রোববার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩

‘উদ্ধার মুষ্টিবদ্ধ চুল’ ঘিরে বৃদ্ধা ফিরোজার মৃত্যু রহস্য খুঁজছে পুলিশ

‘উদ্ধার মুষ্টিবদ্ধ চুল’ ঘিরে বৃদ্ধা ফিরোজার মৃত্যু রহস্য খুঁজছে পুলিশ

সংগৃহীত

আগে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সেটি বাদ দিয়ে টিউশনি করেই চলতো নিজের জীবন। ২৫ বছর আগে পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরে করা বিয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার পর একাকীত্বেই কাটছিল ফিরোজা খানম জোসনার (৬৮) জীবন। পরিবারের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলেও সাক্ষাৎ হতো খুবই কম। রাজধানীর পল্লবী থানাধীন ডি-ব্লকের ৮ নং সড়কের ২৯ নং বাসায় গত ১৫ বছর ধরে তার বসবাস। সাড়ে ছয় তলাবিশিষ্ট ওই ভবনের সামনে সুপ্রশস্ত রাস্তা। অত্যন্ত নিরিবিলি চলতেন তিনি। সবার সঙ্গেই সখ্য ও ভালো সম্পর্ক থাকলেও নিজের ঘরে কাউকে প্রবেশের অনুমতি দিতেন না ফিরোজা।

ভবনের দ্বিতীয় তলায় তিনটি কক্ষের মধ্যে দুটি সাবলেট দিয়ে নিজে একটি কক্ষে একা বসবাস করতেন ৬৮ বছর বয়সী জোসনা। নিজের রান্না নিজেই করতেন তিনি। এলাকায় নির্ঝঞ্ঝাট হিসেবে পরিচিত সেই ফিরোজা খানম জোসনাই নির্মমভাবে খুনের শিকার হয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ভবনের কেয়ারটেকারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দুপুরে পল্লবীর ওই ভাড়া বাসা থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। ফিরোজা খানম একসময় স্থানীয় ‘হলি ক্রিসেন্ট আইডিয়াল স্কুল’ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন।

সুরতহাল প্রতিবেদন, সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা পুলিশ সদস্য ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাশবিক কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ফিরোজাকে। গলা ও মুখের কাছে চিকন রশির মতো একটি ফিতা দেখা গেছে, যা রক্তে ভিজে গাঢ় হয়ে গিয়েছিল। মরদেহের পাশ থেকেই একটি রক্তমাখা হাতুড়ি উদ্ধার করেছে পুলিশ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের ধারণা, নির্মমভাবে হাতুড়িপেটা করে ফিরোজা খানমকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতুড়িসহ রক্তমাখা ওড়না উদ্ধার করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি বা আসামিরা ওই হাতুড়ি দিয়ে ভুক্তভোগীর মাথার বাম পাশে এবং মাঝখানে আঘাত করে থেঁতলানো ও রক্তাক্ত জখম করেছে। তার থুতনির ওপরেও আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। এটি যে একটি হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত পুলিশ।

প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে বিকেলে ফিরোজা খানমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। মরদেহের ময়নাতদন্তের সময় ভুক্তভোগীর হাতের মুষ্টি শক্ত করে বন্ধ দেখা যায়। এক হাতের মুষ্টিতে বড় বড় কিছু চুল পাওয়া গেছে। সেই চুল ঘাতকের কি না, তা নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভবনের তিনজন সাবলেট বাসিন্দা ও কেয়ারটেকারসহ আরও কয়েকজন বাসিন্দার চুলের নমুনা সংগ্রহ করে সিআইডির ফরেনসিক টিম ল্যাবে পাঠিয়েছে।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) গিয়ে দেখা যায়, পিবিআই ঢাকা মেট্রো-উত্তরের একটি তদন্ত দল ওই ফ্ল্যাটের সাবলেট ভাড়াটিয়া পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। 

ভবনের দ্বিতীয় তলায় সরেজমিনে দেখা যায়, ফিরোজা খানম যে কক্ষে থাকতেন সেটি তালাবদ্ধ। মাঝখানে ছোট একটি ডাইনিং স্পেস এবং দুই পাশে দুটি কক্ষ। ডাইনিং স্পেসের পাশেই রান্নাঘর ও একটি বাথরুম। দুটি কক্ষ সাবলেট নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন মুন্সি রাজু আহমেদের পরিবার। স্ত্রী নুরুন্নাহার ও মেয়ে তাসনিমকে (১৮) নিয়ে বৃদ্ধ মুদি দোকানি রাজুর সংসার। 

তাদের দাবি, ঘটনার আগেই তারা গ্রামের বাড়ি মাগুরায় গিয়েছিলেন।

সাবলেট ভাড়াটিয়া মুন্সি রাজু আহমেদ ঢাকা পোস্টকে জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি মাগুরা সদরের বেরোইল ইউনিয়নের বেরোইল পলিতায়। ১৬ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) ভোরে তারা গাবতলীতে যান। সেখানে বাস না পেয়ে কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের পৌনে ৭টার একটি বাসে তিন সদস্যের পরিবার মাগুরা যায়। ১৭ এপ্রিল (শুক্রবার) দুপুর সাড়ে ১২টায় তারা ঢাকায় ফেরেন।

মুন্সি রাজু আহমেদ বলেন, ঢাকা ফেরার পথে আরিচা ঘাট পার হওয়ার পর পাশের বাসার একজন ফোন করে জানান যে ফিরোজা খানম খুন হয়েছেন এবং বাসায় পুলিশ এসেছে। প্রথমে বিশ্বাসই করিনি। বাসায় ফেরার পর দেখি সত্যিই পুলিশসহ উৎসুক জনতার ভিড়। কে বা কারা খুন করেছে, তা আমরা জানি না।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে ফিরে আর বের হননি ফিরোজা

নিহত ফিরোজা খানমের ওই ২৯ নম্বর বাসার নিরাপত্তা প্রহরী আব্দুল মান্নান (৭৪) ঢাকা পোস্টকে জানান, ফিরোজা খানম বাইরে গিয়ে মাঝেমধ্যে দুপুরে ফিরতেন, আবার কখনো সকালে বের হয়ে রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে বাসায় ফিরতেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে তিনি বাসায় ফিরেছিলেন। 

আব্দুল মান্নান আরও জানান, গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ফিরোজা খানম বের হননি। তিনি একটি কক্ষ নতুন করে সাবলেট দেওয়ার জন্য ভাড়ার নোটিশ দিয়েছিলেন। সেটির জন্য একজন আগ্রহী ভাড়াটিয়া তার নাম্বারে বারবার ফোন করেও সাড়া পাচ্ছিলেন না। বিষয়টি জানতে পেরে খোঁজ নেওয়ার জন্য গিয়ে দেখি দরজা খোলা। এরপর ভেতরে রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পাই। পাশের বাসার একজন ভাড়াটিয়াকে জানানোর পর পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতেন না ফিরোজা খানম

মুন্সি রাজু আহমেদের মেয়ে ও নার্সিং কলেজের ছাত্রী তাসনিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফিরোজা আন্টি ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতেন না। কাউকে তার বাসায় আসতেও কখনো দেখিনি। তবে আমি গত ৪ মাসে ৪-৫ বার ঢুকেছি; তিনি কখনো বিষয়টি ভালোভাবে নিতেন না। একদিন তাকে ঘরে তাবিজ লিখতে দেখেছি। তিনি নিজে তাবিজ পরতেন এবং ঘরে তাবিজ লেখার বইও দেখেছি। রাতে গুন গুন করে কী সব যেন আওড়াতেন; বলতেন আমল করি। তিনি কারো সাথে আগবাড়িয়ে কথা বলতেন না, তবে সালাম দিলে উত্তর দিতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি দুপুরের পর বের হতেন এবং ফিরতেন রাতে। বলতেন টিউশনি করেন। আদতে তিনি কী করতেন তা স্পষ্ট নয়, কারণ টিউশনির কোনো ছাত্র-ছাত্রী কিংবা অভিভাবককে কখনো আসতে দেখিনি।

ফিরোজা নয়, ‘সালমা’ নামেই পরিচয় জানতেন সবাই

তাসনিম বলেন, আমরা তো তার নাম জানতাম সালমা। কিন্তু মৃত্যুর পর পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি তার নাম ফিরোজা খানম। আমরা এই এলাকায় জন্ম থেকেই আছি; তিনিও নাকি ১৫ বছর ধরে এই এলাকায় বসবাস করেন। শুধু আমরা নই, আশপাশের অনেক মানুষ তাকে সালমা নামেই চিনতাম। এর কারণ জানি না।

অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফিরোজা খানম নিজেকে বিবাহিত ও দুই সন্তানের মা দাবি করতেন। বলতেন তার স্বামী একজন কর্নেল, নাম তাহের। তার খালার বাসা মতিঝিল এবং ছেলে বুয়েটে পড়ে বলে দাবি করতেন। মেয়ে আছে বলেও জানাতেন, তবে তাদের কাউকেই কখনো দেখা যায়নি।

কথা বলতে চায় না পরিবার

মামলার নথি অনুযায়ী বাদী নিহতের ছোট ভাই মো. ফিরোজ আলম (৬২)। তাদের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম সদরের কৃষ্ণপুর মুন্সিপাড়ায়। তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকার মতিঝিলে থাকলেও বোনের সঙ্গে তার সখ্য বা যোগাযোগ ছিল না। গত শুক্রবার ভবনের কেয়ারটেকার আব্দুল মান্নান দুপুর পৌনে ১২টায় ফোন করে তাকে বোন ফিরোজা খানম খুন হওয়ার খবর জানান। ওই খবরে আরেক ছোট ভাই সামসুল আলমসহ তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

যোগাযোগ করা হলে মামলার বাদী ফিরোজ আলম বলেন, বোনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কেন ছিল না, এত বিস্তারিত আমি বলতে চাই না। বোনের মৃত্যু ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না। বিষয়টি এখন পুলিশ দেখছে, আমি মামলা করেছি। 

মামলায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ভুক্তভোগী ফিরোজা খানম টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

দুই সন্দেহ মাথায় রেখে তদন্ত করছে পুলিশ

মরদেহ উদ্ধারের ৩৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পল্লবী থানা পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা চুরি-ডাকাতি বা পূর্বশত্রুতার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে তদন্ত করছেন। এখন পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, কারণ ভবনের সিঁড়ি কাভার করে এমন কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে বাসার অন্যান্য ভাড়াটিয়া, কেয়ারটেকার ও সাবলেট বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুলিশ নিবিড়ভাবে কাজ করলেও এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের কূল-কিনারা মেলেনি।

ফিরোজার হাতে থাকা এক মুষ্টি চুল ঘিরে রহস্য

সাবলেট বাসিন্দা মুন্সি রাজু আহমেদের মেয়ে তাসনিম ঢাকা পোস্টকে জানান, গত রাতে তাদের থানায় ডেকে নিয়ে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সালমা (ফিরোজা) আন্টির হাতের মুষ্টিতে লম্বা চুল দেখা গেছে। অন্য কারো কি না, তা যাচাই করতে তাদের তিনজনের চুলের নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আল-আমিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুনেছি তিনি একটু আধ্যাত্মিক ঘরানার জীবনযাপন করতেন এবং তাবিজে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে আমরা ঘটনাস্থল থেকে তাবিজ জাতীয় কিছু পাইনি। ময়নাতদন্তের সময় তার হাতের মুষ্টিতে সজোরে বা শক্ত করে আটকানো একমুষ্টি চুল দেখা গেছে। সেগুলো উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্রসম্যাচ করতে সাবলেট বাসিন্দাসহ আরও কয়েকজনের চুলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মামলাটি তদারকি করছেন। মরদেহের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে ঘটনাটি রাতে ঘটেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। 

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট