বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

হজ বড় না বিপদগ্রস্থ বান্দার সহযোগিতা বড়?

হজ বড় না বিপদগ্রস্থ বান্দার সহযোগিতা বড়?

 

আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) এর জীবনকথা-

তার দানশীলতা ও দারিদ্র্যতা পালন:
আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) একবার হজে যাচ্ছেন। এক কাফেলাও সঙ্গে ছিল। পথিমধ্যে একস্থানে কাফেলার লোকদের একটি মুরগী মারা যায়। কাফেলার লোকেরা ওই মুরগী আবর্জনার স্তুপে নিক্ষেপ করল।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক কাফেলার লোকদের থেকে সামান্য পেছনে ছিলেন। তিনি দেখলেন যে, কাফেলার লোকেরা ওই মৃত মুরগীটিকে নিক্ষেপ করে চলে গেছে। এমন সময় পাশের বসতি থেকে একটি মেয়ে বের হলো এবং ক্ষীপ্র বেগে ওই মৃত মুরগীর ওপর ঝাপটে পড়ল। এটি উঠিয়ে একটি কাপড়ে লেপ্টে নিল।

দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবনুল মোবারক এসবই দেখছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিচলিত হলেন যে, এই মৃত মুরগীটি এভাবে আগ্রহের সঙ্গে উঠিয়ে নিয়ে গেল মেয়েটি কার? না কী মৃত মুরগী সে ভুলে নিয়ে গেল? তাই তিনি গ্রামে এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। অনেক তালাশের পর মেয়েটির বাড়ি খুঁজে পেলেন এবং তাকে মৃত মুরগী নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।

অনেক পীড়াপীড়ির পর মেয়েটি বলল যে, আসল কথা হলো এই যে, আমার পিতার ইন্তেকাল হয়ে গেছে, যিনি আমাদের ঘরের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন। আমার আম্মা বিধবা। আমি একাকী মেয়ে মানুষ এখানে থাকি। ঘরে খাবার কিছুই নেই। আমি কয়েক দিন থেকে এ অবস্থঅয় আছি যে অবস্থায় শরীয়ত মুরদার খাওয়ার অনুমতি প্রদান করেছে। তাই এই আবর্জনার স্তুপে যে কেউ মৃত কিছু ফেলে দেয়, আমি তা খেয়েই জীবন ধারণ করে যাচ্ছি।

একথা শুনে হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের অন্তরে আঘাত লাগে। তিনি চিন্তা করলেন, সেও তো আল্লাহ বান্দা। সে এ অবস্থায় আছে যে, মুরদার খেয়ে খেয়ে জীবন বেঁচে আছে। আর আমি হজে যাচ্ছি। তাই সাথীকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তোমার কাছে কত টাকা আছে? সে বলল যে, আমার কাছে হয়ত দুই হাজার দিনার আছে।

তিনি বললেন যে, আমার বাড়ি ফিরে যেতে প্রায় বিশ দিনার প্রয়োজন তা রেখে দাও এবং বাকি সব টাকা ওই মেয়েটিকে দিয়ে দাও। আর আমি এ বছর হজ করব না এবং এ দিনারগুলো দ্বারা তাদের পরিবারের সে উপকার হবে আল্লাহর রহমতে আশা করা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা হজ থেকেও অধিক সওয়াব ও প্রতিদান দেবেন। একথা বলে ফিরে চলে গেলেন। উদ্দেশ্য হলো, একটি দু’টি নয়; বরং এমন অসংখ্য বৈশিষ্ট্য আল্লাহ তায়ালা তাকে দান করেছিলেন। যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

তার বিশাল দিলের আরো একটি ঘটনা:
আরো একটি ঘটনা স্মরণ হলো যখন তিনি রাক্কা শহরে যেতেন তখন এক যুবক এসে তার সঙ্গে সাক্ষাত করত। কখনো এসে মাসআলা জিজ্ঞেস করত। কখনো অন্যকথা জিজ্ঞেস করত। একবার যখন রাক্কা শহরে গেলেন, তখন ওই যুবকের দেখা পেলেন এবং সে এসে সাক্ষাতও করল না। তিনি লোকদের জিজ্ঞেস করলেন যে, একটি যুবক ছেলে সে সর্বদা এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করত, তাকে যে দেখছি না, সে কোথায় গেল? লোকেরা বলল, তার বহু টাকা ঋণ ছিল। ঋণদাতা তাকে গ্রেফতার করে জেলখানায় দিয়েছে।

এ সংবাদ শুনে তার মনে বড়ই দুঃখ হলো। তিনি লোকদের বললেন, তার কত টাকা ঋণ হয়েছিল? লোকেরা বলল, দশ হাজার দিনার। তারপর জানলেন ঋণদাতা কে? লোকেরা বলল, অমুক ব্যক্তির কাছে ঋণী ছিল। তখন তিনি ওই ব্যক্তির সন্ধানে বের হলেন। ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে করতে তার ঘরে গিয়ে পৌঁছলেন। তার কাছে গিয়ে বললেন, আমার এক বন্ধু আছে। তোমার কাছে সে ঋণী, যে কারণে সে জেলখানায় আছে। আমি এ ঋণ তোমাকে পরিশোধ করে দিচ্ছি; কিন্তু একটা শর্ত আছে, আর তা হলো এই যে, আমার কাছে তুমি ওয়াদা কর এবং কসম খাও যে, আমার জীবদ্দশায় তাকে এ কথাটা বলবে না যে, কে এই ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে? সুতরাং সে কসম খেল, আমি বলব না। তাই তিনি দশ হাজার দিনার তাকে দিলেন এবং তাকে বললেন, এখন তাকে ছেড়ে দাও। সুতরাং সে জেলখানায় গিয়ে তাকে সেখান থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসল।

যখন সে যুবক জেল থেকে ছাড়া পেয়ে শহরে এল, এখন সে জানতে পারল যে, কয়েকদিন আগে হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এখানে এসেছিলেন। লোকের কাছে জিজ্ঞেস করল যে, এখান থেকে তিনি কখন চলে গেছেন? লোকেরা বলল, এইমাত্র কয়দিন আগে বের হয়েছেন। ফলে যুবকটি তার পেছনে অনুসরণ করল এবং পথে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল। হজরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বললেন, আমি শুনেছিলাম যে, তুমি জেলখানায় আছ? সে উত্তর দিল, হ্যাঁ, আমি জেলেই ছিলাম। এখন আল্লাহ তায়ালা মুক্তি দান করেছেন।

তিনি বললেন, কীভাবে বেরুলে? তখন যুবকটি বলল, আল্লাহ তায়ালা গায়েবি ফেরেশতা পাঠিয়ে দিলেন। সেই আমার ঋণ পরিশোধ করে দিল। এজন্য আমি রেহাই পেয়েছি। আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বললেন, এখন আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় কর আর আমিও তোমার জন্য দোয়া করতে ছিলাম যে, আল্লাহ তোমাকে মুক্তি দান করুন। ওই যুবক পরে বলল যে, গোটা যিন্দেগী আমার খবর হলো না যে, আমার ঋণ পরিশোধকারী আবদুল্লাহ ইনুল মুবারক (রহ.)। কেননা ওই ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মুবারকের সামনে কসম করেছিল, আমি আপনার জীবদ্দশায় এ বিষয়ে কাউকে বলব না; কিন্তু যখন আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের ইন্তেকাল হয়ে গেল, তখন ওই ব্যক্তি আমাকে বলল যে, তোমার ঋণ মুক্তির কারণ বাস্তবে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) ছিলেন। (তারীখে বাগদাদ ১০ম খণ্ড, পৃ. ১৫৯)।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: