সংগৃহীত
আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, বাজেটের আকার বৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে সরকারের উচিত কোয়ালিটির দিকে তাকানো।
গতকাল (বৃহস্পতিবার) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস কর্তৃক আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলাপ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি কথা বলেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বাজেটের আকার বৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে সরকারের উচিত কোয়ালিটির দিকে তাকানো। জিডিপির প্রবৃদ্ধির চেয়ে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নয়ন প্রকল্পে লিকেজ বন্ধ করা। আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রচুর লিকেজ রয়েছে। সক্ষমতা ছাড়া যদি বাজেটের আকার, এডিপির আকার বাড়ানো হয় তাহলে লিকেজ আরো বাড়বে। বাজেট কিংবা এডিপির আকার বাড়িয়ে সরকার হয়তো বলবে আমাদের সময় এগুলোর আকার বেড়েছে, এটা একটা রাজনৈতিক বক্তব্য ছাড়া কিছু নয়।
তিনি বলেন, আমাদের মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে ৯ শতাংশের উপরে রয়েছে। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার কমানো সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতায় শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষাখাতে দ্রুততার সাথে সংস্কার করতে হবে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পাচ্ছে না। কৃষকরা যাতে তাদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় এবং প্রান্তিক চাষীরা যেন দেউলিয়া হয়ে না যায় সে ব্যাপারে সরকারের পলিসি থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দুর্নীতির জন্য মেগা প্রজেক্ট হয়েছে কিন্তু কর্মসংস্থান হয়নি। কর্মসংস্থান তৈরির কাজ বেসরকারি খাতের, সরকারের কাজ নয়। সরকারি চাকরি দেশের জন্য ভালো খবর নয়। এতে সরকারের ব্যয় বেড়ে যায়।
বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সহায়তা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে জবাবদিহিতা জোরদার করা জরুরি।
বক্তব্যে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির এসবিই বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাজেটের আকার প্রায় এক হাজার গুণ বেড়ে বর্তমানে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়ের কারণে অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি মন্থর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিতে ভুগেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এই মন্দা কেবল সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত। ব্যবসায়িক আস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও কর্মসংস্থান সবই নির্ভর করছে শাসনব্যবস্থার মান ও প্রতিষ্ঠানিক কার্যকারিতার ওপর।
তিনি আরও বলেন, দেশের সার্বভৌম ঋণ বর্তমানে ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এর সুদ ও মূল পরিশোধ বাবদ বার্ষিক ব্যয়ই প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ডিসেম্বর ২০২৫-এ দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শিথিল পুনঃতফসিল নীতির কারণে এই হার কিছুটা কমলেও পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশের ওপরে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সর্বনিম্ন।
তিনি বলেন, সমস্যা করের হারে নয়, বরং করের ভিত্তি সংকীর্ণ হওয়ায়। অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়ে গেছে। ফলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা চাপানো হচ্ছে, যা ন্যায়সঙ্গতও নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। করের আওতা বাড়াতে হবে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন, ই-ফাইলিং, ই-ভ্যাট ব্যবস্থা জোরদার এবং তথ্য সংযোগের মাধ্যমে। একই সঙ্গে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর, সম্পত্তি কর ও অবৈধ সম্পদের ওপর কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর আয় নির্বিশেষে সবার ওপর সমান চাপ ফেলে, যা রাজস্ব ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ কর্নেল (অব.) আশরাফ আল দীন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমদ প্রমুখ।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

.webp)
.webp)










