বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রশ্নের মুখে ট্রাইব্যুনাল, স্বচ্ছ তদন্তের তাগিদ

প্রশ্নের মুখে ট্রাইব্যুনাল, স্বচ্ছ তদন্তের তাগিদ

সংগৃহীত

ক্ষমতার পালাবদলের হাওয়া লেগেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে; সম্প্রতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন চিফ প্রসিকিউটর। কিন্তু দায়িত্ব হস্তান্তরের রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এলো এক চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদি আত্মদানের ওপর দাঁড়িয়ে যে বিচারিক পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল দেশ, সেখানে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের ওপর ন্যস্ত ছিল জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব, অথচ সেখানেই এবার হানা দিয়েছে ‘কোটি টাকার ঘুষ’ বাণিজ্য।

একজন হেভিওয়েট আসামিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থের দরকষাকষি এবং সেই সংশ্লিষ্ট ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় স্তম্ভিত পুরো দেশ। এই ঘটনা কেবল একজন প্রসিকিউটরের ব্যক্তিগত নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং খোদ ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। অর্থের বিনিময়ে কি তবে থমকে যাবে শহীদের রক্তের ঋণ?

ঘটনার নেপথ্যে

প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর গত ৯ মার্চ পদত্যাগ করেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার। শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাওয়ার কথা বলে পদ ছাড়লেও ওই দিনই তার দুটি ফোনালাপ গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। অডিওতে চট্টগ্রাম-৬ আসনের তৎকালীন এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিনের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করতে শোনা যায় তাকে। ফোনের অপর প্রান্তে ছিলেন ওই আওয়ামী লীগ নেতার আইনজীবী ও প্রাক্তন স্ত্রী রিজওয়ানা ইউসূফ। যদিও সাইমুম রেজা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করার কথা জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য পদত্যাগী প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম কলেজছাত্র হত্যা মামলার আসামি সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিন করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া দুটি ফোনালাপে তাকে অর্থ লেনদেন এবং কিস্তিতে পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা করতে শোনা যায়। যদিও অভিযুক্ত প্রসিকিউটর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন

বিজ্ঞাপন

প্রসিকিউটর হওয়ার আগে সাইমুম রেজা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল-এর জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ছিলেন। এছাড়া গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তি দপ্তরের অধীন ‘জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম’-এর আইনবিষয়ক সম্পাদকের পদেও তার নাম রয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল ও মামলার প্রেক্ষাপট

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন এবং আগামী ১৬ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করেছেন আদালত। এর আগে ১২ জানুয়ারি শুনানির সময় ফজলে করিমের আইনজীবী ও প্রাক্তন স্ত্রী রিজওয়ানা ইউসূফ তার মক্কেলের স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তার বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। এমনকি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামকে জড়িয়ে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগও তোলেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের নাম-পরিচয়সহ আবেদন জমা দিতে বলেন।

 জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিম হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল / ফাইল ছবি

প্রসিকিউটর পরিবর্তন ও ঘুষের প্রস্তাব

প্রসিকিউশন সূত্র মতে, এই মামলার দায়িত্ব কয়েক দফায় বিভিন্ন প্রসিকিউটরের হাতে গিয়েছে। শুরুতে সাইমুম রেজা তালুকদার ও আবদুল্লাহ আল নোমান দায়িত্ব পালন করলেও পরে তাদের সরিয়ে মঈনুল করিমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। মঈনুল তদন্তের কাজে চট্টগ্রামে গিয়ে সাক্ষীও সংগ্রহ করেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে মাত্র দুই মাসের মাথায় মামলাটির দায়িত্ব পুনরায় সাইমুম রেজার কাছে ফিরে আসে।

মামলার দায়িত্ব রহস্যজনকভাবে বারবার পরিবর্তন করা এবং সাইমুম রেজাকে সরিয়ে পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফাঁস হওয়া অডিওতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নজরে বিষয়টি আসার পর সাইমুমকে এই মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে

অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগেই জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফজলে করিমের পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন সাইমুম। ফাঁস হওয়া ফোনালাপ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি আইনজীবী রিজওয়ানার সঙ্গে এ বিষয়ে দফায় দফায় কথা বলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তাকে এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার পাশাপাশি সেই অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব দিতেও শোনা যায়।

ফাঁস হওয়া ফোনালাপের চুম্বক অংশ

ফোনালাপে সাইমুমকে বলতে শোনা যায়, ‘টোটাল অ্যামাউন্টটা বলব, নাকি এখন আপাতত একটি অ্যামাউন্ট বলব?’ জবাবে রিজওয়ানা বলেন, ‘টোটাল বলো, আপাততও বলো... অসুবিধা নেই বলো ভাইয়া।’ তখন সাইমুম বলেন, “আমি একটা হিন্টস দিয়েছিলাম যে, যদি আলটিমেটলি একটা ব্যবস্থা করানো যায়, তাহলে সব মিলিয়ে ওনার ব্যাপারে আমার একটা এক্সপেক্টেশন থাকবে যে ‘এক’ (এক কোটি)। তারপর সেটার মধ্যে ভেঙে ভেঙে যেটাই হোক। এখন ধরেন ২০, ২০ (লাখ)... সেটা হলো।” ফোনের ওপার থেকে তখন রিজওয়ানা কেবল ‘হ্যাঁ’ সূচক শব্দ করে সায় দেন।

মামলা থেকে অব্যাহতি ও সাইমুমের প্রতিক্রিয়া

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, এই চাঞ্চল্যকর ফোনালাপটি তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নজরে আসার পরই ফজলে করিমের মামলা থেকে সাইমুম রেজাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে, এ বিষয়ে সাইমুম রেজার বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘একজন চিফ প্রসিকিউটর কাকে কোন মামলায় রাখবেন কি রাখবেন না, সেটি পুরোপুরি তার নিজস্ব এখতিয়ার।’ অর্থাৎ, মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে এই ফোনালাপের কোনো সম্পর্ক নেই বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

‘কোটি টাকা’ চেয়ে একাধিকবার ফোন করার অভিযোগ নাকচ করে দেন ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার / ঢাকা পোস্ট

সাইমুম রেজার আত্মপক্ষ সমর্থন

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইমুম রেজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এই মামলায় বারবার প্রসিকিউটর পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কেন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করা হলো না, সেই দায় প্রসিকিউশনের নয়, বরং তদন্ত সংস্থার। চট্টগ্রামের ওই ঘটনায় পুলিশের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু ছিল, সেই জবাব তদন্ত সংস্থাকেই দিতে হবে। রাস্তায় মানুষ মারা গেছে অথচ পুলিশের ভূমিকা কী ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে না কেন?’

এই চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করেছেন বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে বিচার ব্যবস্থার জন্য ‘মর্মান্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা মনে করেন, বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখতে নিছক প্রশাসনিক তদন্ত নয়, বরং একটি নিরপেক্ষ ও বহুপাক্ষিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি

কোটি টাকা চেয়ে একাধিকবার ফোন করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা অভিযোগ করছেন, তারাই প্রমাণ করুক। যদি দাবি করা হয় আমি ১৪ বার ফোন করেছি, তবে তারা সেই কললিস্ট বা রেকর্ড দেখাক। আমি শুধু এটুকুই বলব— এমন কোনো কথা বা লেনদেন নিয়ে আলাপ হয়নি।’

দ্বিতীয় ফোনালাপ ও রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত

ফাঁস হওয়া দ্বিতীয় ফোনালাপে সাইমুম রেজাকে বেশ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘আমার দিক থেকে আমি পজিটিভ বলব। আশা করি রিজেনেবলনেস উনি বুঝবে। বাকিটুকু দেখা যাক কী হয়। আমার দিক থেকে আমি ট্রাই করব। অ্যাডভার্সারি তো আছেই। কিছু তো করার নেই। আমরা তো ওদের এলিমিনেট করতে পারব না। কিন্তু নিউ চিফ প্রসিকিউটর ইজ ভেরি রিজেনেবল। উনি সাহসী। যেহেতু উনার দল ক্ষমতায়, সো উনি যেকোনো ডিসিশন নিতে পারবেন। সেটা নিয়ে সমস্যা নেই। উনার একটা সাপোর্ট লাগবে। সো উনি যদি মনে করে যে, হি ইজ ইনোসেন্ট, তাহলে গেট সাপোর্ট ফ্রম মাই সেলফ। বিএনপির কারও দিক থেকে ব্যবস্থা করেন। হুম্মাম অথবা মীর হেলাল… মন্ত্রী টাইপের।’

অর্থ লেনদেনের ধরন নিয়ে আলোচনা

টাকা পরিশোধের বিষয়ে সাইমুমকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি কি আপনাদের কাছে কোনো অগ্রিম পেমেন্ট (পার্ট পেমেন্ট) চাইব, নাকি একবারে কাজ শেষে নেব? রেজাল্ট হওয়ার পর নেওয়াই কি ভালো হবে না?’ জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, “অর্থের বিষয়টি আমি দেখি না, এটি আপনি আর ‘চাচি’ (রিজওয়ানা) ভালো জানেন। উনি জানতে চেয়েছেন আপনার কাছে কখন যাবে।” এর উত্তরে সাইমুম জানান, রাতে এই বিষয়ে বিস্তারিত কথা হবে।

যারা অভিযোগ করছেন, তারাই প্রমাণ করুক। যদি দাবি করা হয় আমি ১৪ বার ফোন করেছি, তবে তারা সেই কললিস্ট বা রেকর্ড দেখাক। আমি শুধু এটুকুই বলব— এমন কোনো কথা বা লেনদেন নিয়ে আলাপ হয়নিসাইমুম রেজা তালুকদার, পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর

এ নিয়ে রাতে কথা বলার ইঙ্গিত দেন সাইমুম রেজা। বলেন, ‘রাতে এটা নিয়ে আলাপ করব। মূল জিনিস হলো বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর অনেক ভালো লোক। তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম আর নোমান, আমি, চিফ প্রসিকিউটর ও জোহা; সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসা হবে। তখন ওরা যদি বিপক্ষে বলে আমি এ নিয়ে বলব।’

ঘটনার সত্যতা রয়েছে বলে আমার ধারণা— ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী ও প্রাক্তন স্ত্রী রিজওয়ানা ইউসূফ / ঢাকা পোস্ট

সহকর্মীদের নাম আসা ও সাইমুমের আর্তি

ফোনালাপে অন্য প্রসিকিউটরদের নাম (প্রসিকিউটর মঈনুল, তারেক ও নোমান) আসার বিষয়ে সাইমুম রেজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘তারা বিভিন্ন সময়ে এই মামলার দায়িত্বে ছিলেন বলেই নাম এসেছে। তাদের সঙ্গে আমার কোনো আর্থিক লেনদেনের আলাপ হয়নি।’ নিজেকে ‘সৎ’ দাবি করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আপনারা চাইলে আমার সব পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই। ট্রাইব্যুনালে আমি দিনের পর দিন একই শার্ট পরে ঘুরেছি।’

আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে ‘অস্পষ্টতা’

অভিযোগের বিষয়ে আইনি লড়াইয়ে নামবেন কি না— এমন প্রশ্নে সাইমুম রেজা জানান, তিনি এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো আইনি প্রক্রিয়া (প্রসিডিংস) শুরু হলে সেটি এক বিষয়, আর আমি নিজে থেকে পদক্ষেপ নেওয়া অন্য বিষয়। বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারব যে আসলে কোন পথে এগোব। তবে, আইনি ব্যবস্থা নিতে হলে সেটি ঠিক কী ধরনের হবে, তা এখনই সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না।’

গণমাধ্যমে বিষয়টি হঠাৎ করেই সামনে এসেছে, যা আমার কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে, যেহেতু এতো বড় একটি অভিযোগ জনসমক্ষে এসেছে, সেখানে এর পেছনে অবশ্যই কিছু না কিছু সত্যতা রয়েছে বলে আমার ধারণারিজওয়ানা ইউসুফ, ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী

দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে

প্রসিকিউটরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কাকে কোন মামলায় রাখা হবে বা হবে না, এটি সম্পূর্ণ চিফ প্রসিকিউটরের এখতিয়ার। এখানে আমার ব্যক্তিগতভাবে বলার কিছু নেই। অনেক সময় একজন দক্ষ প্রসিকিউটরকে একটি নির্দিষ্ট মামলার কাজ শেষে অন্য মামলায় বদলি করা হয়, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কোনো নির্দিষ্ট একটি কারণে এমন পরিবর্তন হয় না, এর পেছনে প্রশাসনিক বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।’

ঘুষের এমন অভিযোগ পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ করে— চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম / ঢাকা পোস্ট 

মঈনুল করিমের বক্তব্য : ‘জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না’

ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডের বিষয়ে প্রসিকিউটর মঈনুল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘রেকর্ডের সত্যতা কেবল নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। উপযুক্ত পরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন। রেকর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু প্রসিকিউটর বিরোধিতা করলে সাইমুম তাদের পক্ষে কথা বলবেন। এতে আমাদের জড়িত থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

তিনি আরও জানান, এক সময় তিনি এই মামলার প্রসিকিউটর ছিলেন এবং তদন্তের কাজে চট্টগ্রামেও গিয়েছিলেন। পরে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ তিনি জানেন না। তার ধারণা, প্রশাসনিক কোনো কারণে হয়তো এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণ : ‘কণ্ঠস্বর পরিচিত’

ফোনালাপের কণ্ঠস্বরটি সাইমুম রেজার কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘প্রাথমিক কিছু কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে ফ্রিকোয়েন্সি বা কণ্ঠস্বরের কম্পন বিশ্লেষণ করে কণ্ঠটি পরিচিত বলেই মনে হয়েছে। তবে, যেহেতু এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাই তারাই অফিশিয়ালি কণ্ঠস্বর পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবেন।’

ঘুষের এমন অভিযোগ পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং আমাদের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে। আমি শুরুতেই বলেছিলাম, কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া গেলে তা মোটেও বরদাশত করা হবে না। ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করতে হলে সবাইকে সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে হবেআমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটর

রিজওয়ানা ইউসুফের প্রতিক্রিয়া

পুরো বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফ বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘গণমাধ্যমে বিষয়টি হঠাৎ করেই সামনে এসেছে, যা আমার কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে, যেহেতু এতো বড় একটি অভিযোগ জনসমক্ষে এসেছে, সেখানে এর পেছনে অবশ্যই কিছু না কিছু সত্যতা রয়েছে বলে আমার ধারণা।’

তদন্ত কমিটি গঠন ও কঠোর অবস্থান

কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছেন। কমিটির সদস্যদের মধ্যে প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, নতুন নিয়োগ পাওয়া প্রসিকিউটর মার্জিনা রহমান মদিনা, মোহাম্মদ জহিরুল আমিন ও ট্রাইব্যুনালের ল’ রিসার্চ অফিসার সিফাতুল্লাহ রয়েছেন।

দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে অপরাধ বিশেষজ্ঞ— ড. তৌহিদুল হক / ঢাকা পোস্ট

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ঘুষের এমন অভিযোগ পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং আমাদের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে। আমি শুরুতেই বলেছিলাম, কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ন্যূনতম প্রমাণ পাওয়া গেলে তা মোটেও বরদাশত করা হবে না। ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব পালন করতে হলে সবাইকে সব ধরনের লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।’

বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ : ‘পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে’

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এই ঘটনাকে অত্যন্ত ‘মর্মান্তিক ও পীড়াদায়ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যাদের ওপর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করার দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধেই যখন ঘুষের অভিযোগ ওঠে, তখন পুরো বিচার ব্যবস্থাই আস্থার সংকটে পড়ে। যারা এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, তারা ব্যক্তিগত লাভের আশায় পুরো ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন কি না, তা গভীর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা জন্মাবে যে, প্রসিকিউশন হয়তো অন্য কারও হয়ে কাজ করছে।’

এখানে কেবল ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত যথেষ্ট নয়। বরং বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার’ তদন্ত কমিটি গঠন করা দরকার। বাংলাদেশে অনেক সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আমরা সেই পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি চাই না। বরং দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবেড. তৌহিদুল হক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ

তিনি মনে করেন, আসামির জামিনের বিনিময়ে অর্থ চাওয়া কেবল দুর্নীতি নয়, বরং আইনের চরম অবজ্ঞা। তার ভাষ্যমতে, ‘দায়িত্বশীল পদে থেকে কাউকে বেআইনি সুবিধা দেওয়া মানেই আইনকে অমান্য করা। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়া বা সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করাও একটি বড় অপরাধ।’

তদন্তে স্বচ্ছতা ও একাধিক কমিটির প্রয়োজনীয়তা

তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে ড. তৌহিদুল বলেন, এখানে কেবল ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত যথেষ্ট নয়। বরং বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ‘মাল্টি-স্টেকহোল্ডার’ তদন্ত কমিটি গঠন করা দরকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক সময় উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আমরা সেই পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি চাই না। বরং দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

‘আইনাঙ্গনে কেবল আইনের প্রভাবই থাকবে’— এমনটি জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যদি আইন ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রভাব দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে সেখানে বড় সংকট রয়েছে। এই সংকট কাটাতে হলে যথাযথভাবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দায়িত্বশীলদের কর্মকাণ্ড নিয়মিত তদারকির (Monitoring) আওতায় রাখতে হবে। জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করা গেলে বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে সব বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং আইনি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।’

এমআরআর/এমএআর/

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ: