মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ৭ মাঘ ১৪৩২

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের জন্য ২০২৫ ছিল প্রাণঘাতীর, ২০২৬ কেমন যাবে?

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের জন্য ২০২৫ ছিল প্রাণঘাতীর, ২০২৬ কেমন যাবে?

সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের জন্য ২০২৫ সাল কেমন ছিল? ছোট্ট কয়েকটি পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যাক। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে প্রকাশিত দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বে ১২৮ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন; যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ১২৮ জনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে।

প্যারিসভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ) জানাচ্ছে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন জন নারী সাংবাদিকসহ বিশ্বের ২২টি দেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৬৭ জন সাংবাদিক।

আর এ সময়ে ১৫৩ জন সাংবাদিক নিখোঁজ হয়েছেন। যাদের পরিণতি সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন নিখোঁজ এই সাংবাদিকদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন যুদ্ধবিদ্ধস্ত সিরিয়ায়। এরপরের অবস্থায় আছে মেক্সিকো ও ইরাক।

আরএসএফ তাদের বছর শেষের প্রতিবেদনে সারাবিশ্বে সাংবাদিকদের জীবন ও কর্ম পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে মোটা দাগে দুই ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে শনাক্ত করেছে। সংস্থাটির ভাষায় তারা হচ্ছেন সাংবাদিকতার রাজনৈতিক শিকারি (POLITICAL PREDATORS) ও নিরাপত্তাজনিত শিকারি (SECURITY PREDATORS)।

২০২৫ সালে স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক শিকারিরা ছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আফগানিস্তানে সুপ্রিম লিডার হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। আর নিরাপত্তাজনিত শিকারির তালিকায় ছিল ইসরায়েলের কুখ্যাত বাহিনী আইডিএফ, মিয়ানমারের স্টেট সিকিউরিটি ও পিস কমিশন এবং মেক্সিকোর সন্ত্রাসবাদী অপরাধ সংগঠন জেসিলসকো নিউ জেনারেশান কার্টেল বা সিজেএসজি।

এছাড়া বছরের শেষ প্রান্তে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের বেশকিছু অঞ্চলে কয়েকটি উগ্রবাদী, অসহিষ্ণু সংগঠন গড়ে উঠেছে। যারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এরইমধ্যেই জ্বালিয়ে দিয়েছে দুটি সংবাদপত্র অফিস। (2025 ROUND-UP, আরএসএফ)

এদিকে সার্বিক দিক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গ্রেগোরিয়ান নতুন বছর ২০২৬ এর শুরুতেই সাংবাদিকদের জন নতুন কিছু মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যা এরইমধ্যেই প্রভাবিত করছে সাংবাদিকদের কাজের পরিসরকে।

সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) জানাচ্ছে, ভেনেজুয়েলায় নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়ার দিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও সংবাদ সংস্থার ১৪ জন সাংবাদিককে রাজধানী কারাকাসে কারারুদ্ধ করা হয়।

দেশটির সাংবাদিকদের জাতীয় সংগঠন আরও জানাচ্ছে, নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়ার পর সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এমনকি ভেনেজুয়েলার নতুন সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের দেশটিতে প্রবেশও করতে দিচ্ছে না।

...দেশটির সাংবাদিকদের জাতীয় সংগঠন আরও জানাচ্ছে, নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়ার পর সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এমনকি ভেনেজুয়েলার নতুন সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের দেশটিতে প্রবেশও করতে দিচ্ছে না।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার (আরএসএফ) জানাচ্ছে, প্রায় ২০০ বিদেশি সাংবাদিক ভেনেজুয়েলার প্রতিবেশী দেশ কলাম্বিয়ার কুকুটা শহরে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এখনো তারা ভেনেজুয়েলার নতুন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের অনুমতি পাননি।

অন্যদিকে ইরানের বিস্ফোরণ উন্মুখ পরিস্থিতিও সাংবাদিকতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। আরএসএফ জানাচ্ছে বিক্ষোভ চলাকালে এখনো পর্যন্ত ইরানের সরকার ২৩ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে। যাদের অনেকেরই কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া দক্ষিণ সুদান, নিকারাগুয়া, চীন, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সাংবাদিকরা এরইমধ্যেই জোরপূর্বক বন্দিত্ব ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আরএসএফ-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ দিনের হিসেবে ৫০২ জন সাংবাদিক ও সাংবাদিকতায় সহায়ক কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন।

মানুষের মুক্তমত প্রকাশ ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সংস্থাটি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুক্তমত প্রকাশ ও গণমাধ্যমের উন্নয়ন বিষয়ক (World trends in freedom of expression and media development: global report 2022/2025; Journalism: shaping a world at peace) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যাতে এই চার বছরের এক ভীতিকর চিত্র উঠে এসেছে এবং নির্দেশ করেছে এক শঙ্কাজনক আগামীর।

ইউনেস্কোর এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বে ৭২ শতাংশের বেশি মানুষ গণতন্ত্রহীন দেশে বসবাস করছে। যে দেশের সরকারগুলো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে সদা তৎপর। এছাড়া নানা জটিল প্রেক্ষাপটে বার্তাকক্ষে সেলফ-সেন্সরশিপ বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ, যা ২০১২ সালে থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ শতাংশ করে বেড়েছে।

এই গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, বিশ্বে এখনো ১৬০টি দেশে সাংবাদিকদের স্বাধীনতাবিরোধী অবমাননামূলক আইন রয়েছে। যা সংকুচিত করছে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা। এছাড়া ২০২৫ সালের শেষ থেকে আগের সাড়ে তিন বছরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৩১০ জন সাংবাদিক।

ইউনেস্কোর এই প্রতিবেদনে সংবাদ মাধ্যমের অর্থনৈতিক সামর্থ্য (financial viability) নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বে গণমাধ্যমের রাজস্ব বাজারের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে টেক জায়ান্ট কোম্পানি মেটা (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম), অ্যামাজন (এলেক্সা, জুক্স, কিনডল, এআই) এবং অ্যালফাবেট (গুগল, ইউটিউব ও অন্যান্য)।

আরএসএফ জানাচ্ছে বিক্ষোভ চলাকালে এখনো পর্যন্ত ইরানের সরকার ২৩ জন সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে। যাদের অনেকেরই কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে না।

যেগুলো গণমাধ্যমকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে টিকে থাকার ক্ষেত্রে এক মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এতে বার্তাকক্ষের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়া ও সংবাদ আধেয়ও মান নিম্নগামী হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণায় মুক্তমত প্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ইউনেস্কো যে ভীতিকর চিত্র তুলে ধরেছে তা নিশ্চয় ২০২৬ সালে ভোজবাজির মতো উড়ে যাবে না। বরং আরও সংঘাতমুখর হয়ে ওঠা বিশ্বে সাংবাদিকদের এই ঝুঁকিগুলো জ্যামিতিক হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যার নমুনা এরইমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। 

এছাড়া নতুন বছরে শক্তিধর দেশ বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। যার ফলে সাংবাদিকতায় তৈরি হতে পারে নানা ধরনের নৈতিক ও নিরপত্তাজনিত সংকট। যেমন এরইমধ্যেই জানা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের জেনেজুয়েলায় আক্রমণের তথ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য আটলান্টিকসহ অনেক সংবাদপত্রই আগেই জানতো।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়েছিলেন রাত ১০.৪৬ মিনিটে। যে খবর দ্রুতই পেয়েছিল মার্কিন গণমাধ্যম। যদিও মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো এই সংবাদ প্রকাশ করেনি। এছাড়া নিকোলাস মাদুরোকে বেআইনি অপহরণের ঘটনায় অনেক সাবধানী শব্দ ও শিরোনাম ব্যবহার করছে মার্কিন ও ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো। যা উসকে দিচ্ছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্নবিদ্ধ করছে পশ্চিমাদের নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড।  

তবে একটা ভালো খবর উল্লেখ না করলেই নয়। ২০২৬ সালে বন্ধ আছে গাজার সর্বাত্মক যুদ্ধ। দুই বছরের এই সর্বাত্মক যুদ্ধে প্রায় নিয়ম করে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের হত্যা করেছে আইডিএফ সেনারা। প্রত্যাশা, গাজা উপত্যকায় যাতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত হয়, একইসাথে বন্ধ হয় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত।

নিরাপদ হোক সাংবাদিকদের পেশাজীবন, নিরাপদ হোক গোটা বিশ্ব।

সহায়ক:- 

১। IFJ releases final 2025 list of 128 journalists and media workers killed, IFJ Report, Retrieved on : 31 December 2025,

https://www.ifj.org/media-centre/news/detail/category/impunity-2025/article/ifj-releases-final-2025-list-of-128-journalists-and-media-workers-killed

২। 2025 ROUND-UP of journalists killed, detained, missing and held hostage worldwide, RSF Report. Retrieved on : 10th January 10, 2026

https://rsf.org/sites/default/files/medias/file/2025/12/Bilan%202025%20EN.pdf

৩। At least 14 journalists detained during presidential inauguration in Venezuela, Retrieved on : 10th January 10, 2026 https://cpj.org/2026/01/at-least-14-journalists-detained-during-presidential-inauguration-in-venezuela/

৪। World trends in freedom of expression and media development: global report 2022/2025; Journalism: shaping a world at peace (UNESCO 2025), Retrieved on : 10th January 10, 2026, https://unesdoc.unesco.org/ark:/48223/pf0000396638/PDF/396638eng.pdf.multi

রাহাত মিনহাজ : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ: