সংগৃহীত
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের প্রচারণা বাড়ছে, প্রতিশ্রুতির জোয়ার দেখা যাচ্ছে। অনেক প্রতিশ্রুতিই কখনো বাগাড়ম্বর, কখনো অস্পষ্ট, কখনো প্রতারণামূলক। জনস্বার্থের অবস্থান পরিষ্কার করতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে উত্থাপিত কিছু দাবি–প্রস্তাব খেয়াল করি।
গত ১৮ জানুয়ারি বেশ কয়েকটি সংগঠন ও আগ্রহী ব্যক্তিরা কৃষি ও কৃষক বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। এসব বিষয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও নীতিনির্ধারক তো বটেই, সমাজ এমনকি মিডিয়ায় তেমন গুরুত্ব পায় না। এই ২০ দফা প্রস্তাব–দাবি পেশ করে তাঁরা আশা করেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীরা নিরাপদ কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক প্রস্তাবগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহার ও ঘোষণায় যুক্ত করে এগুলো বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করবেন।
এর মধ্যে কী কী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে? তাঁরা বলেছেন, কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং কৃষিজমির সঙ্গে যুক্ত নদী, জলাশয় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত ও দূষণমুক্ত রাখতে হবে। কৃষিজমির মাটির গঠন এবং কেঁচোসহ অণুজীব ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন চাষাবাদ ও উপকরণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কৃষিজমির মাটির গঠন এবং অণুজীব, কেঁচোসহ প্রাণীর ক্ষতিসাধন করে—এমনভাবে জমি চাষ বা কর্ষণ করা যাবে না। উদ্ভিদনাশক বিষ (হার্বিসাইড) নিষিদ্ধ করতে হবে। স্থানীয় লোকজ কৃষিপ্রযুক্তি–বিষয়ক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্থানীয় কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তির প্রসারে ভর্তুকির ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয় জাতের জীববৈচিত্র্য প্রসার ও সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।
বীজ উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও পরিবেশবিনাশী কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি দেশীয় স্থানীয় বীজ কুক্ষিগত করতে পারবে না এবং একতরফাভাবে লাইসেন্স বা পেটেন্ট করতে পারবে না। স্থানীয় জাতের আদি নাম পরিবর্তন করা যাবে না। ভূগর্ভনির্ভর সেচ ও দূষণ বন্ধ করে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ সুরক্ষা করে নিরাপদ ও ন্যায্য সেচ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের সব স্তরে ভূগর্ভের পানি ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনতে হবে। ভূ-উপরিস্থ প্রাকৃতিক পানি দখল ও দূষণমুক্ত করে সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানির টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সহজ পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা এবং সহজলভ্য প্রযুক্তি প্রসার করতে হবে।
জমি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বন্ধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক তালিকাভুক্ত অতি বিপজ্জনক বিষ চিহ্নিত করে ২০২৬ সালের ভেতর নিষিদ্ধ করতে হবে। বালাইনাশক বিষকে ‘বিষ’ হিসেবেই উল্লেখ করতে হবে, ওষুধ বলা যাবে না। জৈব বালাইনাশক, সমন্বিত প্রাকৃতিক বালাই ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ভর্তুকি, প্রচারণা ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। প্লাস্টিকের মোড়ক পরিহার করে প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে মোড়কজাত করতে হবে। সব ফসলের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণসহ এলাকাভিত্তিক কৃষকের হাট গড়ে তুলতে হবে। জিএমও, রাসায়নিক ও জৈব (কৃত্রিম রাসায়নিকমুক্ত) পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের লেবেলিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।
শিল্প ও শহরের বর্জ্য কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ডাম্পিং করা যাবে না। দেশীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ জাত সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদনির্ভর গ্রামীণ গৃহস্থালি খামার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীনির্ভর জলাভূমি ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটাতে হবে। জলবায়ু সংকট সমাধানের নামে ‘সবুজ বিপ্লবের’ মতো কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম, কোম্পানিনির্ভর নতুন পদ্ধতি কিংবা স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষিসংস্কৃতিবিরুদ্ধ কোনো ভ্রান্ত ও মিথ্যা উন্নয়ন প্যাকেজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
এসব বিষয় বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষককে নিরাপদ, গতিশীল, সুস্থ ও সৃজনশীল করতে অপরিহার্য। শুধু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কথা আমরা বরাবরই শুনি। উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি ঘটেছেও। কিন্তু কার বিনিময়ে এই বৃদ্ধি—এ প্রশ্ন তুললে বা একটু হিসাব–নিকাশ করলে উন্নয়নের সব গল্প ভেঙেচুরে পড়বে। উৎপাদন বাড়াল, কিন্তু নদী–নালা, খাল–বিলসহ ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ দূষিত কিংবা মাটি দূষিত, ফসলে বিষ, মানুষের শরীরে বিষ—চকচকে উৎপাদনসামগ্রী চারদিকে।
গত ২১ জানুয়ারি গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি জনগণের শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ২৫ দফার ইশতেহার প্রকাশ করে। এতে জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বিশ্বাস-শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে মানুষের জীবনের শান্তি-স্বস্তি নিরাপত্তার সংকটগুলোকে চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক সংক্ষেপে উল্লেখ করা যায় এভাবে।

১. জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের তালিকা চূড়ান্ত করা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটা সব মব সন্ত্রাস, হামলা ও খুনের বিচার। ’৭১ সালের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী–মানবতাবিরোধী অপরাধ করা আলবদর ও রাজাকারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা।
২. রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিচার। বিচার বিভাগের জবাবদিহি। র্যাব বিলুপ্ত এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিষিদ্ধ করা।
৩. নির্বাচনে অংশগ্রহণে বৈষম্য দূর করতে শূন্য জামানত, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নির্বাচনী সমাবেশ এবং সব আসনে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা যুক্ত করা।
৪. বাজেটের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতার দাবি। এর জন্য প্রতিটি পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান বা ডিপিপি প্রকাশের দাবি। পরোক্ষ করের পরিমাণ কমিয়ে বাজেটের আয়ের সিংহভাগ প্রত্যক্ষ আয়কর থেকে সংগ্রহ করার বিধান তৈরি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণযুক্ত প্রকল্পগুলোর ফলাফল নিয়ে স্বাধীন তদন্ত, এসব সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করা।
৫. প্রতি ইউনিয়নে ন্যায্যমূল্যে ফসল, ডিম, মাছ ও মুরগি সংগ্রহে সরকারি সুপার সেন্টার। প্রতিটি জেলায় হিমাগার। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কৃষি ও প্রাণিজ সম্পদ উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা ও ভর্তুকি। কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার বন্ধ। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যবান্ধব কৃষি, পোলট্রি ও মৎস্য চাষের জন্য বিকল্প জাতীয় মহাপরিকল্পনা। নদী কিংবা হাওরে মাছ ধরার জন্য ইজারা দেওয়া বন্ধ করা।
৬. ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ও ন্যূনতম বেকার ভাতা চালু করা। শিল্প পুলিশ বাতিল করে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় লোকবল ও বাজেট দেওয়া। সরকারি প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ বন্ধ করা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কর্মরতদের গিগ শ্রমিক বা প্ল্যাটফর্ম শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি। প্রবাসে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে মানব পাচার, প্রতারণা, জালিয়াতি, শ্রমিক নির্যাতন, নারী শ্রমিকদের হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ। এয়ারপোর্টে প্রবাসী শ্রমিকদের ভোগান্তি দূর করা।
৭. দেশীয় শিল্প খাতের বিকাশের জন্য কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে বন্ধ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, চিনিকলগুলোকে সঠিক পরিকল্পনার আলোকে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইইউ ও জাপানের সঙ্গে সম্পাদিত সব সামরিক-বেসামরিক চুক্তি প্রকাশ, জনস্বার্থবিরোধী ও অসম চুক্তিগুলো বাতিল করা। গোপন চুক্তি করার চর্চা বন্ধ করা। সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ভারতের সঙ্গে পানি সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের পানি কনভেনশন ধরে উদ্যোগ গ্রহণ।
৮. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ করে বরাদ্দ রাখার বাধ্যবাধকতা। সরকারি বিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, এমপি, আমলা, সরকারি চাকরিজীবীর সন্তানদের শিক্ষা এবং তাঁদের সবার চিকিৎসা সরকারি হাসপাতালে বাধ্যতামূলক করা। সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক গড়ে তোলা যাবে না। দেশের প্রতিটি শহরের বড় রাস্তায় প্রতি এক কিলোমিটার অন্তর বিনা মূল্যে নিরাপদ খাওয়া পানি সরবরাহ এবং পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা।
৭. সব শহরের সমস্ত রাস্তায় ফলের গাছ লাগানো। বায়ুদূষণ ঠেকাতে প্রতিটি ইটভাটায় দূষণরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। ময়লার ডাম্পিং স্টেশনগুলোকে ‘ওয়েস্ট টু পাওয়ার’ প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা।
৮. প্রাণ-প্রকৃতি এবং জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি রামপাল, রূপপুরসহ সব কয়লাভিত্তিক ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল অথবা ফেইজ আউট প্ল্যান করা। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ। আদানিসহ বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি বাতিল। বিদেশি ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, বিদেশি কোম্পানিনির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা বাতিল করে জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ ঘটিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন। ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন। জ্বালানি অপরাধীদের বিচার।
সূত্র: প্রথম আলো










