সংগৃহীত
দেশে নতুন করে উগ্রবাদী সংগঠনের তৎপরতা ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি স্থাপনায় সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা গোয়েন্দা সতর্কতার মধ্যে চার উগ্রবাদী তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পাকিস্তানে ২০০৮ সালে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে বাংলাদেশে ওই চার তরুণকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার যুবকরা হলেন, মো. ইমরান চৌধুরী (২৯), মো. মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) ও আবু বক্কর (২৫)।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাত থেকে ধারাবাহিক অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করে ডিবি রমনা বিভাগের একটি দল।
ডিবি রমনার দাবি, তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও ড্রোন উদ্ধারসহ নিষিদ্ধ উগ্রবাদী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টতার আলামত ও তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কোন সে উগ্রবাদী সংগঠন? সে ব্যাপারে দায়ের করা মামলায় কোনো নাম উল্লেখ করেনি পুলিশ। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আরসা’ নামে নিজেদের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগ করলেও তাদের আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ ও উদ্ধারকৃত আলামত বিশ্লেষণ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা।
টিটিপি সংশ্লিষ্টতার তথ্যে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয় আবু বক্করকে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তারদের একজন আবু বক্কর ডিএমপির কামরাঙ্গীরচর থানাধীন রূপনগর এলাকার মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে। বিমানবন্দর হয়ে চীন পালানোর চেষ্টাকালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করে একটি গোয়েন্দা সংস্থা।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উগ্রবাদী হামলার শঙ্কায় পুলিশ কর্তৃক সতর্কবার্তা জারির প্রেক্ষাপটে দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) বেবিচক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠির পর দেশের ৮টি বিমানবন্দরে নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো সব সময়েই নিরাপত্তা বলয়ে থাকে। এরপরও পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠি পাওয়ার পর তা আরো বাড়ানো হয়েছে। এটি নিয়মিত কাজের অংশ।’
ওই ২৭ এপ্রিল রাতেই আবু বক্কর দেশ ত্যাগের জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান। তার পাসপোর্ট নম্বর এ০৭১৫৬৬২০। চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের এমইউ২০৩৬ ফ্লাইটে করে চীনের গুয়াংজু যাওয়ার উদ্দেশ্যে ইমিগ্রেশনও সম্পন্ন করেন তিনি। এর মধ্যেই একটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর তার দেশত্যাগ ঠেকাতে সম্পন্ন হওয়া ইমিগ্রেশন বাতিল করা হয়। ইমিগ্রেশন বাতিলের জন্য ইমিগ্রেশন পুলিশে একটি জিডিও নথিভুক্ত হয় (জিডি নং ২১৫০)। এরপর র্যাব-১ এর সদর কোম্পানির একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে তাকে হেফাজতে রেখে বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি উগ্রবাদী সংগঠনে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করলেও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টে তার নিষিদ্ধ সশস্ত্র সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য মেলে। এরপর র্যাবের সেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাকে আটক করে নিয়ে যান। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে বাকি তিন যুবককে গ্রেপ্তার করে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ডিবি রমনার একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কামরাঙ্গীরচর থানাধীন তারা মসজিদ সংলগ্ন কয়লাঘাট সাবান ওয়ালার বাড়ির চতুর্থ তলার মাঝের ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করে। তথ্য ছিল, কতিপয় উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে সরকার ও দেশকে অস্থিতিশীল করতে অস্ত্র, গুলি ও মাদকসহ অবস্থান করছে। সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার আলী আশরাফের নেতৃত্বে ওই টিম রাত ৩টা ৫ মিনিটের দিকে অভিযান পরিচালনা করে প্রথমে ইমরান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে। ইমরান হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার পহেলা গ্রামের রমজান চৌধুরীর ছেলে।
জিজ্ঞাসাবাদে ইমরান ডিবি পুলিশকে জানায়, তাদের ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি তার ছোট ভাই মোস্তাকিম চৌধুরীর কাছে আছে। মোস্তাকিমের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ থানাধীন জিয়ানগর কাঁচা রাস্তার বিসমিল্লাহ ওয়ার্কশপে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মোস্তাকিম চৌধুরীর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ওয়ান শ্যুটারগান, ১৪ রাউন্ড গুলি, ৩টি গুলির খোসা ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। এরপর কামরাঙ্গীরচর থানাধীন রসুলপুর সাকিনের শিকসন ব্রিজ সংলগ্ন ব্রিজ মার্কেটের এম এস সুজ-এর সামনে থেকে রিপন হোসেন শেখ ও আবু বক্করকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ইমরান চৌধুরী ও তার ছোট ভাই মোস্তাকিম চৌধুরী পূর্বপরিচিত হিসেবে রিপন হোসেন শেখ ও আবু বক্করকে শনাক্ত করে। তাদের হাতে থাকা দুটি ব্যাগ থেকে ডিভিআর, ড্রোন, ২টি সার্কিট, মেটাল ডিটেক্টর, ‘দ্বীন কায়েমের আকিদা’ ও ‘মোটিভেশনাল মোমেন্ট’ বই, ‘তহফায়ে দাওয়াত’, ল্যাপটপ, বাটন মোবাইলসহ স্মার্টফোন, ৯০০ গ্রাম বিস্ফোরক জাতীয় পাউডার ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়।
ডিবি পুলিশ কর্তৃক কামরাঙ্গীরচর থানায় দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়, পরস্পর যোগসাজশে বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, বিস্ফোরক দ্রব্য, জিহাদী বই, ড্রোন ও সামরিক পোশাক সাথে রেখেছিল তারা। তারা বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখে সশস্ত্র সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারায় লিপ্ত ছিল। একে অপরকে সহযোগিতা, প্রচার ও প্ররোচনায় তারা সক্রিয় ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে ও প্রাথমিক তদন্তে তথ্য মিলেছে মর্মে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও র্যাব-১ এর অধিনায়ক ও সদর কোম্পানি কমান্ডারের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
গ্রেপ্তার চার যুবক ৪ দিনের রিমান্ডে
গ্রেপ্তার ইমরান চৌধুরী, মোস্তাকিম চৌধুরী, রিপন হোসেন শেখ ও আবু বক্করকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেলে ডিএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম বলেন, দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার চার উগ্রবাদী যুবককে আদালতে পাঠানো হয়েছে। রিমান্ডে পেলে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যাবে। আমরা জেনেছি তারা সন্ত্রাসী সংগঠন এবং এতদিন বিভিন্নভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
উগ্রবাদীরা আসলেই নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে কি না, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাথাচাড়া দিচ্ছে এমনটা বলব না। আমি শুধু বলব, যারা এসব কাজে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতীতেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আগামীতেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতীত সরকারের সময়ে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজানো হতো, বর্তমানে এসব কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট ব্যাখ্যা জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো আসামিকে ধরে নাটক সাজানোর কাজ পুলিশের না। পুলিশের কাজ হলো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। এই ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি।
যোগাযোগ করা হলে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, সিটিটিসির কাজে গতি ফিরেছে। আমরা উগ্রবাদ বিষয়ে কাজ করছি। তবে এই অভিযান সম্পর্কে এখনো অফিশিয়ালি কিছু জানি না। মামলা আমাদের কাছে আসলে আমরা বলতে পারব।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা রিমান্ড আবেদনের প্রেক্ষিতে চার দিনের রিমান্ড পেয়েছি। জিজ্ঞাসাবাদে আর কারা কারা এই উগ্রবাদী কার্যক্রমে জড়িত তা জানার চেষ্টা করা হবে।
এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরসার নাম বললেও তদন্তে ও তাদের যোগাযোগের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টে ভিন্ন নাম আসছে; আমরা সেটি গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছি।
তবে ডিবির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গ্রেপ্তার চার যুবক আরসা নামে যোগাযোগ শুরু করলেও তারা মূলত টিটিপির সাথে সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে আবু বক্করের ক্ষেত্রে টিটিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য যে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি স্থাপনায় সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কায় গোয়েন্দা সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (গোপনীয়) কামরুল আহসানের স্বাক্ষরিত একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে এ সতর্কতা জারি করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের ওই বার্তায় সুনির্দিষ্ট করে উগ্রবাদী সংগঠনের নাম বলা হয়নি, তবে সম্প্রতি সংগঠনটির ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামে এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
গোপনীয় এ চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ বজায় রাখছে এবং তারা সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জাতীয় সংসদ ভবন, গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ ও সামরিক স্থাপনা, উপাসনালয়, বিনোদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীটি হামলার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসন্ধান করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সতর্কতা বার্তার অনুলিপি সিআইডি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), সিটিটিসি এবং দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
.webp)








