বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নারী সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক নূরজাহান বেগমের অনন্য সংগ্রাম

নারী সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক নূরজাহান বেগমের অনন্য সংগ্রাম

সংগৃহীত

শুধু বাংলাদেশ নয় গোটা উপমহাদেশেই নারীদের পেশাগত অগ্রযাত্রার ইতিহাস খুব একটা সহজ ও সুখকর নয়। নানা প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা এমনকি ধর্মীয় ও প্রথাগত গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে নারীদের সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে।

পুরুষশাসিত সমাজে পদেপদে প্রমাণ দিয়ে হয়েছে পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতার। সৃজনশীল পেশা হিসেবে সাংবাদিকতায় সেই অভিযাত্রার অনন্য নাম নূরজাহান বেগম। যে নামটি অনেকটা সমার্থক হয়ে উচ্চারিত হয় সাপ্তাহিক পত্রিকা বেগম এর সাথে। অনেকেই বলে থাকেন নূরজাহানের বেগম পত্রিকা। নূরজাহানের বেগম ছিলেন উপমহাদেশের নারী সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক ও সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার নিবেদিতপ্রাণ সম্পাদক।

সাপ্তাহিক বেগম-এর আলোচনায় আসার আগে একটু পেছন ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৭৮০ সালে কলকাতার ৬৭ নম্বর রাধাবাজার ছাপাখানা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র হিকি’জ বেঙ্গল গেজেট। এর ঠিক ৯০ বছর পর ১৮৭০ সালে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গমহিলা’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা। এটির সম্পাদক ছিলেন মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়। এটি ছিল নারী বিষয়ক ও নারীদের নিয়ে পত্রিকা।

এরপর ১৮৭৫ সালে নারীদের নিয়ে আরেকটি মাসিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। যার নাম ‘অনাথিনী’, সম্পাদক ছিলেন থাকমনি দেবী। এরপর ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই অর্থাৎ দেশ বিভাগের মাত্র ২৪ দিন আগে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বেগম। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে ছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের ছবি। এক কপির দাম ছিল চার আনা।

কলকাতায় বেগমের অফিস ছিল ১২ নম্বর ওয়েলেসলি স্ট্রিটে। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। আর তার প্রধান সহায় ছিলেন নূরজাহান বেগম। যিনি ছিলেন পত্রিকায় নারী স্বাধীনতা, নারী জাগরণ, অধিকার, কুসংস্কারবিরোধী বিভিন্ন লেখা সম্পাদনা ও বাছাইয়ের দায়িত্বে। এছাড়া পত্রিকাটির নানা দিক দেখাশোনা করতেন নূরজাহান বেগম।

১৭৮০ সালে কলকাতার ৬৭ নম্বর রাধাবাজার ছাপাখানা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র হিকি’জ বেঙ্গল গেজেট। এর ঠিক ৯০ বছর পর ১৮৭০ সালে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গমহিলা’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা। এটির সম্পাদক ছিলেন মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায়। এটি ছিল নারী বিষয়ক ও নারীদের নিয়ে পত্রিকা।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন সাপ্তাহিক বেগম ছিল নারীদের জন্য বিশেষ এক প্রকাশনা। চরিত্রগতভাবে পত্রিকাটি ছিল অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল। যাতে উঠে আসতো গ্রামগঞ্জের নির্যাতিত নারীদের চিত্র, জন্মনিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের জীবনকাহিনী থেকে শুরু করে নানা কিছু। প্রকাশিত হতো পাঠকের চিঠিপত্রও।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ শুধু উপমহাদেশের মানচিত্রই পরিবর্তিত হয়নি। এতে পাল্টে যায় বহু মানুষের জীবন। সেই রক্তাক্ত পালাবদলের পরিক্রমায় কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন বাবার সাথে নূরজাহান বেগম। একটু উল্লেখ করা প্রয়োজন দেশ বিভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ-এর আজাদ। আবুল মনসুর আহমদের ইত্তেহাদ ঢাকায় আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরে সংবাদপত্রটির অকাল মৃত্যু ঘটে। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সাপ্তাহিক বেগম প্রকাশের মাত্র চার মাসের মাথায় দেশ বিভাগের অভিঘাতে বেগম সুফিয়া কামাল স্থায়ীভাবে ঢাকা চলে আসলে কলকাতাতেই পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন নূরজাহান বেগম। দেশ বিভাগ ও দাঙ্গা সংঘাতের সেই বিভীষিকাময় সময়েও নূরজাহান বেগম পত্রিকাটির প্রকাশনা চালিয়ে যান। এমনকি ১৯৪৮ সালে প্রকাশ করেছিলেন বিশেষ সচিত্র ঈদ সংখ্যা। দাম ছিল ২ টাকা। এরপর বাধ্য হয়ে ১৯৫০ সালে বাবার সঙ্গে নূরজাহান বেগম ঢাকায় চলে আসেন। পুরান ঢাকার বাড়িকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় সাপ্তাহিক বেগম এর যাবতীয় কাজকর্ম।

এরপর দীর্ঘদিন সাপ্তাহিক বেগম সম্পাদনা করেছেন নূরজাহান বেগম। উল্লেখ করা প্রয়োজন, উপমহাদেশের প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ছিল বেগম। সেই সময়ে ছবিসব নারীদের একটি পত্রিকা অনেকটায় অকল্পনীয় বিষয় ছিল। ছিল নানা প্রতিকূলতা। তবে সবকিছু জয় করেছিলেন নূরজাহান বেগম।

এই কঠিন যাত্রা পথে তিনি সাহায্য পেয়েছিলেন দুইজন উদারমনা পুরুষের। একজন হলেন তার বাবা সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তিনি ছিলেন উদারমনস্ক ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। যার সখ্য ছিল বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের। বেগম রোকেয়ার পরামর্শেই কন্যা নূরজাহান বেগমকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।

দেশ বিভাগ ও দাঙ্গা সংঘাতের সেই বিভীষিকাময় সময়েও নূরজাহান বেগম পত্রিকাটির প্রকাশনা চালিয়ে যান। এমনকি ১৯৪৮ সালে প্রকাশ করেছিলেন বিশেষ সচিত্র ঈদ সংখ্যা। দাম ছিল ২ টাকা।

পরে তিনি সওগাত নামে (প্রথম প্রকাশ ১৯১৮) নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকাটি ছিল প্রগতিশীল সমাজের মুখপত্র। এই সাহিত্য পত্রিকায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক সাহিত্য কর্ম প্রকাশিত হতো। এছাড়া প্রকাশিত হতো নারীদের লেখা ও ছবি।

এই পত্রিকার কাজ করতে গিয়েই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন নারীদের একটি আলাদা সাপ্তাহিক পত্রিকার কথা চিন্তা করেছিলেন। পরে মূলত তার তত্ত্বাবধায়নে ১৯৪৭ আলোর মুখ দেখেছিল সাপ্তাহিক বেগম। যেখানে নিবেদিত হয়ে কাজ করতেন নূরজাহান বেগম। পরে নূরজাহান বেগমের বিবাহ হয় আরেকজন সংস্কৃতিমনা ও বিজ্ঞানমনস্ক বুদ্ধিজীবী  রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের সঙ্গে। যিনি ছিলেন শিশুদের সাংস্কৃতিক সংগঠন কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা।

ঢাকায় বেগম-এর প্রকাশনা বেশ জাঁকজমকভাবে শুরু হলেও প্রথম দিকে পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় করতে নূরজাহান বেগমকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। বলাই বাহুল্য, কলকাতার লেখক-পাঠক সমাজের তুলনায় ঢাকায় পাঠক-লেখক সমাজ ছিল খুবই ছোট। তাই বেগম এর চাহিদাও কমে যায়।

লেখক পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে অনেক তাগাদা দিয়ে লেখা সংগ্রহ করতে হতো নূরজাহান বেগমকে। শুধু তাই নয় পত্রিকার হকারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে পাঠকের বাড়িতেও কখনো কখনো বেগম এর কপি পৌঁছে দিয়েছিলেন নূরজাহান বেগম। এটাই ছিল পত্রিকাটির প্রতি তার একাগ্রতা ও ভালবাসা।

এছাড়া তিনি ঢাকা থেকে বেগম এর ঈদ সংখ্যা বের করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যেটি ছিল রীতিমতো একটি মহাযজ্ঞ। এরপর ধারাবাহিকভাবে অন্তত ২টি প্রজন্মকে লেখনী ও পাঠের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে নূরজাহান বেগম সম্পাদিত বেগম পত্রিকা। যা বাংলার নারীদের মধ্যে সৃজনশীলতা ও মননশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর পুরো সময়জুড়ে তিনিই ছিলেন পত্রিকাটির প্রধান কারিগর। এই মহীয়সী নারী ২০১৬ সালের ২৩ মে মৃত্যুবরণ করেন।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

অনলাইন জরিপ

০৪ জুন ২০২৬ || ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১২৯জন

সর্বশেষ:

শিরোনাম: