বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সোনালি যুগে মুসলমানদের নৌ বাণিজ্য

সোনালি যুগে মুসলমানদের নৌ বাণিজ্য

সভ্যতার প্রায় সূচনালগ্ন থেকে মানুষ নৌপথে এবং পরবর্তী সময়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করে আসছে। ইসলামপূর্ব আরবের লোকেরাও সমুদ্রপথে বাণিজ্য করত। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আরবের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ধারা আরো গতিশীল হয়। ইসলামী খেলাফতের পরিধি বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র বাণিজ্যের আয়তন বৃদ্ধি পেতে থাকে।

খোলাফায়ে রাশেদা, উমাইয়া ও আব্বাসি—সব যুগেই সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ধারা অব্যাহত ছিল মুসলিম বিশ্বে। বাণিজ্যিক এসব কাফেলার মাধ্যমেই ভারত মহাসাগরের উপকূলে চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে যায়। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের সামরিক অভিযান ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার বহু পূর্বে মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ৬৯ হিজরির একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্রহ্মপুত্র নদী ধরে চীনে যাওয়ার পথে কোনো মুসলিম বণিক দল এই মসজিদ নির্মাণ করেন।

ভৌগোলিক অবস্থার কারণে প্রাচীন কাল থেকে আরব উপদ্বীপের অধিবাসীরা সামুদ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। একদিকে তা ছিল দূরপ্রাচ্য ও আরবের মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থল। তা ছাড়া এটি ছিল সমুদ্র পারাপারের জন্য ইউরোপের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। আরব উপদ্বীপের লোকেরাও আরব উপসাগর, ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগরের আবহাওয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখত। তাই আরবদের সমুদ্র চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক ছিল। বাণিজ্যিক কারণে দূরপ্রাচ্যসহ ভারত আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত ছিল তাদের।

এই অঞ্চলের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ইসলামের প্রচার-প্রসারে রাসুল (সা.) আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে দূত প্রেরণ করেছেন। মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদার বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে সমুদ্রের উপকূলীয় অঞ্চলের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়, যা পরবর্তী সময়ে মানুষের সামুদ্রিক অভিযান প্রেরণে সহায়ক হয়।

৬৪ হিজরিতে বাহরাইনের গভর্নর আলা হাজরামি (রা.) সামুদ্রিক অভিযান প্রেরণ করেন এবং এতে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। ২৩ হিজরিতে উসমান বিন আবিল আস (রা.) আরেকটি সামুদ্রিক অভিযান প্রেরণ করেন। আর তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর আমলে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বণিকদের সামুদ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে তাদের নিরাপত্তার জন্য মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বিশেষত এই সময় মিসর ও সিরিয়ার উপকূলবর্তী এলাকার বহু মুসলিম সমুদ্র বাণিজ্যে সক্রিয় হয়। তাদের নিরাপত্তায় মোয়াবিয়া (রা.) মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের জোরালো আবেদন জানান। উসমান (রা.) তাতে সাড়া দেন। মুসলিম নৌবাহিনী গঠনের পর মুসলিম বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগর, পারস্য সাগর ও ভারত মহাসাগরে তাদের তৎপরতা বাড়ায়।

৮৬ হিজরিতে খলিফা ওয়ালিদ (রা.)-এর আমলে মুসলিম বাহিনী ভারতের সিন্ধু বিজয় করে। এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারত মহাসাগরে মুসলিম বণিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কেননা সিন্ধুর শাসক রাজা দাহির মুসলিম বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করেন। এমনকি তিনি মুসলিম জাহাজ লুণ্ঠনকারীদের শাস্তি দিতেও অস্বীকার করেন।

হিজরি প্রথম শতাব্দীতে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর সামুদ্রিক বন্দর স্থাপিত হয়। ১২৩ হিজরিতে আব্বাসি খেলাফতের যুগে ভারত মহাসাগর ও আরব উপসাগরে বিভিন্ন অভিযান প্রেরণ করা হয়। এসব অভিযানের পুরোটাই সামরিক ছিল না। বরং বাণিজ্যিকও ছিল। ১৪৮ হিজরিতে আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মানসুর বাগদাদকে খেলাফতের রাজধানী ঘোষণা করেন। তখন দজলা ও ফোরাত নদী দিয়ে বিভিন্ন বন্দরে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে আব্বাসি খলিফাদের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন পূরণে সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। মুসলিম বিশ্বের ইউরোপ ও আফ্রিকার বাণিজ্যিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায় এ সময়। (মুজামুল বুলদান)

আব্বাসি যুগে ইসলামী সাম্রাজ্যে বিশেষত ইরাকে শিল্প ও কৃষির বিপ্লব ঘটে। আর তাতে উৎপন্ন পণ্যসামগ্রী ও অন্যান্য দ্রব্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দজলা ও ফোরাত নদী দিয়ে আমদানি করা হয়। এ পথে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীরা মনোযোগী হয়ে ওঠে। এ সময়ে নৌবাহিনী ও সামুদ্রিক কাফেলার মাধ্যমে গড়ে ওঠে বাহরাইন, ওমান, বসরা, সাইরাফসহ অনেক বন্দর।

দূরপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ভারত, সিন্ধু, চীনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক কেন্দ্র থেকে মুসলিম দেশগুলোর প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর আমদানি জোরদার হয়। তারা সেখান থেকে ভারতের বিখ্যাত তরবারি, লবঙ্গ, মরিচ, সেগুন, চামড়া, ঘোড়ার জিন, হাতির দাঁত, টিন, কাগজ, চন্দনসহ নানা প্রকারের বস্ত্রাদি, চীনের মেশক, মৃৎপাত্র, কাফুর, উদ, বর্শা, তীর, ধনুক ও অন্যান্য সামগ্রী আমদানি করত। তেমনি রপ্তানি করা হতো নানা প্রকারের খেজুর, আঙুর, আনার, কলাসহ ফল-ফলাদি। এ ছাড়া রেশম কাপড়, পাগড়ি, পশমবিশিষ্ট কাপড়সহ নানা প্রকারের দ্রব্যাদি রপ্তানি করা হতো।

মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর নানা দেশে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে গড়ে ওঠে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক শুধু অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তা ইসলামের প্রচার-প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তেমনিভাবে ভারত ও চীনের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম ও আরব সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচলন ঘটে। আরব থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ীদের সম্মান বৃদ্ধি পায় মানুষের মাঝে। আবার আরবের অনেকে এখানে বসবাস করতে শুরু করে। ফলে ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচারসহ সামাজিক অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিমদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়। এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া আরব বণিকদের সংস্কৃতিগুলো শুধু সমাজের সাধারণ শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বিভিন্ন রাজার দরবারেও বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

মুসলিমদের সমুদ্রে বাণিজ্যিক যাত্রার মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতা ব্যাপকতা লাভ করে। তেমনি ইসলামী সাম্রাজ্যের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য পরাশক্তির লেনদেন শুরু হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে মুসলিমরা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। ইসলামের সুদৃঢ় নৈতিক দর্শন মানুষকে আকর্ষণ করে। প্রাচ্যের মুসলিমরা ব্যাপকভাবে সামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী সাম্রাজ্যের অর্থনীতি সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। আর এরই মাধ্যমে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপরেখা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: