সংগৃহীত
মহাবিশ্বের বুকে আপন অক্ষের ওপর পৃথিবীর অবিরাম ঘূর্ণনই আমাদের দিন ও রাতের চক্র নির্ধারণ করে। কিন্তু মানুষের তৈরি পরিবেশদূষণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় এবার পৃথিবীর সেই চিরচেনা ঘূর্ণন গতি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য আগের চেয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়ে যাচ্ছে, যা কোটি বছরের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা এবং ইটিএইচ জুরিখের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফের চাদর ও হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর দিনগুলো ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ হচ্ছে। দিনের এই দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য এবং এটি মিলিসেকেন্ডের ভগ্নাংশ দিয়ে পরিমাপ করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমে যাওয়ার বর্তমান হার গত ৩৬ লাখ বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।
জলবায়ু পরিবর্তন যে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে প্রভাবিত করছে, তা পূর্ববর্তী বেশ কিছু গবেষণাতেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যখন মেরু অঞ্চলের হিমবাহ ও বরফের চাদর গলে যায়, তখন একসময় মেরুর কাছাকাছি জমা থাকা পানি মহাসাগরগুলোতে প্রবাহিত হয় এবং বিষুবরেখার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মেরু অঞ্চল থেকে এই বিশাল ভরের দূরে সরে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ধীর হয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, পৃথিবীর ভেতরের নড়াচড়া এবং বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের মতো বেশ কিছু প্রাকৃতিক শক্তির কারণে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন হয়। এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো প্রতিনিয়ত দিনের দৈর্ঘ্যকে প্রভাবিত করে। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে এটি সব প্রাকৃতিক প্রভাবগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। লাখ লাখ বছর ধরে ঘটে যাওয়া এই পরিবর্তনগুলো পর্যালোচনার জন্য সমুদ্রের তলদেশের বেন্থিক ফোরামিনিফেরা নামের ক্ষুদ্র অণুজীবের জীবাশ্মের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হয়েছে। এই অণুজীবগুলোর খোসার রাসায়নিক গঠন প্রাচীন সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের রেকর্ড সংরক্ষণ করে রেখেছিল। এই পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করেই পৃথিবীর ঘূর্ণনের পরিবর্তনগুলো অনুমান করা সম্ভব হয়েছে।
প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক তথ্যের অনিশ্চয়তাগুলো দূর করতে বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে তৈরি একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করেছেন। এটি বিজ্ঞানীদের প্রায় ৩৬ লাখ বছর আগের লেট প্লিওসিন যুগের রেকর্ডগুলো নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করতে সাহায্য করেছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, জলবায়ুচালিত দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির বর্তমান হার পুরো ভূতাত্ত্বিক রেকর্ডের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও সুষ্পষ্ট।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি শতাব্দীতে বা ১০০ বছরে পৃথিবীর দিন গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৩৩ মিলিসেকেন্ড করে দীর্ঘ হচ্ছে। যদিও এই সংখ্যা দেখতে খুব ছোট মনে হতে পারে, তবে বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেছেন, এর সঙ্গে জড়িত ভরের পরিমাণ অবিশ্বাস্য রকমের বিশাল।
ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার বিজ্ঞানী মোস্তফা কিয়ানি শাহভান্দি পৃথিবীর ঘূর্ণনশক্তির এই পরিবর্তনকে একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, পৃথিবীর ঘূর্ণনশক্তির এই পরিবর্তন একটি ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্পের শক্তির সঙ্গে তুলনীয়। তবে এটি কোনো ধ্বংসলীলার দিক থেকে নয়, বরং গ্রহের স্কেলের বা বৈশ্বিক পর্যায়ের শক্তির দিক থেকে।
সূত্র: প্রথম আলো












