রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩

লুটেরাদের ফেরাতে আইন বদল ঝুঁকিতে ব্যাংক খাত

লুটেরাদের ফেরাতে আইন বদল ঝুঁকিতে ব্যাংক খাত

সংগৃহীত

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে করা ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংশোধিত আইনের কিছু ধারায় আগের লুটপাটে জড়িত গোষ্ঠীরা আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফেরার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের মতে, এতে ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা আরও কমবে এবং দেশের অর্থনীতিও নতুন করে ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

রাজধানীর কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬: আবারও ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাত’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য রাখেন।

হঠাৎ করে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে লুটকারীদের মালিকানায় আসার সুযোগ রাখার সমালোচনা করেন।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এস আলম ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে লুটের সহযোগী ছিলেন আজকের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। লুটেরার সহযোগী হিসেবে এখন উনার থাকার কথা জেলে। অথচ আছেন বঙ্গভবনে। এ নিয়ে জাতি হিসেবে আমরা আত্ম মর্যাদাবোধ সম্পন্ন হতে পারি কিনা, মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি কিনা- সে প্রশ্ন রেখে গেলাম।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকখাতের প্রতি আস্থা ফেরানোর জন্য তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, চোর ধরে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবার যেন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি না করতে পারে সে জন্য পদ্ধতিগত সংস্কার আনতে হবে। বেনামি ঋণ নিয়ে হুন্ডি করে যেন পাঠাতে না পারে সে জন্য ক্যাসলেস হওয়া খুব জরুরী। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীন করতে পারলে এধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা যেতো।’

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনে সব লুট হয়েছে। ফলে ব্যাংক রেজল্যুশন না করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্যও একটা রেজল্যুশন দরকার। এটাও বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ।’

তিনি বলেন, ‘এখন হয়তো বলা হচ্ছে; সরকার যে অর্থ দিয়েছে তার সাড়ে ৭ শতাংশ দিয়ে আগের পরিচালকরা মালিকানা নিতে পারবে। এস আলমদের ফিরিয়ে আনতে এক পর্যায়ে দেখা যাবে এই শর্ত শিথিল করে শুন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর আগে ঋণ পুনঃতপশিলের ক্ষেত্রে যেমনটি শুরুতে ১০ শতাংশ ডাউনপেমেন্টের শর্ত ছিলো। পরে তা ১ শতাংশে নামানো হয়।’

তিনি বলেন, ‘দেশে একের পর এক ব্যাংকের লাইসেন্স দিলেও কোনো এক্সিট পলিসি করা হয়নি। যে কারণে এখন জনগণের টাকায় ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে। মানুষ টাকা রেখেছে তার শতভাগ টাকা ফেরত দিতে হবে, এটাই নিয়ম। আমানতকারীর জন্য বেইল আউট করতে হবে। তা না করে আমাদের এখানে কেবল ঋণখেলাপিদের জন্য বেইল আউট করা হয়।’

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোসতাক খান বলেন, ‘অন্য দুর্নীতির সাথে ব্যাংক খাতের তুলনা করা যাবে না। ব্যাংক, জাতীয় নিরাপত্তার মতো কিছু ইস্যু রয়েছে যেখানে দুর্নীতি ঢুকে পড়লে পুরো দেশ ধ্বসে পড়তে পারে। ব্যাংক চলে আস্থার ওপরে। আস্থা ধরে রাখতে হলে এ খাতের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে কঠোর বার্তা দিতে হবে। তা না করে আগের লুটেরাদের ফিরে আসার ধারা যুক্ত করে পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। আস্থাহীনতার কারণে দেশের সবচেয়ে ভালো ব্যাংক থেকেও টাকা তুলতে শুরু করলে যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে।‘

নর্থ সাউথ বিশব্বিদ্যালয়ের ব্যবসা বিভাগের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, রেজলুশ্যন আইনে নতুন ধারা ব্যবহার করে এস আলম ও তার সংশ্লিষ্টদের রুগ্ন ব্যাংকে ফিরিয়ে আনা উদ্দেশ্য না। বরং দেশের অন্যতম সফল ইসলামী ব্যাংকের দফল নেওয়া এর উদ্দেশ্য হতে পারে। আপাতত আইনে এটা না থাকলেও পরবর্তীতে দেখা যাবে যুক্ত করা হয়েছে।‘ 

এমনভাবে আইন করা হবে- চাইলে তারা এক টাকা দিয়েও মালিকানায় আসতে পারবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিলো ২২ হাজার কোটি টাকা। সেটা এখন সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকার ওপরে রয়েছে।‘

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘সরকার ব্যাংক রেজলুশ্যন অধ্যাদেশই বাতিল করতে চেয়েছিলো। তবে আইমএফের প্রশ্নের মুখে সেটা পারেনি। তবে যে ধারা যুক্ত করেছে সেটা মরার ওপর খাড়ার ঘা। এস আলমদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ রেখে আইন সংশোধ করা হয়েছে। এখন চট্রগ্রামের দুইজন মন্ত্রীর মধ্যে প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে কে কার চেয়ে এস আলমের কাছের লোক তা প্রমাণে।‘ 

তিনি বলেন, ‘এখন কৃষক কার্ডের নামে বাড়তি খরচ করা হচ্ছে। শুধু এই কার্ডের প্রচারের বিল, বোর্ডের জন্য ৪১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শেখ হাসিনা মুজিব শতর্বষের প্রচারণায় খরচ রেখেছিলো ১০০ কোটি টাকা। আর জ্বালানি খাতের সঙ্কট সৃষ্টির বিষয়টি সরকারি দলের লোকদের ব্যবসার সুযোগ ছাড়া কিছুই না।‘

ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘দেশের একটি সিকিউরিটি গার্ডেরও যোগ্যতা নির্ধারণ করা থাকলেও ব্যাংকের পরিচালকের জন্য তা নেই। শেয়ারবাজার থেকে ২ শতাংশ শেয়ার কিনে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক দখল করা হয়েছিলো। এসব ঠিক করা দরকার।‘

প্রথম আলোর হেড অফ অনলাইন শওকত হোসেন মাসুম বলেন, ‘কিছু ব্যাংক পরিকল্পিতভাবে চলতে দেওয়া হয়নি। আর কিছু ব্যাংক যে দেউলিয়ার পর্যায়ে যাবে এটা আগেই বোঝা গেছিলো। এখন ৫টি দূর্বল ব্যাংক একীভূত করে সফল হওয়া খুবই দুরুহ ব্যাপার। সবাই যখন ভুলে যাবে এক পর্যায়ে হয়তো আগের মালিকদের ফিরিয়ে আনা হবে।‘

সিএফএ এসোসিয়েশনের সভাপতি আসিফ খান বলেন, ‘ব্যাংকের আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তারা তাদের জমা টাকা ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়েই সংশয়ে আছেন। এই আস্থাহীনতা দূর করতে তিনি আমানতকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বন্ড চালুর প্রস্তাব দেন।‘

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

অনলাইন জরিপ

২৬ এপ্রিল ২০২৬ || ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১২৯জন