বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে তিন ট্রেনের সংঘর্ষ

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে তিন ট্রেনের সংঘর্ষ

ভারতের ইতিহাসে আরেক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা দেখলো দেশটি। তিনটি ট্রেনের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮৮ জন এবং আহতের সংখ্যা ৯০০ জন। ধ্বংসস্তূপে অনেকেই আটকা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে করে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে আশঙ্কা কর্তৃপক্ষের।

শুক্রবার (২ জুন) সন্ধ্যা সাতটার দিকে ওড়িশার বালেশ্বর জেলার বাহাঙ্গাবাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। বালেশ্বরে রাতভর উদ্ধারকাজ চলেছে, এখনো চলছে। একের পর এক মরদেহ বের করে আনা হচ্ছে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বগিগুলো থেকে। কিন্তু তিনটি ট্রেনের সংঘর্ষ কীভাবে হলো? এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।

দুর্ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা থেকে ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে আর ওড়িশার ভুবনেশ্বর থেকে ১৭০ কিলোমিটার উত্তরে। ভারতীয় রেলওয়ের নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ শর্মা জানান, মূলত দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন চেন্নাইগামী করমন্ডল এক্সপ্রেস এবং কলকাতাগামী বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস এ দুর্ঘটনায় সরাসরিভাবে জড়িত ছিল এবং তৃতীয় একটি মালবাহী ট্রেন যা ঘটনাস্থলে দাঁড় করানো ছিল, দুর্ঘটনায় শিকার হয়।

তবে দুর্ঘটনা কী করে ঘটেছে, তার একাধিক বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় এক সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে চেন্নাইগামী করমণ্ডল এক্সপ্রেসই তীব্র গতিতে গিয়ে ধাক্কা মারে একই লাইনে সামনে চলতে-থাকা একটি মালবাহী ট্রেনের পিছনে।

ধাক্কা এতটাই তীব্র ছিলো যে চেন্নাইগামী করমণ্ডল এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনটি মালবাহী ট্রেনের উপরে উঠে যায়। ফলে ২৩টি বগির মধ্যে ১৫টি বগি ছিটকে পড়ে আশে-পাশে। ঠিক তখনই পাশের লাইন দিয়ে আসছিল ডাউন বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। করমণ্ডল এক্সপ্রেসের লাইনচ্যুত বগিগুলি গিয়ে পড়ে ডাউন লাইনের উপর। বেঙ্গালুরু-হাওড়া ডাউন ট্রেনটি সেই লাইনচ্যুত বগিগুলির উপর এসে পড়লে হাওড়াগামী ট্রেনটিরও দু’টি বগি লাইনচ্যুত হয়।

তবে রেলের একটি সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, মালবাহী ট্রেনের সাথে করমণ্ডল এক্সপ্রেসের কোনও সংঘর্ষ হয়নি। কোনও কারণে প্রথমে করমণ্ডল এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়। সেটি গিয়ে পড়ে পাশের ডাউন লাইনে। সেই লাইন ধরে তখন আসছিল ডাউন বেঙ্গালুরু-হাওড়া সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস। সেটি এসে ধাক্কা মারে করমণ্ডলের লাইনচ্যুত কামরাগুলিকে। সেই ধাক্কার অভিঘাতে করমণ্ডলের ইঞ্জিন তৃতীয় লাইনে দাঁড়িয়ে-থাকা মালগাড়ির উপরে উঠে যায়।

রেল সূত্রটি জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় মালবাহী ট্রেনটি এবং করমণ্ডল এক্সপ্রেস একই লাইনে ১৩ মিনিটের ব্যবধানে খড়গপুর থেকে ছাড়ে। বালেশ্বর স্টেশন ছাড়িয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার যাওয়ার পরে দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক অনুমান, করমণ্ডল এক্সপ্রেসের চালক যে ওই ১৩ মিনিটের গতির ব্যবধান কমিয়ে ফেলেছেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি। কারণ হিসাবে সিগন্যালের ত্রুটি বা চালকের বেখেয়ালি ধারণা করা হচ্ছে।

তবে দুর্ঘটনার কোনও কারণই নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। বিভাগীয় তদন্ত শুরু হলে এর সঠিক কারণ জানা যাবে। আপাতত অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে হতাহতদের উদ্ধারে এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে লাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উপর।

দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে নেমেছেন ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিলিফ ফোর্সের (এনডিআরএফ) সদস্যরা। রয়েছে ওড়িশা ডিজাস্টার র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সও (ওডিআরএএফ)। উদ্ধারকাজে বিমান বাহিনীর সহায়তা চেয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব।

করমন্ডল এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী ছিলেন অনুভব দাস। দুর্ঘটনার বিষয়ে টুইটে অনুভব বলেন, ‘হাওড়া থেকে চেন্নাইয়ে যাচ্ছিলাম। দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেছি, এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। নিজের চোখে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে প্রাণ হারাতে দেখেছি। রেললাইনের ওপর ছোপ ছোপ রক্ত, ছিন্ন–বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। এই দৃশ্য আমি কখনোই ভুলতে পারব না।’

রাজ্যে শনিবার এক দিনের শোক ঘোষণা করেছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তিনি। ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের প্রতি শোক জানিয়ে টুইট করেছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা আজ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেন।

ভারতের ওড়িশা রাজ্যের বালেশ্বর জেলায় শুক্রবার রেল দুর্ঘটনার পর শুরু হয় উদ্ধার কাজ। তবে রাতের অন্ধকারের কারণে উদ্ধারকাজে বাধা আসে দুর্ঘটনাটিকে ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এর আগে ২০১৩ সালে ওড়িশার জাজপুর জেলায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে করমন্ডল এক্সপ্রেস। এবারের দুর্ঘটনাস্থল থেকে সেটি ছিল মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: