সংগৃহীত
১৯৪৫ সালে জন্ম নেওয়া রঘু রাই নিজের জীবন দিয়েই জানতেন উদ্বাস্তু মানুষের জীবনের বেদনা। তার জন্মের সময়টা ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভীষণ উত্তাল ছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাকে দেয় শরণার্থীর অভিজ্ঞতা। পাঞ্জাবের ঝং জেলায় জন্ম নিয়েছিলেন তিনি।
রাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের যে ছবিগুলো তুলেছিলেন সেই বাস্তুচ্যুত ঘরছাড়া মানুষদের মাঝে তার শৈশবকেই বুঝি দেখেছিলেন। একই সাথে তার ক্যামেরায় তিনি বন্দি করেছিলেন মানবতার এক চরম বিপর্যয় আর যুদ্ধের নির্মম ক্ষয়।
২০১২ সালে ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতেই সেইসব ছবিগুলোর প্রদর্শনী হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল, ‘দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’। ছাপা হয়েছিল একটা অসাধারণ ক্যাটালগ।
রঘু রাই
রঘু রাই ১৯৭১ সালে এই ছবিগুলো তোলার পর এর ফিল্মগুলো খুঁজে পেয়েছিলেন প্রায় ৩৫ বছর পর। ফলে বোঝাই যাচ্ছে এই ছবিগুলো খুঁজে পাওয়ার পর তার মনের কী অবস্থা হয়েছিল। তাছাড়া এই দৈব ঘটনাটি না ঘটলে সবচেয়ে ক্ষতি হয়ে যেত আসলে বাংলাদেশেরই।
প্রসঙ্গত, আমরা মার্কিন চলচ্চিত্রকার লিয়ার লেভিনের কথা জানি তিনিও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের যে দুর্লভ কিছু ফিল্মিং করেছিলেন সেসবও প্রায় হারিয়েই যেত যদি না প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং তার স্ত্রী চলচ্চিত্রকার ক্যাথরিন মাসুদের যৌথ উদ্যোগে তা উদ্ধার না হতো। পরবর্তীকালে সেসব ফুটেজ সাথে কিছু নতুন সংযুক্ত করে নির্মিত হয়েছিল ‘মুক্তির গান (১৯৯৫)’। মুক্তিযুদ্ধের আরেক প্রামাণ্য ইতিহাস।

মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী; ছবি: রঘু রাই
পদ্মশ্রী ভূষিত রঘু রাই প্রায় পাঁচ দশক ধরে ছবি তুলেছেন। শিক্ষালাভ করেছেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কিন্তু সে পেশায় তিনি থাকেননি। তার আলোকচিত্রী বড় ভাই এস পলের সান্নিধ্য আর অনুপ্রেরণায় অনেকটা নাটকীয়ভাবে শুরু হয় তার আলোকচিত্রী জীবনের যাত্রা।
১৯৬৬ সালে দিল্লিতে দ্য স্ট্যাটসম্যান পত্রিকায় নিয়োগের বছর খানেকের মধ্যেই সেখানকার প্রধান ফটোগ্রাফার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এরপরে তার জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এর সূচনা ঘটে।
রাই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের যে ছবিগুলো তুলেছিলেন সেই বাস্তুচ্যুত ঘরছাড়া মানুষদের মাঝে তার শৈশবকেই বুঝি দেখেছিলেন। একই সাথে তার ক্যামেরায় তিনি বন্দি করেছিলেন মানবতার এক চরম বিপর্যয় আর যুদ্ধের নির্মম ক্ষয়।
ভারতের ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি থেকে দালাইলামা, মাদার তেরেসা, ইন্দিরা গান্ধীর মতো ঐতিহাসিক ও জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিদের তার ছবির বিষয়বস্তু করে তুলেছেন রাই। ক্যালকাটা, ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিকাল মাস্টার্স, এক্সপোজার, পোর্ট্রেট অফ আ কর্পোরেট ক্রাইম এর মতো ফোটোবুকগুলোয় হাজির আছে তার ছবির দর্শন ও রাজনীতি।
সাদাকালো ছবিই তুলেছেন বেশিরভাগ তবে রঙিন ছবিও তুলেছেন তিনি। তার ‘রঘু রাইস ইন্ডিয়া’ ফটোবুকটি রঙিন ছবির সংকলন। এ প্রসঙ্গে আরেক আলোকচিত্রী রঘুবীর সিং-এর কথা মনে পড়ে যায় কারণ রঘুবীর সিং ভারতকে দেখেছেন ভীষণ কালারফুল জায়গা থেকে রঘু রাই তা নয়। তিনি সাদা কালোর আবহেই একের পর এক ব্যালাড নির্মাণ করে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী; ছবি: রঘু রাই
প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে পারি আলোকচিত্রী স্টিভ ম্যাককারির কথা, তার তোলা রঙিন ছবিগুলোতে ভারত উপস্থাপিত হয়েছে আরেক মাত্রায়। সেসবের মাঝে রঘু রাই এক রোদন বিলাসী কান্নার মতো সরল আর দরদি আখ্যানকার। যিনি ভোপালের করুণ ট্রাজেডিকে এক মর্মন্তুদ মরমিড আবহে তুলে আনেন ছবিতে। জেমস ন্যাক্টওয়ের মতো নির্মম না হলেও বুকের ভেতর এক গভীর শূন্যবোধ, হাহাকার তৈরি করে রঘু রাই-এর ছবির নীরবতা।
একজন রঘু রাই-এর জন্য ৮৪ বছর তেমন কিছুই না। পৃথিবী তার ছবি ভুলবে কী করে। ঢাকার বেগআর্ট ইন্সটিটিউট অফ ফটোগ্রাফিতে বেসিক ফটোগ্রাফি করতে যাওয়া বন্ধুদের কাছেই প্রথম তার ছবির আলাপ শুনি।
সময়টা ২০০০/২০০১ সাল। তখন আমি ছবি বলতে শার্প ফোকাসড ক্যালেন্ডার ইমেজকেই বুঝি। বন্ধুদের কাছেই রঘু রাই-এর কাজের নানাবিধ প্রশংসা আর কিছু ছবি দেখার পর একে একে আমাদের চোখের সামনে খুলে যায় তার ছবির দুনিয়া।
আজ আমরা যাকে কেন্ডিট ছবি বলছি বিশ্বজুড়ে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি যেভাবে একটা বড় জনরা হয়ে উঠেছে সেই ধারার ভারতে তাকে পাইওনিয়ার বললে একদম বাড়িয়ে বলা হবে না। তিনি তার ছবিতে যে মানুষদের তুলে ধরেছেন তাদের মাঝে যেমন জাতীয় নেতাদের আমরা দেখি আবার একই সাথে তিনি সমাজের নিম্নবর্গের মানুষের যে বেঁচে থাকার প্রাণপ্রাচুর্য সেসবও তুলে ধরেছেন।
চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ বলেন, রঘু রাই-এর ছবিতে কলকাতার যে জনজীবন ফুটে উঠেছে তাতে দেখা যায় সবাই হাস্যোজ্জ্বল। এই ছিল তার দেখা।
রঘু রাই
কলকাতার মানুষের এই প্রাত্যহিকতাকে তিনি সবসময় জীবন প্রাচুর্যে ভরপুর হিসেবেই দেখেছেন। ছিন্নমূল নিচুতলার মানুষের প্রাত্যহিক মুহূর্তরাজি রঘু রাই-এর কাজের সবচেয়ে বড় বিষয়। তবে এই দেখবার ভঙ্গিটুকু তিনি কোথায় পেয়েছিলেন? কে তাকে প্রেরণা দিয়েছিল? এই প্রসঙ্গে চলে আসে আরেকজন দিকপালের নাম তিনি ফরাসি আলোকচিত্রী হেনরি কার্টিয়ার-ব্রেসন।
আলোকচিত্রী হেনরি কার্টিয়ার-ব্রেসন, রঘু রাই-এর জীবনে আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ম্যাগনাম ফটো এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা নামজাদা আলোকচিত্রী তিনি। ১৯৭১ সালে প্যারিসে রঘু রাই-এর সলো এক্সিবিশন (যার বিষয়বস্তু ছিল শরণার্থী) দেখে তার প্রতি আগ্রহী হন।
পরবর্তীকালে হেনরি কার্টিয়ার-ব্রেসন, রঘু রাই-এর মেন্টর হয়ে ওঠেন। ব্রেসন আর রঘু রাই যেন এক পরম্পরা। দুইজনের কাজে যে ঐক্য বা ব্রেসন যেভাবে রাইকে প্রাণিত করে গেছেন তা তার কাজের কম্পোজিশন তার দেখবার ভঙ্গি সব জায়গায় বেশ স্পষ্ট।
...আলোকচিত্রী রঘুবীর সিং-এর কথা মনে পড়ে যায় কারণ রঘুবীর সিং ভারতকে দেখেছেন ভীষণ কালারফুল জায়গা থেকে রঘু রাই তা নয়। তিনি সাদা কালোর আবহেই একের পর এক ব্যালাড নির্মাণ করে গেছেন।
ব্রেসনের ক্ল্যাসিকাল কম্পোজিশনগুলো তাকেও প্রভাবিত করেছিল বুঝি। কারণ তার ছবির আঙ্গিকে ব্রেসনের প্রভাব বেশ স্পষ্ট। ব্রেসনই রঘু রাইকে ম্যাগনাম ফটোস এর সদস্য হওয়ার জন্য মনোনীত করেছিলেন। পরবর্তীতে রঘু রাই প্রথম ভারতীয় হিসেবে ১৯৭৭ সালে ম্যাগনাম ফটোস এর পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করেন।

উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান; ছবি: রঘু রাই
রঘু রাইকে সামনে থেকে কোনোদিন দেখিনি। যদিও বহুবার তিনি ঢাকায় এসেছেন কাজের সূত্রে। প্রায় ৬০টি ফটোবুক প্রকাশ করে গেছেন তার জীবদ্দশায়। তার কন্যা আভানি রাই তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম (এন আনফ্রেমড পোর্ট্রেইট, ২০১৭)।
ছবিতে যতটুকু দেখা রঘু রাই বিশেষ এক ধরনের কালো রঙের আলখাল্লা টাইপ পোশাক পড়তেন, তার এই বিশেষ ধরনের কস্টিউমের পেছনে কি কোনো ভাবনা ছিল তার? তা আজ অজানাই রয়ে গেলো। রঘু রাই পরবর্তী ভারতীয় আলোকচিত্রে নিশ্চয়ই তার পরম্পরা তৈরি হয়েছে বিশেষ করে দয়ানিতা সিং-এর নাম তো অনায়াসেই বলা যায়।
তবে বাংলাদেশে আলোকচিত্রী মুনেম ওয়াসিফের কাজে রঘু রাই-এর প্রভাব লক্ষণীয়। মুনেমের ‘বিলংগিং’ ফটোবুকটি রঘু রাইয়ের পরম্পরা বহন করে বলে আমি মনে করি। অন্তত কাজের স্টাইলের ক্ষেত্রে একটা যোগসূত্র রয়েছে তাদের দুজনের মধ্যে।
রঘু রাই
রঘু রাই সারা পৃথিবীর আলোকচিত্রের অনুরাগীদের কাছে, ভারতীয়দের কাছে নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবেন আর আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা তাকে মনে রাখবো মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলোর জন্য বিশেষ করে। শরণার্থী শিবির আর যশোর রোডের সেই ছবিগুলো আরেক বিদেশি কবি অ্যালেন গিন্সবার্গকে মনে করিয়ে দেয় আমাদের।
সেই পথ ধরে রঘু রাই আমাদের দুর্দিনের বন্ধু ছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইয়ে তিনিও তার ক্যামেরার মাধ্যমে সামিল হয়েছিলেন। আলোকচিত্রী কিশোর পারেখ, রশিদ তালুকদার-এর মতো রঘু রাইকেও আমরা কোনোদিন ভুলব না।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট












