বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মুখ দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর পাস, করছেন চাকরিও

মুখ দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর পাস, করছেন চাকরিও

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে, নিজের দৃঢ় মনোবল আর অদম্য সাহস নিয়ে যে লেখাপড়া করা যায়, এমনই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাস বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী বাহার উদ্দিন রায়হান। দুটো হাত নেই, কিন্তু বাহারের কোনো কিছুই যেন থেমে নেই। সচল ব্যক্তির মতোই সাইকেল, মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন।

এমনকি স্কেটিংও খুব সুন্দরভাবেই করছেন।নিজের এই অসাধারণ কীর্তিগুলো তিনি তার ফেসবুক পেজ (Bahar Uddin Raihan) ও ইউটিউবে (Bahar Raihan) ভিডিওর মাধ্যমে তুলে ধরছেন। আবার নিজের নিত্যদিনের কাজ যেন অনায়েসই করছেন বাহার। মুখ দিয়ে লিখেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। এভাবে পরীক্ষা দিয়ে স্নাতকোত্তর (সিজিপিএ–৪ এর মধ্যে ৩ দশমিক ১৩) পাস করেছেন তিনি।

বাহারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা কক্সবাজারের চকরিয়ায় মামার বাড়িতে। গর্ভে থাকাকালীন তার বাবা তার মাকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর আর্থিক সমস্যা ও সামাজিক বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি তার নিজ স্বপ্নে অবিচল আছেন।

২০০৪ সালের ৩০ অক্টোবর, বাহার তখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়ির পাশে বিদ্যুতের খুঁটিতে বসানো ট্রান্সফরমারে একটি ছোট পাখি ঢুকে পড়ে। সেই পাখি দেখতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে হাত দিতেই ঝলসে যায় তার দুই হাত, বুকের কিছু অংশ ও পায়ের তলা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঁচ দিনের মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছিল তার এক হাত ও আরেক হাতের কনুই পর্যন্ত।

তবুও পড়ালেখা থেকে এক মুহূর্তের জন্য বিচ্যুত হননি তিনি। প্রচণ্ড ইচ্ছা শক্তি, মনোবল আর সাহস ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। হাত না থাকলেও মুখ দিয়ে লিখে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বাহার চকরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। এইচএসসি পাস করার পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। এর আগে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায়ও ভালো ফলাফল করেন

বাহারের স্বপ্ন ছিল, পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি করা। সবাই মনে করেছিলেন দুই হাত হারানোর পর রায়হান আর পড়ালেখা করতে পারবে না। কিন্তু মানুষের সেই ভাবনা দূরে ঠেলে দিয়ে অদম্য বাহার সামনে এগিয়ে গিয়ে আজ জীবন যুদ্ধে সত্যি জয়ী হয়েছেন।

মাস্টার্স পরীক্ষার ফলাফল পেয়ে অদম্য রায়হান তার ব্যবহৃত ফেসবুক পেজ ‘দ্য রায়হান’ এ সফলতার কাহিনি তুলে ধরেছেন। লিখেছেন, অভিনন্দন রায়হান, শুকরিয়া রবের নিকট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স শেষ করলাম। যেদিন মুখে কলম তুলেছিলাম সেদিন ভাবিও নাই মাস্টার্স পর্যন্ত পড়তে পারব কিনা, তবে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ভালো কিছু করব। প্রথমে আমার মাকে কৃতজ্ঞতা জানাই, এরপর আমার নানা-নানি, যাদের ছায়ায় বেঁচে থাকা। এরপর মামাদের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ, যাদের সাপোর্ট না পেলে আমার এই সাহস তৈরি হত না। এরপর আমার সব শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল। সব শেষে আমার বন্ধুরা, যে বন্ধুগুলোর পেয়েছি প্রেরণা, যারা আমাকে শক্তি যোগাতে সাহায্য করে।

তিনি আরও লিখেছেন, ২০০৪ সালের পবিত্র শবে-বরাতের দিন সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় আমার হাত দুটি কেটে ফেলতে হয়েছে। এখন কেমন আছি আমি? যদি বলতে যাই, আমাকে নিয়ে অতীতে যেমন ভবিষ্যৎবাণী করেছিল, তারচেয়ে কয়েক গুন ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। দুই হাত হারানোর পর আমার পথচলা নিজের জন্য যতটা না কঠিন ছিল, তার চেয়ে চারপাশের মানুষগুলো আমাকে আরো বেশি কঠিন করে তুলেছে।পৃথিবীর সব কঠিন বাঁধাগুলো আমি সহজ করে নিয়েছি, হাল ছাড়িনি। আবেগ, ভালোবাসাগুলো বিসর্জন দিয়েছি। এখন হয়ে গেছি কঠিন এক পাথর, প্রতিটা সেকেন্ড প্রোডাক্টিভ করে তুলেছি। আমার অনেক দূর যেতে হবে, অনেক কিছু করার আছে, আপনাদের দোয়া চাই। আমার বিশ্বাস আমার দেশের মানুষ আমার পাশে থাকবে, আমাকে অনুপ্রাণিত করবে। সবার জন্য ভালোবাসা রইল।

বাহার বলেন, অনেকে বলেছে তুই লেখাপড়া করতে পারবি না। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতাম না। আমি বলতা,ম আমার কাজ বলে দিবে আমি কী করতে পারব। স্নাতকোত্তরে যে আমার সাফল্য, এই সাফল্য দেখে আমার চকরিয়ার মানুষ খুব খুশি হয়েছে। বাংলাদেশে ভালো ভালো এনজিও আছে, যা নিয়ে গর্ব করা যায়। ক্যারিয়ারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়। ওই জায়গাতে আমার ক্যারিয়ারটাকে ফোকাস করার চিন্তা আছে। সুযোগ পেলে আমি অবশ্যই গ্রহণ করব।

২০১৯  সালে বাহার খাবার সংগ্রহের একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করলে তা ভালো চললেও করোনা মহামারির জন্য প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা থমকে যায়। বর্তমানে তিনি একটি সংগঠনে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার বেতনের কাজ করছেন। পড়াশোনা শেষ করে এখন চট্টগ্রামের মুরাদপুরের একটি ছাত্রাবাসে থাকছেন বাহার।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: