একাধিক অভিযোগ রয়েছে, যার বেশিরভাগই এখনও অমীমাংসিত বা সঠিক বিচারের বাইরে রয়েছে।

মন্ত্রী ও অন্যদের অভিমত

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জনগণের সেবা প্রদানের জন্য মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আন্তরিক হতে বলা হয়েছে। সবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। প্রত্যেক কর্মকর্তাকে চাকরিবিধি অনুসরণ করতেই হবে। কারোর সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না। এর বাইরে কেউ যদি শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্সে থাকবে। মাঠ প্রশাসনে এ-সংক্রান্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে।’ 

সরকারের সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ খুবই দুঃখজনক। জনগণের কল্যাণের জন্য নিয়োজিত হয়েছেন, এমন দায়িত্ববোধ থেকে তাদের সবাইকে কাজ করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের লোক হিসেবে জনগণের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা যাবে না। এরপরও কেউ যদি কারো সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন, তাহলে তাদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার নৈতিক সুযোগ নেই। চাকরিবিধি অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা ও বিভাগীয় সংশোধনের বিষয়ে জোর দিতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘যারা এমন আচরণ করে গোটা প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন, অবশ্যই তাদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জনগণের জন্য অপরাধ করলে আইন আছে, কর্মকর্তাদের বেলায়ও এর ভিন্ন কিছু নয়। কোনো কর্মকর্তাই আইনের ঊর্ধ্বে নন। অপরাধ করার পরও যারা  শোধরাবেন না, তারা যদি শীর্ষ পর্যায়ে যান তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য অভিশাপ।’ 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘জনমানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের এ ধরনের আচরণ সংবিধান পরিপন্থি তো বটেই, সেই সঙ্গে তাদের চাকরিবিধি পরিপন্থি। ইদানীং এদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। কারণ অন্যায়ের জন্য তাদের কোনো বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না। একজন ইউএনও ট্রফি ভাঙলেন, তাকে বদলি করে ঢাকায় এনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব দেওয়া হলো। এভাবে প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। যদিও সব কর্মকর্তা খারাপ নন।’ 

সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ