সংগৃহীত
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ১২০ কোটি তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন। অথচ এ সময়ে বিশ্বে মাত্র ৪০ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৮০ কোটি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ব্যাংককের মূল পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী ও বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আগামী ৫০ বছরের উন্নয়ন নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন তিনি।
ভাষণের প্রস্তুতকৃত অংশে উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন মডেল, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অজয় বাঙ্গা বলেন, তিন বছর আগে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের কাজের পরিকল্পনা শুরুর সময় চ্যালেঞ্জ ছিল বড়, আর সম্পদ ছিল সীমিত। তিন বছর পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে, ঋণের বোঝা বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনও ঘটছে।
তিনি বলেন, আগামী এক দশক থেকে দেড় দশকে কর্মবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া ১২০ কোটি তরুণের বিপরীতে মাত্র প্রায় ৪০ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রজন্মই আগামী শতাব্দীকে রূপ দেবে। আজকের সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করতে সহায়তা করবে, সেই ভবিষ্যৎ কেমন হবে।
উন্নয়নের অর্থায়নে নতুন মডেল
অজয় বাঙ্গার মতে, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি– এই দুটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এ জন্য সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, জনহিতকর উদ্যোগ ও প্রযুক্তিকে একত্র করে প্রতিটি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়নের মডেল গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, যেসব দেশে প্রয়োজন বেশি এবং ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, সেখানে সরকারি ও স্বল্পসুদে বা সহজ শর্তে দেওয়া উন্নয়ন অর্থায়ন অপরিহার্য থাকবে। দেশগুলোর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগের ভূমিকা বাড়াতে হবে। সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায় হবে এমন অবস্থা, যখন উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আর বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রয়োজন থাকবে না।
বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ বেড়েছে তিন গুণ
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তথ্য তুলে ধরে অজয় বাঙ্গা জানান, ২০২২ অর্থবছরে, অর্থাৎ তাদের কাজের পরিকল্পনা শুরুর আগের বছরে, বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছিল। গত বছর এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। অর্থাৎ তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের নিজস্ব অর্থায়ন যুক্ত করে মোট অর্থায়নের পরিমাণ ২৩০ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
এই অগ্রগতি বিভিন্ন আয়স্তরের দেশ ও অঞ্চলে দেখা গেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ সংগ্রহ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে তা বেড়েছে চার গুণ। আফ্রিকাজুড়েও এ ধরনের বিনিয়োগ সংগ্রহ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।
উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন দিগন্ত
উন্নয়ন অর্থায়নের পরিসর বাড়াতে ছয়টি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক বিনিয়োগ মূল্যায়ন, নথিভুক্তকরণ, কাঠামোবদ্ধকরণ ও হস্তান্তরের জন্য অভিন্ন পদ্ধতি তৈরির কাজ করছে বলে জানান অজয় বাঙ্গা।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহায়তায় আজ যে প্রকল্পে অর্থায়ন করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অন্য কোনো বিনিয়োগকারী যেন সেই প্রকল্পের বিনিয়োগ ধারণ করতে পারেন। এতে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মূলধন নতুন প্রকল্পে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
অজয় বাঙ্গার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাজারে এই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি হলে উদীয়মান বাজারের উন্নয়নভিত্তিক সম্পদের একটি নতুন শ্রেণি গড়ে উঠতে পারে। উদ্যোগটি সফল হলে উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর শুধু বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যালান্স শিটের আকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে উন্নয়নের গতিপথে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
কর্মসংস্থানের ঘাটতি শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়
অজয় বাঙ্গা বলেন, প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের সম্ভাব্য ঘাটতির পেছনে রয়েছে অসংখ্য তরুণের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাদের মধ্যে রয়েছেন এমন তরুণী, যাঁর ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরিদাতা নেই; আবার এমন তরুণও রয়েছেন, যার কারিগরি দক্ষতা আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই।
তিনি বলেন, একটি চাকরি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি মর্যাদার বিষয়। কর্মসংস্থানই নির্ধারণ করে, একজন তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবেন, নাকি ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকবেন।
তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো না গেলে এর পরিণতি এক দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। অন্যদিকে, তাঁদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এর সুফলও সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে। এ কারণেই উন্নয়নকে সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখার কথা বলেছেন তিনি।
আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে উন্নয়ন
ভবিষ্যতের উন্নয়ন মডেল সম্পর্কে অজয় বাঙ্গা বলেন, লক্ষ্য হওয়া উচিত গত প্রজন্মের উন্নয়ন মডেলকে নতুন করে তৈরি করা নয়; বরং আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মডেল গড়ে তোলা, যা দেশগুলোর অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হবে।
এ মডেলে যেখানে বাজারের পক্ষে এখনো পৌঁছানো সম্ভব নয়, সেখানে সরকারি অর্থায়ন ব্যবহার করতে হবে। বেসরকারি পুঁজি যেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কার্যক্রমের পরিসর বাড়াতে পারে, সেখানে তার ব্যবহার বাড়াতে হবে। নতুন ধারণা বিকাশ ও প্রাথমিক পর্যায়ের ঝুঁকি নিতে জনহিতকর উদ্যোগের সহায়তা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ডলারের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ভূমিকা হবে, প্রতিটি দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব উপাদানকে একত্র করা।
অজয় বাঙ্গা বলেন, কর্মসংস্থানের এই ঘাটতি একটি পূর্বাভাস মাত্র; এটি যে ভবিষ্যতে বাস্তবায়িত হতেই হবে, এমন নয়। উন্নয়নের নতুন মডেল কী দিতে পারে, তা দেখানোর কাজ শুরু হয়েছে। এখন প্রয়োজন, আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে এবং দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট














