সংগৃহীত
পিরোজপুরে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এনে মেসে অস্থায়ী কেয়ারটেকার মো. ইউনুস ফকিরকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) দুই পুলিশ কনস্টেবলকে পুলিশ লাইনে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মঞ্জুর আহম্মেদ সিদ্দিকি।
প্রত্যাহার হওয়া তিনজন হলেন জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম, বিপি নম্বর ৮১০৮১২৮৬৬৩, পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র)। কনস্টেবল মো. কাওসার ও কনস্টেবল মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
ভুক্তভুগী মো. ইউনুস ফকির (৪০) পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের মৃত মোবারেক আলী ফকিরের ছেলে। তিনি দুই মেয়ের জনক। পুলিশ অফিসার্স মেসের অস্থায়ী কেয়ারটেকার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় তার পরিবার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানিয়েছেন।
ইউনুসের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) টাকা চুরির অভিযোগে ইউনুসকে ডিবি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের সময় অমানবিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করে। এমনকি তার শরীরের সংবেদনশীল স্থানে মোমের আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। ঘটনাটি গোপন রাখতে প্রথমে তাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি না করে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকদের কাছেও প্রকৃত ঘটনা বলতে বাধা দেওয়া হয়। পরদিন (১৪ এপ্রিল) পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও নির্যাতনের প্রকৃত ঘটনা গোপন রাখতে ইউনুসকে ভিন্ন বক্তব্য দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। পরবর্তীতে ইউনুসকে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি ইউনুসের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনার পর ওই মেসে কাজ করা ঝাড়ুদার শাকিলকে ডেকে পাঠান। জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং পুলিশ সেই টাকা উদ্ধার করে। এরপর ইউনুস প্রথমে যে টাকা দিয়েছিল সেগুলো তাকে ফেরত দেওয়া হয়। এ ছাড়া, পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবে না এই আশঙ্কায় তারা কোথাও কোনো অভিযোগ দেননি।
ইউনুসের ভাই আনিসুর রহমান বলেন, আমার ভাইয়ের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা চরম অমানবিক। যেভাবে আমার ভাইকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে তার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। আমার ভাইয়ের জীবন পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। আমার ভাইয়ের পর্যাপ্ত চিকিৎসা দরকার। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত ও বিচার চাই।
ইউনুসের ভাইয়ের মেয়ে মাহমুদা বলেন, আমরা অনেকবার আরিফ স্যারসহ সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, ওনারা আমাদের কোনো কথাই শোনেননি। আমার চাচাকে অনেক মেরেছেন। আমরা এর উপযুক্ত বিচার চাই। কি করবে আমরা চাচা কীভাবে কাজ করবে ওনি তো এখন প্রায় অচল।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. স্বাগত হাওলাদার বলেন, তার (ইউনুস) শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং পুরুষাঙ্গে পোড়ার আলামত পাওয়া গেছে। তিনি বর্তমানে জেলা হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে আরিফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনাটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে জানান। তিনি কোনো নির্যাতন করেননি, তবে রিপন নামে তাদের এক সোর্স রান্নাঘরে নিয়ে মোমবাতির ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তিনি এ ঘটনায় এমন নির্যাতন কখনোই করেনি।
পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মঞ্জুর আহম্মেদ সিদ্দিকি বলেন, প্রথমে আমরা বিষয়টি জানতে পারিনি। সঙ্গে সঙ্গেই একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছ। একইসঙ্গে ডিবির ওসি আরিফসহ দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনুসকে চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব জেলা পুলিশ বহন করবে এবং সুস্থ হয়ে সে স্বপদে কাজ করবে।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট










