শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

শাহজাদপুরের স্নাতকোত্তরের ছাত্রের সফল গরু খামারি হওয়ার গল্প

শাহজাদপুরের স্নাতকোত্তরের ছাত্রের সফল গরু খামারি হওয়ার গল্প

দেশের উত্তরাঞ্চলে পাঁচটি ডেইরি হাবের অধীনে ১০১টি দুগ্ধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্রে সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করছে প্রাণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান প্রাণ ডেইরি লিমিটেড। প্রাণ ডেইরির ১২ হাজার চুক্তিভিত্তিক খামারিদের প্রায় ৫০ হাজার গরু আছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চিফ ডেইরি অপারেশন কর্মকর্তা ডা. রাকিবুর রহমান।

তিনি বলেন, “এসব খামারি দুগ্ধখামার করে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়ে এনেছেন।” পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী রাজু আহমেদ নিজেকে একজন সফল কৃষক হিসেবেই দেখছেন। মা-বাবা ও এক ভাইকে নিয়ে রাজুদের পরিবারে আগে থেকেই গবাদি পশু পালন করা হলেও গত তিন বছর ধরে নিজের খামার গড়ে তুলেছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের জামিরতা গ্রামের রাজু।

খামারেরর উন্নত জাতের সাতটি গরুর তিনটি থেকে প্রতিদিন ৪০ লিটার দুধ পান তিনি। দুধ বিক্রি করে যে টাকা পান তা থেকে সাতটি গরুর খাবার কেনার পর কিছু অর্থ তিনি ব্যাংকে সঞ্চয় করতে পারেন। বাছুরগুলো বড় হলে বছর শেষে সেগুলো বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা পাওয়ার আশা করছেন বলে জানালেন রাজু। গরুর খামারের শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে বড় একটা চ্যালেঞ্জ ছিল, তা হল দুধ বিক্রি করতে পারতাম না। গোয়ালাকে ডেকে দুধ দিলেও দাম দিত খুব সামান্য। কোনো কোনো সময় গোয়ালা টাকাই দিত না।”

এখন রাজুর খামারের পাশেই রয়েছে প্রাণ ডেইরির দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র। এখানে দুধে ফ্যাট ও ননীর পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে প্রতি লিটার দুধ ৪০ টাকা থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন তিনি।  রাজু বলেন, “গরুর কোনো ধরনের রোগ দেখা দিলে প্রাণ ডেইরি আমাদের সহায়তা করে। প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনগুলো তারা দিয়ে থাকে।” জামিরতা গ্রামেরই আরেক বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন গত প্রায় ২৫ বছর ধরে দুধের জন্য গরু লালন-পালন করেন। তার ১৭টি গরুর মধ্যে ছয়টি গাভী এখন দুধ দেয়।  

প্রতিদিন প্রায় ৬০ লিটার দুধ বিক্রি করেন বলে জানালেন সানোয়ার। এই গরু খামারি বলেন, “দুধ বিক্রি করে আমার অন্যান্য সব গরুগুলোর জন্য খাবার কিনে মেকআপ করতে পারলেই খুশি। কারণ ছোট গরুগুলো বড় হবে, তখন বেশি দামে বিক্রি করতে পারব, এটাই বড় লাভ।” রাজুর মতো দুধ বিক্রির অর্থে গরুর খাবার কিনে বাকি টাকা ব্যাংকে জমা করছেন সানোয়ার।

তিনি বলেন, “তারা (প্রাণ) সপ্তাহ শেষে দুধের নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে।  আমাদের গরুর অসুখে-বিসুখে এগিয়ে আসে তারা। স্বল্প মূল্যে তাদের কাছ থেকে ভ্যাকসিন পাই।” দুই বছর আগে অসুখে দুটি গরু মারা যাওয়ার কথা জানালেন সানোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “সঠিক রোগ চিহ্নিত না করতে পারলে চিকিৎসাও যথাযথ হবে না। এই জন্য তাদের পর্যাপ্ত খাবার দেওয়ার পাশাপাশি আলো-বাতাস চলাচল করে এমন পরিবেশে রাখা ও যত্ন নেওয়া জরুরি।”

যথা সময়ে রোগ চিহ্নিত করতে না পারায় নিজের খামারের দুটি গরু মারা গেছে বলে জানালেন রাজুও। খামারিদের গরুর রোগ প্রতিরোধে প্রাণের ডেইরি হাব থেকে উৎপাদন মূল্যে ভ্যাকসিন ও নিজস্ব ভেটেনারি চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে বলে জানালেন প্রতিষ্ঠানটির চিফ ডেইরি অপারেশন ডা. রাকিবুর রহমান। জাত উন্নয়নের জন্য কৃষকদের গরুগুলোর কৃত্রিম প্রজননের ব্যবস্থাও করে থাকে প্রাণ।

বর্তমানে বেসরকারিভাবে সিমেন আমদানিতে সরকারের অনুমতি না পাওয়ার কারণে নতুন করে তা খামারিদের সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়েছেন রাকিবুর। প্রাণ ডেইরি গবাদি পশুর খামার বাড়ানোর জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করে থাকে, বলেন তিনি। গরু কেনা ও বাসস্থান তৈরির জন্য সোনালী, কর্মসংস্থান ও আইএফআইসি ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে খামারিদের ঋণের ব্যবস্থা করে থাকে প্রাণ ডেইরি।

এক্ষেত্রে প্রাণ ডেইরি জামিনদার হয় এবং প্রতি সপ্তাহে খামারির যোগান দেওয়া দুধের মূল্য থেকে একটি অংশ কেটে নেওয়া হয়, যাতে করে কৃষকের ওপর বাড়তি কোনো চাপ না পড়ে। ডিজিটাল মেশিনে আটটি পরীক্ষার মাধ্যমে মান যাচাই করে খামারিদের থেকে সরাসরি দুধ সংগ্রহ করে থাকে প্রাণ ডেইরি লিমিটেড। পরবর্তীতে আধুনিক ল্যাবে এই দুধ আবারও পরীক্ষা করার পর গুণাগুণ বজায় থাকলে তা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য বাজারজাত করছে ২০০১ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করা প্রাণ গ্রুপের এ প্রতিষ্ঠানটি।

দেশের উত্তরাঞ্চলে পাবনার চাটমোহর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও বাঘাবাড়ি এবং রংপুরে স্থাপিত ডেইরি হাবের প্রতিটিতে ২০টি করে দুধ সংগ্রহ ও শীতলীকরণ কেন্দ্র খামারিদের ঘিরেই গড়ে তোলা হয়েছে। এতে দ্রুত ও সহজে খামারিরা তাদের গরুর দুধ এসব কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারছেন। প্রাণ ডেইরি লিমিটেডের চিফ ডেইরি অপারেশন রাকিবুর বলেন, “দুধের গুণাগুণ জানতে সংগ্রহ কেন্দ্রে প্রথমে ওরগানোল্যাপটি টেস্ট করা হয়। এর মাধ্যমে দুধে ফরেন পার্টিকেল, ময়লা আছে কি না, দুধের স্বাদ ও গন্ধ অক্ষুণ্ন রয়েছে কি না তা জানা যায়।

“এছাড়া আল্ট্রাসনিক মিল্ক অ্যানালাইজার মেশিন দিয়ে দুধে ননীর পরিমাণ, প্রোটিন ও সলিড অংশ এবং দুধে পানি আছে কি না তা নির্ণয় করা হয়।” এরপর কেমিকেল অ্যানালাইসিস করে দুধের ফ্যাট, সিএলআর, সিওবি, সোডা, অ্যালকোহলিক ও ফরমালিন টেস্ট করে সব কিছু সঠিক থাকলে খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয় বলে জানান তিনি।

সংগ্রহ কেন্দ্র থেকে দুধ প্রাণ ডেইরির নরসিংদী কারখানার মাদার সেন্টারে নিয়ে আসা হয়। এখানে পুনরায় আধুনিক কিউসি ল্যাবে দুধের মাইক্রোবায়োলজিক্যাল টেস্ট করা হয়। এতে করে দুধ কোনো অসুস্থ গরুর কি না, ব্যাকটেরিয়া আছে কি না, দুধে ভেজাল বা তেলের মিশ্রণ রয়েছে কি না তা নির্ণয় করা হয়। খামারিদের নিয়ে আসা দুধের গুণাগুণ পরীক্ষা করেন এ কেন্দ্রের কোয়ালিটি ইনচার্জ মো. আসাদ হোসেন।

তিনি বলেন, দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় প্রায় দুই হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়। ডিজিটাল মেশিনে একটি টেস্ট করতে এক মিনিটের মত সময় লাগে জানিয়ে আসাদ বলেন, “টেস্টে সব ধরনের গুণাগুণ বজায় থাকলেই কেবল আমরা দুধ গ্রহণ করি, অন্যথায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।” গত ৪ এপ্রিলের দুধ সংগ্রহের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন,  ওই দিন ৩৭ জন খামারি এক হাজার ৬৩৮ লিটার দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ একজন খামারি ১৪৮ লিটার ও সর্বনিম্ন আরেকজন তিন লিটার দুধ দিয়ে যান।

ওই দিন এক খামারির আনা দুধে কৃমির জীবাণুর অস্তিত্ব শনাক্ত হলে দুধ গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান আসাদ। “বিষয়টি খামারিকে জানানোর পাশাপাশি আমার অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। কারণ এসব গাভীর চিকিৎসাও আমাদের কোম্পানির টিম দিয়ে থাকেন।” ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রাণ ডেইরি লিমিডেটের আরও পাঁচটি হাব স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এতে করে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন প্রাণ ডেইরির কোয়ালিটি ইনচার্জ আসাদ । টেট্রাপ্যাক ও উন্নতমানের ফুড গ্রেডেড ফয়েল প্যাকে বাজারে প্রাণ ডেইরির দুগ্ধজাত যেসব পণ্য পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে, ইউএইচটি ও পাস্তুরিত তরল দুধ, গুঁড়ো ‍দুধ, ঘি, মাখন, পনির, লাচ্ছি, দই, মাঠা, লাবাং, চিজ ও ফ্লেভার্ড মিল্ক।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: