সংগৃহীত
উপকূলীয় সাতক্ষীরা জেলায় এক সময় লবণাক্ততার কারণে অনেক জমিতে ভালো ফসল হতো না। দীর্ঘদিন ধরে এসব জমি অনাবাদি পড়ে থাকত বা সীমিত আকারে চাষ হতো। তবে এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। লবণসহিষ্ণু জাতের বোরো ধান চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা আবারও মাঠে ফিরছেন, আর চলতি মৌসুমে শুরু হয়েছে ধান কাটার ব্যস্ততা।
২০২০ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। এতে কৃষি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেক কৃষকই চাষাবাদ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি বিভাগের পরামর্শ, গবেষণার ফলাফল এবং কৃষকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতায় বদলাতে শুরু করে পরিস্থিতি।
কুড়িকাওনিয়া গ্রামের কৃষক মজিদ শেখ ১২ বিঘা জমিতে চাষ করেন। তিনি জানান, দুর্যোগের কয়েক বছর পর জমিতে কিছুই করতে পারেননি। পরে জমিতে মিঠা পানি ধরে রেখে লবণ কমানো, আগাম বোরো চাষ এবং লবণসহিষ্ণু জাত ব্যবহার করে আবার চাষাবাদ শুরু করেন। এ বছর তার জমিতে ভালো ফলন হয়েছে এবং ধান কাটা শুরু হয়েছে।
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন জানান, তার এলাকার অধিকাংশ জমিতে উচ্চমাত্রার লবণ থাকায় সব জাতের ধান চাষ করা সম্ভব হয় না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে কয়েক বছর ধরে তিনি লবণসহিষ্ণু ব্রি-৬৭ জাতের ধান চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে এই ধান আবাদ করেছেন। গত বছর একই জমিতে তিনি প্রায় ২৭ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছেন। তার গ্রামের অনেক কৃষক এখন একই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।
শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর গ্রামের কৃষক আমিনুর ইসলাম জানান, তার এলাকার জমিগুলোতেও লবণাক্ততার মাত্রা বেশি। কয়েক বছর আগেও সেখানে বোরো ধানে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণের বেশি ফলন হতো না, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম ছিল। তবে গত চার বছর ধরে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলেছে। তিনি বলেন, এখন অনেক কৃষক চিংড়ির ঘেরেই ধান চাষ করছেন একই জমিতে মাছ ও ধান দুই ধরনের উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ৭৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে, যেখানে আগের মৌসুমে এ পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার হেক্টর। চলতি মৌসুমে এই আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার হেক্টরে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বেশি। চলতি মৌসুমে জেলায় ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে আবাদ হয়েছে ৮২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর জমিতে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বাড়ছে। তবে কৃষকেরা এখন অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করছেন। প্রতি বছরই লবণসহিষ্ণু জাতের বোরো ধানের আবাদ বাড়ছে। আমরা কৃষকদের আগাম চাষ, উন্নত জাতের বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দিচ্ছি।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাতক্ষীরা আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। এ কারণে আমরা ইতোমধ্যে ১৪টি লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছি। এর মধ্যে ব্রি ধান-৬৭, ৯৭ ও ৯৯ উল্লেখযোগ্য। এসব জাত ১২ থেকে ১৪ ডিএস পর্যন্ত লবণ সহ্য করতে পারে এবং বিঘাপ্রতি ২৬ থেকে ২৭ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।
এক সময় যে জমি লবণাক্ততার কারণে অনাবাদি ছিল, আজ সেখানে ধান কাটার দৃশ্য এটি শুধু একটি কৃষকের গল্প নয়, বরং উপকূলীয় কৃষকদের জন্য একটি কার্যকর অভিযোজন কৌশল, যা অনুসরণ করে অন্যরাও নিজেদের জীবন বদলাতে পারেন।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

.webp)
.webp)







