বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩

ডা. মোস্তাফিজুরকে ঢামেকে বদলি করেও যোগ দিতে দেওয়া হয়নি, ১৩ দিন পর ওএসডি

ডা. মোস্তাফিজুরকে ঢামেকে বদলি করেও যোগ দিতে দেওয়া হয়নি, ১৩ দিন পর ওএসডি

সংগৃহীত

মুগদা মেডিকেল কলেজের (মুমেক) সদ্য সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমানকে গত ৩০ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক (পেডিয়াট্রিকস) পদে বদলি করা হয়। পরদিন ১ এপ্রিল তিনি ঢামেক অধ্যক্ষ বরাবর যোগদান দাখিল করেন। তবে ১৩ দিন ওই যোগদানপত্র গ্রহণ না করে নানা নাটকীয়তা শেষে তাকে ওএসডি করা হয়।

গত ১৪ এপ্রিল তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃ-স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে। এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পক্ষ নেওয়া এবং অর্থ সরবরাহের কারণে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে তাকে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে বারবার বদলি, যোগদান আটকে রাখা এবং পরবর্তীতে ওএসডি করা এ ধরনের সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যখাতের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো বার্তা দেয় না। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই নন, পুরো চিকিৎসক সমাজের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সে সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অংশগ্রহণ ও অর্থ সরবরাহের অভিযোগ তোলে সরকারপন্থী চিকিৎসকরা। এ অভিযোগে ১৮ জুলাই অধ্যাপক পদ থেকে পদাবনতি দিয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ আকারে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়। ব্যাপক সমালোচনার পর ওই বছরের ১১ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার সেই বদলি আদেশ বাতিল করে।

অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের  একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশের ইতিহাসে চিকিৎসকদের যে সর্ববৃহৎ সুপারনিউমারারি পদোন্নতি হয়, সেই পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর ধারাবাহিকতায় তাকে মুমেকে অধ্যক্ষ করা হয়। সে সময় বাজেট জটিলতায় মুগদা মেডিকেল কলেজের শিক্ষকরা দুই মাস এবং আউটসোর্সিং কর্মচারীরা ৬ মাস যাবত বেতন পাচ্ছিলেন না। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান যোগদানের অল্প কিছুদিন পরই এই সমস্যার সমাধান করেন। এ ছাড়া তিনি ডোনেশনের মাধ্যমে একটি ব্যাংক থেকে ছাত্রছাত্রীদের চলাচলের জন্য একটি বাস সংগ্রহের জন্য একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুগদা মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষক বলেন, “এত কিছুর পরেও কোনো কারণ ছাড়াই মাত্র দুই মাস ২০ দিনের মাথায় অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানকে অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক হিসেবে পদায়ন করা হয়। কিন্তু তিনি পহেলা এপ্রিল মুগদা মেডিকেল কলেজ থেকে রিলিজ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগদানপত্র জমা দিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ তার যোগদান গ্রহণ করেনি। আবারও ১৩ দিনের মাথায় তাকে ওএসডি করে মাতুয়াইল হাসপাতালে সংযুক্ত করা হয়েছে।”

সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের পার-১ শাখা থেকে যুগ্মসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ওএসডি করা হয়। এর আগে গত ৩০ মার্চ এক আদেশে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানকে মুমেক অধ্যক্ষ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পেডিয়াট্রিক্স বিভাগে বদলি করা হয়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১১ ও ২০১৩ সালে প্রমোশন বঞ্চিত হয়েছেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেব পদোন্নতির একদিন পরেই সেই পদোন্নতি আদেশ বাতিল করা হয়।

এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আহত মানুষের চিকিৎসায় এগিয়ে আসা এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক বদলি, ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) ও প্রশাসনিক হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)।

বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, আন্দোলনের সময় আহতদের চিকিৎসায় এগিয়ে আসা চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের অবমাননা নয়, বরং এতে স্বাস্থ্য খাতে ভয়, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। দেশের সংকটময় সময়ে মানবিক দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ অনভিপ্রেত ও উদ্বেগজনক। অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের যত্রতত্র বদলি ও ওএসডি করার ফলে হাসপাতালের সেবা, বিশেষায়িত চিকিৎসা, মেডিকেল শিক্ষা এবং রোগীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

সংগঠনটি বলেছে, আমরা মনে করি সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের প্রবণতা বাড়ছে, যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হুমকি। পেশাগত যোগ্যতা ও সততার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দিলে তা দেশের চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

এসময় বিবৃতিতে চার দফা দাবি জানান এনডিএফ নেতৃবৃন্দ। দাবিগুলো হলো- সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নেওয়া বদলি, ওএসডি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার; পদায়ন ও বদলিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত; স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ বন্ধ, এবং চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট