সংগৃহীত
প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ: একসময় তাঁতের ঝমঝম শব্দে মুখর থাকত সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, এনায়েতপুর ও শাহজাদপুর। দিনরাত চলত তাঁত, ব্যস্ত থাকতেন শ্রমিকরা। কিন্তু এখন সেই তাঁতপল্লিগুলোতে নেমে এসেছে অস্বস্তিকর নীরবতা। ঘনঘন বিদ্যুৎবিভ্রাট ও জ্বালানি সংকটে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখেও শাড়ি-লুঙ্গি উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক তাঁত কারখানার গেটে ঝুলছে তালা। কোথাও শ্রমিকরা গোল হয়ে বসে লুডু খেলছেন, কেউ মোবাইলে সময় কাটাচ্ছেন, আবার কেউ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। কর্মচাঞ্চল্যের বদলে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে হতাশা আর অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯ উপজেলায় প্রায় পাঁচ লাখ তাঁতকলে ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। এর মধ্যে বেলকুচি, শাহজাদপুর ও এনায়েতপুর এলাকায় প্রায় দুই লাখ তাঁতে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও থ্রি-পিস উৎপাদিত হয়। তাঁত মালিকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আগে যেখানে একটি কারখানায় ১০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে কাজ করছেন মাত্র পাঁচজন। অনেক কারখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেশিন বন্ধ থাকছে। ফলে শ্রমিকদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।
লাভলু-বাবলু কম্পোজিট টেক্সটাইলের তাঁত শ্রমিক শাহিন শেখ বলেন, ঘনঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটে কাপড় তৈরি করতে পারছি না। দিনের সিংহভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে কাজ না করে বসে থাকতে হয়। এভাবে সংসারের ব্যয় নির্বাহ এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় তাঁত শ্রমিক আব্দুল কাদের বলেন, আগে সারা দিন কাজ করে যা আয় করতাম, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলত। সাধারণত ঈদ সামনে রেখে বন্ধ থাকা তাঁত চালু হয়। তবে এবার বিদ্যুতের কারণে বেশির ভাগ তাঁতই চালু হয়নি। উল্টো চালু থাকা তাঁতগুলোই বন্ধ হতে শুরু করেছে। সময়মতো বিদ্যুৎ না থাকলে তাঁত চলে না। কাজ না থাকায় লুডু খেলেই সময় কাটাচ্ছে শ্রমিকরা।
আরেক শ্রমিক রুবেল হোসেন বলেন, আমাদের পুরো জীবিকা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এক মাসের বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ। সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে গেছে।
অন্যদিকে সুতা, রংসহ উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়লেও বাজারে কমেছে লুঙ্গি ও শাড়ির দাম। রোজার ঈদে ২২০-২৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া লুঙ্গি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়। ফলে লোকসান বাড়ছে তাঁতিদের।
বেলকুচির তামাই গ্রামের ‘রাজবিথি লুঙ্গি’ কারখানার স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম বলেন, সাধারণত ঈদ সামনে রেখে বন্ধ থাকা তাঁত চালু হয়। তবে এবার বেশিরভাগ তাঁতই চালু হয়নি। উল্টো চালু থাকা তাঁতগুলোই বন্ধ হতে শুরু করেছে। বড় বড় তাঁত কারখানার মালিকরা চড়া দামে ডিজেল কিনে কাপড় তৈরি করছেন। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় চারগুণ বাড়লেও লুঙ্গি ও শাড়ির দাম বাড়ছে না।
অপরদিকে প্রান্তিক তাঁতিরা, যাদের ৫-১০ তাঁত রয়েছে তারা বাধ্য হচ্ছে তাঁতকল বন্ধ করতে। এভাবে আর কিছুদিন চললে হস্তচালিত তাঁত বাদে পাওয়ার লুমগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। দ্রুত এ সংকট নিরসন না হলে তাঁতশিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে।
শাহজাদপুরের সাইফুল ইসলাম নামের এক প্রবীণ তাঁত ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, এই শিল্প একসময় দেশের গর্ব ছিল। কিন্তু এখন বিদ্যুৎ সংকটে ধুঁকছে। দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবারের জীবনে।
উল্লাপাড়ার আশিক উদ্দিন নামের আরেক তাঁত মালিক জানান, ডিজেলচালিত জেনারেটরে কারখানা চালু রাখলেও উৎপাদন ব্যয় প্রায় চারগুণ বেড়ে গেছে। জ্বালানির দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই বিকল্প ব্যবস্থাও চালু রাখতে পারছেন না। দ্রুত সমাধান না হলে অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা বদল করবে।
এনায়েতপুর থানার খামার গ্রামের লাভলু-বাবলু কম্পোজিট টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো অর্ডার ডেলিভারি দিতে পারছি না। কারখানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎচালিত তাঁত পাওয়ার লুম মেশিন বন্ধ করে শ্রমিকরা বাইরে বসে লুডু খেলছেন। অনেকেই আবার মোবাইলে গান শুনে আবার কেউ অলস সময় পার করছেন। এতে প্রতিদিন লোকসান বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবেকেন্দ ীয় তাঁতি সমিতির সভাপতি আব্দুস ছামাদ খান বলেন, চড়া দামে ডিজেল কিনে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে, কিন্তু কাপড়ের দাম বাড়ছে না। প্রান্তিক তাঁতিরা বাধ্য হয়ে তাঁত বন্ধ করছেন। জেলায় প্রায় তিন লাখ তাঁতের মধ্যে ইতোমধ্যে এক লাখের বেশি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ শ্রমিক। দ্রুত সংকট সমাধান না হলে এ শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সিরাজগঞ্জ কার্যালয়ের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা অমৃত সরকার বলেন, একসময় সিরাজগঞ্জের প্রতিটি অলিগলি মুখর থাকত তাঁতের খটখট শব্দে। সেই শব্দ ছিল হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও জীবিকার প্রতীক। কিন্তু আজ অনেক তাঁতঘরে নেমে এসেছে নীরবতা। যেখানে একসময় চলত তাঁত, সেখানে এখন সময় কাটে লুডুর গুটি ঘুরিয়ে। এই দৃশ্য শুধু একটি শিল্পের মন্দা নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করে।
তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি উর্ধ্বতন মহলে অবহিত করেছি। তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে স্বল্পসুদে ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশাবাদী।