• শনিবার   ১৩ আগস্ট ২০২২ ||

  • শ্রাবণ ২৯ ১৪২৯

  • || ১৫ মুহররম ১৪৪৪

তুর্কি বিজ্ঞানী ব্রুসিনের ছায়াপথ উন্মোচন করল অজানা এক অধ্যায়ের

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর ২০১৮  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একজন শিশু হিসেবে তুরস্কে বেড়ে ওঠার সময় ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল সবসময় রাতের আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে থাকাকে উপভোগ করতেন, যিনি এখন বিশ্ব বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

কিন্তু সেই ছোট ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল কি জানতেন পৃথিবী থেকে ৩৫৯ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করা একটি গ্যালাক্সি নীরবে তার নাম বহন করে চলেছে, যা এতদিন তার বৈজ্ঞানিক দক্ষতার জন্য অপেক্ষা করছিল?

জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে ব্রুসিন মুতলু-পাকদিলের তুমুল আগ্রহ বা আবেগ জন্মায় তখন থেকেই যখন তিনি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত থাকার সময় একজন চিত্তাকর্ষক ব্যক্তি সম্পর্কে একটি অ্যাসাইনমেন্ট তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি আসলে কোন বিখ্যাত ব্যক্তির উপর অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করবো এ ব্যাপারে আমার বোনের পরামর্শ চেয়েছিলাম। সে আমাকে আইনস্টাইনের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিল, কারণ তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের একজন ছিলেন।’

এর পরেই ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল পদার্থ বিজ্ঞান সম্পর্কে অধ্যয়ন করা শুরু করেন এবং বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। কিন্তু তিনি যখন পদার্থ বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন তাকে কিছু প্রতিবন্ধকতা সামাল দিতে হয়। এ জন্য তাকে তার নিজের শহর ইস্তাম্বুল ছেড়ে আঙ্কারায় পাড়ি জমাতে হয়েছিল।

ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল বলেন, ‘যদিও আমার পরিবারের সকলেই আমার সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল এবং আমাকে আমার আবেগের বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছিল কিন্তু আমার বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই আমাকে বলেছিল যে, শুধু মাত্র অধ্যয়ন করার জন্য একজন মেয়ের বাড়ি ছেড়ে দূরে যাওয়া উচিত নয়।’

তিনি বলেন, ‘পদার্থ বিজ্ঞানের একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে আমার নিজেকে একজন আগন্তুক মনে হত এবং শ্রেণী কক্ষে সাধারণত আমার মন্তব্যের তেমন একটা দাম থাকত না। তবে আমি আমার আবেগের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেছিলাম।’

এসব প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও ব্রুসিন মুতলু-পাকদিলের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নারী শিক্ষার্থীদের হিজাব পরিধান করতে দেয়া হত না।

তিনি বলেন, ‘আমি মাথায় টুপি (হ্যাট) পরিধান করতাম যাতে করে আমি আমার মাথা ঢেকে রাখতে পারি কিন্তু এটি অনেক সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করত। একজন নারী হিসেবে বিজ্ঞান অধ্যয়ন করার জন্য আমি ইতোমধ্যেই একটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম, আর এর সাথে আমাকে আমার পোশাক পরিধান করার বিষয়ে বাধা দিয়ে বিষয়টাকে অতি জটিল করে দেয়া হয়েছিল।’

ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর বিষয়ে ডিগ্রী নেয়ার জন্য এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে মিনিশোটা টুইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। যদিও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন সংস্কৃতির জন্য কিছুটা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন কিন্তু এখানকার পরিবেশ তার নিকটে স্বাগত জানানোর মত মনে হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমি একটি নতুন দেশে এসেছিলাম যেখানে অনেক কিছুই ভিন্ন ধরনের ছিল। কিন্তু যখন আমি বুঝতে পারলাম আমি যা ইচ্ছা পরিধান করতে পারি তখন নিজেকে অনেক সুখী মনে হয়েছিল যদিও এখানে অন্যান্য অনেক বিষয়ে আমি একমত হতে পারি নি।’

সফলতার ধ্বনি
বর্তমানে ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল এরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিওয়ার্ড পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পোস্ট- ডক্টরেল গবেষণা সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সেখানে দূরবীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে মহাবিশ্বের অজানা অধ্যায় উন্মোচন করার জন্য গবেষণা করেন বিশেষত কিভাবে গ্যালাক্সি (ছায়াপথ) তৈরি হয় এবং কিভাবে সময়ের সাথে সাথে এগুলো রূপ পরিবর্তন করে তা জানার জন্য তিনি পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

মহাবিশ্বের কয়েক ট্রিলিয়ন অথবা এর চাইতেও বেশি ছায়াপথ রয়েছে এবং এদের বেশির ভাগই আমাদের ছায়াপথ মিল্কি ওয়ের মত সর্পিল আকৃতির।

ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল বলেন, যদিও সাধারণ ছায়াপথগুলোর গঠন নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠিত মত বিজ্ঞানীদের নিকট রয়েছে কিন্তু বিজ্ঞানী এবং মহাকাশচারীদের আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দু হচ্ছে কিছু অপরিচিত ছায়াপথ নিয়ে এবং এগুলো কিভাবে গঠিত হয়েছে তা জানার জন্য তারা দিন রাত পরিশ্রম করে চলেছেন।

এরকম একটি বিরল ছায়াপথের নাম হচ্ছে Hoag’s Object হোয়াগের বস্তু, যা বিজ্ঞানী আর্থুর এ্যালেন হোয়াগের নামে পরিচিত, যিনি ১৯৫০ সালে এটি আবিষ্কার করেছিলেন। হোয়াগের ছায়াপথটি হচ্ছে প্রথম জানা কোনো ছায়াপথ যা দেখতে অনেকটা আংটি আকৃতির এবং যার চারপাশটি গঠিত হয়েছে কিছু পুরনো তারার সমন্বয়ে। এধরনের ছায়াপথ একেবারেই বিরল যার সংখ্যা এ পর্যন্ত জানা ছায়াপথ গুলোর মধ্যে ০.১ শতাংশ।

যখন ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল এবং তার দল পিজিসি-১০০০৭১৪ নামে পরিচিত একটি ছোট ছায়াপথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন তারা এটিকে হোয়াগের ছায়াপথের মত কিছু একটা মনে করে ভুল করেছিলেন এবং তারা তাদের আবিষ্কার নিয়ে উল্লাসিত হয়েছিলেন।

কিন্তু ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল গবেষণা করে দেখলেন যে, তাদের আবিষ্কৃত ছায়াপথটি হোয়াগের ছায়াপথের চাইতে ভিন্ন এবং এতে আবিষ্কারের জন্য আরো বেশি গোপন বস্তু বিদ্যমান।

তিনি বলেন, ‘লাল কেন্দ্র এবং নীল বহিরাবরণের মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে- এর কেন্দ্রের দেয়ালের চারপাশে একটি লাল রঙের আংটি আকৃতির কিছু একটা বিদ্যমান রয়েছে। আমরা এমন একটি ছায়াপথ আবিষ্কার করেছি যা ইতঃপূর্বে কেউ কখনো দেখে নি।’

এই স্বর্গীয় সুন্দর ছায়াপথটি বর্তমানে ব্রুসিনের ছায়াপথ নামে পরিচিত হয়ে গেছে এবং এটি মহাকাশচারীদের নিকট কিছু অজানা অধ্যায়ের উন্মোচন করছে।

জীবনের নীতি
যদিও ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল এবং তার দল নব আবিষ্কৃত ছায়াপথটি নিয়ে আরো গবেষণা করে চলেছেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, তার কাজ এবং তার গল্প যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়ন করতে আসা অভিবাসীদের অনুপ্রেরণা যোগাবে।

ব্রুসিন মুতলু-পাকদিল বলেন, ‘যখন আমি কোনো বিদ্যালয়ে আমন্ত্রিত হই অথবা যখন কেউ সোশাল মিডিয়ায় আমার সাথে যোগাযোগ করতে চায় তখন আমি তাদের সকলকে একটা কথা বলি আর তা হচ্ছে- শুধুমাত্র বাহিরের চাপের মুখে বিজ্ঞানের প্রতি তোমার যে কৌতূহল তা রুদ্ধ করে দিও না। এই ভ্রমণ হয়ত অতোটা সুখকর নয় তবে তোমাকে অবশ্যই তোমার আবেগের মূল্য দিতে হবে।’

ইতোমধ্যেই একজন বই প্রকাশক ব্রুসিন মুতলু-পাকদিলের সাথে তার আবিষ্কার নিয়ে একটি বই প্রকাশের বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং তিনি ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক টক শো ‘TED’ কর্তৃক সারা বিশ্ব থেকে মনোনীত ২০ জন সম্মানিত ফেলো এর একজন নির্বাচিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এই প্লাটফর্ম আমাকে আমার মত প্রকাশের একটি ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে যা আমি কখনো ধারণা করতে পারি নি।’

‘TED’ এর আলোচনায় অংশ নেয়ার পূর্বে তিনি তার একজন বন্ধুর সাথে এ বিষয়ে ট্রায়াল দিয়ে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি বার বার চেষ্টা করতে হয়েছিল। আমি বার বার চেষ্টা করেছি ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না অবধি আমি যা বলতে চাই তা সহজ ভাষায় সবার সামনে উপস্থাপন করতে পারছি।’

‘এটিই জীবনের নীতি, তাই না। আপনি হয়ত প্রথম প্রচেষ্টাতেই সঠিক ফলাফল পেয়ে যাবেন না। যতবার আপনি ব্যর্থ হবেন, আপনি তত বারই উঠে দাঁড়াবেন এবং পুনরায় চেষ্টা করবেন আর একসময় এভাবেই আপনি সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যাবেন।’

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ