বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বস্তায় আদা চাষ করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কৃষকরা

বস্তায় আদা চাষ করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কৃষকরা

বস্তায় আদা চাষ নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এর ফলে বাড়বে আদার উৎপাদন। এরইমধ্যে বস্তায় আদা চাষ করে অনেক কৃষকের জীবন বদলে গেছে। পতিত জমিতে আদা চাষে বেড়েছে আয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যাগিং বা বস্তায় আদা চাষ উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চাষযোগ্য পতিত জমি বা বসতবাড়ির আশপাশে, ফল বাগান ও বিল্ডিং এর ছাদে জিও ব্যাগে আদা চাষ করে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানি ব্যয় কমানো সম্ভব। জিও ব্যাগে আদা চাষ করে অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনা হয়েছ। জিও ব্যাগ পুনঃব্যবহারযোগ্য, পরিবেশবান্ধব, তাপ প্রতিরোধী, জলরোধী এবং ব্যবহারের জন্য টেকসই। এ পদ্ধতিতে আদা চাষ করলে কন্দপচা রোগ হয় না। যদি রোগ দেখা যায় তখন গাছসহ বস্তা সরিয়ে ফেলা হয়, ফলে কন্দপচা রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। এ পদ্ধতিতে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, ‘আমরা প্রকল্পের মাধ্যমে বস্তায় আদা চাষ জনপ্রিয় করার জন্য মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করছি। এটি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ হলে দেশের আদার চাহিদার অনেকাংশ পূরণ হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। প্রকল্পটি বাস্তাবিয়ত হলে আদার মোট উৎপাদনের সঙ্গে ৫ শতাংশ যোগ হবে। সেই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা আদা চাষে উৎসাহিত হবেন।’

লালমনিরহাটের স্কুল শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক রুবেল। অবসর সময়কে কীভাবে কাজে লাগানো যায় এবং বাড়ির পাশে সুপারি বাগানে বাড়তি কোনো ফসল ফলানো যায় কি না তা নিয়ে ভাবতে থাকেন। প্রথমে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) এর মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ নেন। পরে তিনি সুপারি বাগানের গাছের ফাঁকে ফাঁকে ৪০ শতক জমিতে বস্তায় আদা চাষের সিদ্ধান্ত নেয়। আব্দুর রাজ্জাক রুবেল লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা ডাকালীবান্ধা আলহাজ্ব সমসের উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

আব্দুর রাজ্জাক রুবেল জানান, প্রথমে বেলে দোআশ মাটি সংগ্রহ করে সেই মাটি ব্লিচিং পাউডার ও ডলোচুন দিয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। তারপর কিছু দিন ফেলে রেখে সেই মাটির সঙ্গে গোবর, কাঠের গুড়া ও রাসায়নিক সার মিশ্রণ করে ১০ থেকে ১২ দিন রাখা হয়। এরপর বস্তায় মাটি ভর্তি করে সুপারি গাছের ফাঁকে ফাঁকে রেখে আদার বীজ রোপণ করা হয়। ৪০ শতক জমিতে প্রায় ৫ হাজার ৫ শত বস্তায় আদা চাষাবাদ করছেন। আব্দুর রাজ্জাক রুবেলের দাবি, সব মিলে প্রতি বস্তায় খরচ হবে প্রায় ৪০ টাকা। প্রতি বস্তায় ৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত আদার ফলন হতে পারে। এতে মোট ২ লাখ টাকা খরচের বিপরিতে প্রায় ৭ লাখ টাকা আয় হবে এমন দাবি তার।

তেমনই একজন নওগাঁর মোছা. নারগিস। তিনি বাড়ির আঙিনায় এবং বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ব্যাগিং পদ্ধতিতে বস্তায় মাটি ভরাট করে আদা লাগাতে শুরু করেছেন। জেলার পত্নীতলা উপজেলায় পার্টিচড়া ইউনিয়নের পার্টিআমলাই গ্রামের নারগিস নিজের শ্রমেই গড়ে তুলেছেন সাড়ে ১৪ হাজার বস্তার আদার ক্ষেত। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) এর মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় তিনি ১০ শতাংশ জমিতে আদা চাষের প্রদর্শনী পাওয়া কৃষক। তিনি প্রকল্পের সহায়তায় ৫০০ বস্তায় আদা চাষ করেন। ওই প্রদর্শনী পাওয়ার পর তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে কৃষি অফিসের মাধ্যমে পরামর্শ নিয়ে আরও অধিক আদা চাষ শুরু করেছেন। এই মৌসুমে সব মিলিয়ে মাঠে তার ১৪ হাজার বস্তা আদার আবাদ চলমান।

নারগিস বলেন, ‘অবসর সময় বসে না থেকে কৃষি বিভাগের পরামর্শে বাড়ির চারপাশে বস্তায় করে আদার গাছ লাগিয়েছি। এ জন্য কৃষি বিভাগ আমাকে জানায়, প্রতিটি বস্তায় প্রায় এক কেজি করে আদা উৎপাদন হবে। ফলে আশা করছি ১৪ হাজার বস্তায় প্রায় দেড় টন আদা উৎপাদন করতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আদা রোপণের মাত্র ৩ মাসের মাথায় গাছগুলোতে আদা আসতে শুরু করেছে। বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি দেখে এলাকার অনেক মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।’ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পদ্ধতিতে আদা চাষ করে তারা এরইমধ্যে সুফল পেয়েছেন। পতিত জমিতে যেমন আদা চাষ হচ্ছে তেমনি যোগ হয়েছে আয়ের নতুন পথ।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: