সংগৃহীত
মাগুরা জেলায় এখন যেন লিচুর উৎসব চলছে। জেলার সদর উপজেলার হাজরাপুর, হাজীপুর, মিঠাপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে লিচু সংগ্রহ, বাছাই, গুচ্ছ বাঁধা ও বাজারজাত করার ব্যস্ততা।
আগাম পাকা ও সুস্বাদু হাজরাপুরী লিচুকে ঘিরে এবার জেলার অর্থনীতিতেও বড় ধরনের গতি এসেছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে মাগুরা জেলায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে হাজরাপুরী লিচু। মৌসুমের শুরুতেই খুচরা বাজারে প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। পাইকারি বাজারেও দাম ভালো পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা আগেই বাগান কিনে রেখেছেন। এখন লিচু পাকতে শুরু করায় প্রতিদিন ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে এই ফল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজরাপুর ও হাজীপুর ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষ এখন লিচুকেন্দ্রিক ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোথাও গাছ থেকে শ্রমিকেরা লিচু সংগ্রহ করছেন, কোথাও বসে গুচ্ছ বাঁধছেন নারীরা। আবার কেউ ঝুড়ি ও কার্টনে ভরে বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পুরো এলাকাজুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
শহরের ইটখোলা থেকে আলমখালী বাজার পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে ছোট ছোট বাগান মালিকদের লিচু বিক্রি করতে দেখা যায়। অনেকে বাড়ির সামনেই অস্থায়ী দোকান বসিয়ে বিক্রি করছেন নিজেদের বাগানের ফল। স্থানীয় শিশু-কিশোররাও পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই মৌসুমি আয়ে।
রাস্তার পাশে লিচু বিক্রি করা শিশু মেহমেদ বলেন, আমাদের অল্প কয়েকটা লিচুগাছ আছে। সেই গাছের লিচু পাকতে শুরু করেছে। আমরা গাছ থেকে লিচু ভেঙে এনে রাস্তার পাশে বিক্রি করছি। ১০০ লিচু ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করি। অনেকে গাড়ি থামিয়ে কিনে নিয়ে যায়।
স্থানীয়দের মতে, হাজরাপুরী লিচুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি দেশের অন্যান্য এলাকার লিচুর তুলনায় আগে পাকে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বাজারে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়। এই লিচুর খোসা পাতলা, শাঁস বেশি এবং রসে ভরপুর। স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছেও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে।
হাজরাপুর ইউনিয়নের মিঠাপুর গ্রামের লিচু চাষি শিমুল হোসেন বলেন, আমাদের প্রায় ১০০টি লিচুগাছ রয়েছে। এ বছর অর্ধেক গাছে লিচু ধরেছে। লিচুর মুকুল আসার শুরুতেই শিলাবৃষ্টির কারণে বেশ ক্ষতি হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল ফলন কম হবে। তবে পরে আবহাওয়া ভালো থাকায় এখন গাছগুলোতে মোটামুটি ভালো লিচু আছে। ইতোমধ্যে একটু একটু করে পাকতে শুরু করেছে। আগামী কয়েকদিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছি।
তিনি আরও বলেন, এবার দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। যদি আবহাওয়া খারাপ না হয়, তাহলে চাষিরা লাভবান হবে। কারণ আগাম লিচুর বাজার সব সময়ই ভালো থাকে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক পাইকার মৌসুম শুরুর আগেই বাগান চুক্তি করে কিনে রাখেন। এরপর লিচু পাকলেই শ্রমিক দিয়ে সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, বাদামতলী, সিলেট, নোয়াখালী, ফেনী ও ঢাকার বাজারে হাজরাপুরী লিচুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
লিচু ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, এ বছর আমি প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকার লিচুর বাগান কিনেছি। এসব লিচু দেশের বিভিন্ন স্থানে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠানো হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার ব্যবসা হতে পারে। গত বছর অনেক বেশি বাগান কেনা হয়েছিল। এবার তুলনামূলক সীমিত সংখ্যক বাগান কিনেছি। তবে বাজার ভালো থাকলে লাভের সম্ভাবনা আছে।
তিনি আরও বলেন, হাজরাপুরী লিচুর আলাদা একটা সুনাম আছে। আগাম বাজারে আসার কারণে অন্য জেলার ব্যবসায়ীরাও এই লিচুর জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর মাগুরা জেলায় মোট ৬৭১ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সদর উপজেলাতেই রয়েছে ৫৩১ হেক্টর জমি। হাজরাপুরী লিচুর আবাদ হয়েছে প্রায় ২৮৩ হেক্টর জমিতে। এছাড়া শালিখা উপজেলায় ৪৩ হেক্টর, শ্রীপুরে ৩৭ হেক্টর এবং মহম্মদপুর উপজেলায় ৬০ হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মাগুরা জেলায় এ বছর ৬৭১ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাজরাপুরী লিচু ২৮৩ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে ছিল, ফলে ফলনও ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে হাজরাপুরী লিচুর কালার চলে এসেছে, কিছুদিনের মধ্যেই পুরোদমে হারভেস্ট শুরু হবে। আমরা আশা করছি, চলতি মৌসুমে মাগুরা জেলায় মোট ৫০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদন ও বিক্রি হবে।
তিনি আরও বলেন, হাজরাপুরী লিচুর রোগবালাই প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। এই লিচু দেশের অন্যান্য এলাকার লিচুর তুলনায় আগে পাকে এবং বাজারেও আগে আসে। ফলে চাষিরা ভালো দাম পান। আমরা কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি যাতে তারা ভালো ফলন পান এবং বাজারজাত করতে সুবিধা হয়।
সূত্র: কালবেলা













