রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বারবার কমিশন-শূন্য দুদক, কার্যক্রমে স্থবিরতা

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বারবার কমিশন-শূন্য দুদক, কার্যক্রমে স্থবিরতা

সংগৃহীত

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে বারবার অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যার ফলে সংস্থাটির দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। গত ৩ মার্চ মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর ৩৮ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও গঠিত হয়নি নতুন সার্চ কমিটি। যদিও আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

কমিশনের অনুপস্থিতিতে নতুন মামলা, চার্জশিট, আসামি গ্রেপ্তার কিংবা দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোকের মতো নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীরা। একদিকে আইনি জটিলতা আর অন্যদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় স্বাধীন এই সংস্থাটি এখন কার্যত অচল হয়ে আছে।

দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালে গঠন করা হয় স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটিতে মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান এবং সর্বশেষ কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন।

বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানামুখী জটিলতায় দুদকের কমিশন গঠনের ধারাবাহিকতায় বারবার ছন্দপতন ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে, সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনকে মেয়াদের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, মো. বদিউজ্জামান ও ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনগুলো তাদের নির্ধারিত সময় পূর্ণ করতে পারলেও সেই সৌভাগ্য হয়নি বাকিদের। 

অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান থাকলেও কমিশন না থাকায় বর্তমানে সম্পদ ক্রোক, নতুন মামলা, আসামি গ্রেপ্তার ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কাজ বন্ধ রয়েছে। কমিশন না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা। নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করাও সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দুদকে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছেদুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা

বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং সর্বশেষ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করা ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে।

সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান, অনুসন্ধান ও তদন্তে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছে মোমেন কমিশন। এই অল্প সময়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগের বিপরীতে মামলা ও চার্জশিটে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুদকের জালে ফেঁসেছেন। যার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার, ওই সরকারের প্রায় সব মন্ত্রী, সাবেক আমলা ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা রয়েছেন। একই সময়ে দেশে ও বিদেশে অর্থপাচারকারী ও ঋণখেলাপিদের প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়। 

তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান থাকলেও কমিশন না থাকায় বর্তমানে সম্পদ ক্রোক, নতুন মামলা, আসামি গ্রেপ্তার ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার কাজ বন্ধ রয়েছে। কমিশন না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা। নতুন কোনো অনুসন্ধান শুরু করাও সম্ভব হচ্ছে না, ফলে দুদকে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে স্বাধীন এই সংস্থাটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট চারজন চেয়ারম্যানকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিদায় নিতে হয়েছে

ইতিহাস কী বলছে?

দুদকের পরিসংখ্যান ও ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে স্বাধীন এই সংস্থাটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট চারজন চেয়ারম্যানকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিদায় নিতে হয়েছে।

সুলতান হোসেন খান ও হাসান মশহুদ চৌধুরী (২০০৪-২০০৯)

২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। কিন্তু তিন বছর পার হতেই ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগ করেন। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে ২২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব পান সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী। দুই বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল তিনিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর ওই বছরের ৩০ এপ্রিল দায়িত্ব নেন সাবেক সচিব গোলাম রহমান।

 

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ কমিশন (২০২১-২০২৪)

দীর্ঘ সময় পর ২০২১ সালের ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। তিনি তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে ’২৪-এর ২৮ অক্টোবর পুরো কমিশনসহ পদত্যাগ করেন।

দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, কোনো কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এমনকি নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ ‘সার্চ কমিটি’ও এখনো গঠন করা হয়নি

মোমেন কমিশন (২০২৪-২০২৬)

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ কমিশনের বিদায়ের প্রায় দেড় মাস পর ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের নতুন কমিশন গঠন করা হয়। পাঁচ বছরের মেয়াদে নিয়োগ পেলেও মাত্র ১৫ মাসের মাথায় আবারও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তাদের পথচলা থামিয়ে দেয়। এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পর ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ড. মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন।

সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন / ছবি- সংগৃহীত

মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর ইতোমধ্যে ৩৮ দিন পার হয়ে গেলেও নতুন কমিশন গঠনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, কোনো কমিশনারের পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নিয়োগ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। এমনকি নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ ‘সার্চ কমিটি’ও এখনো গঠন করা হয়নি, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা করা, আসামি গ্রেপ্তার, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা কিংবা বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেবল কমিশনের। ফলে এই অভিভাবকহীন অবস্থায় দুদকের সকল অভিযান ও আইনি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সার্চ কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতাই এই বিলম্বের মূল কারণ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ সরাসরি সংসদে অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তার ওপরই এখন নির্ভর করছে দুদকের ভবিষ্যৎ। আর এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণে থমকে আছে সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া, যা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগকে আরও দীর্ঘায়িত করার শঙ্কা তৈরি করেছে।

দুদক আইন অনুযায়ী, অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা করা, আসামি গ্রেপ্তার, দুর্নীতিবাজদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা কিংবা বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মতো প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা কেবল কমিশনের। ফলে এই অভিভাবকহীন অবস্থায় দুদকের সকল অভিযান ও আইনি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কমিশন-শূন্যতা কার্যত দুর্নীতিবিরোধী দেশের একমাত্র এই প্রতিষ্ঠানটিকে থমকে রেখেছে।

২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৫৯৪টি মামলা, ৪১৩ চার্জশিট

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে দুদকের বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৪৩৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে ২২৭টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তি (অভিযোগ থেকে অব্যাহতি) হয়। একই সময়ে ৩২৮টি মামলা ও ৩৪৫টি মামলার চার্জশিট দিয়েছিল দুদক। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সর্বাধিক ১০০ ও ৭৩টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হলেও ওই বছরের নভেম্বরে কোনো অনুসন্ধানই হয়নি তৎকালীন মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ’র নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগের কারণে। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের নভেম্বরে মামলা, চার্জশিট কিংবা অন্যান্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি; অর্থাৎ সে সময় দুদকের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল।

 

২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটিতে জমা পড়া ১৩ হাজার ৮৭৭টি অভিযোগের বিপরীতে আমলযোগ্য ২ হাজার ৫৩৬টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় মোমেন কমিশন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৫৯৪টি মামলা ও ৪১৩টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়। একই সময়ে ৪৩২ জনকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারি করা হয়। 

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে দুদকের ৩৭০টি আবেদনের বিপরীতে অবৈধভাবে অর্জিত এবং বিদেশে পাচার হওয়া ২৯ হাজার ৩১০ কোটি ১২ লাখ ৭ হাজার ১৫৩ টাকা মূল্যের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধের আদেশ দেন আদালত।

এ বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ১৭৯টি অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করার পাশাপাশি ১২৩টি মামলা ও ৫৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯১৩ জন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের ৮৯টি সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করা হয়। ৩ মার্চ মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর থেকে মামলা ও চার্জশিটসহ আইনগত গুরুত্বপূর্ণ সকল সিদ্ধান্ত বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে মামলা ও চার্জশিটের সিদ্ধান্ত ‘শূন্য’।

দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ‘স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে একমত হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত পর্যায়ে এই বিধানটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছেটিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান

কমিশন নিয়োগ নিয়ে আইনে যা বলা হয়েছে

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ এর ১০ ও ১১ ধারায় চেয়ারম্যানসহ কমিশনারের পদত্যাগ ও তাদের সাময়িক শূন্যতা পূরণে করণীয় সম্পর্কে বলা আছে। 

১০ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কমিশনার রাষ্ট্রপতি বরাবর এক মাসের লিখিত নোটিশ প্রদানপূর্বক স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকে যে, চেয়ারম্যান ব্যতীত অন্যান্য পদত্যাগকারী কমিশনাররা ওই নোটিশের একটি অনুলিপি চেয়ারম্যান বরাবর অবগতির জন্য প্রেরণ করবেন।

উপ-ধারা (২) এর অধীনে বলা হয়েছে, পদত্যাগ সত্ত্বেও পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনবোধে পদত্যাগকারী কমিশনারকে তার দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করতে পারবেন।

অপসারণের বিষয়ে (৩) উপধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না।

চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে সাময়িক শূন্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে ১১ ধারায়। ওই ধারা অনুসারে, কোনো কমিশনার মৃত্যুবরণ করলে বা স্বীয় পদ ত্যাগ করলে কিংবা অপসারিত হলে, রাষ্ট্রপতি ওই পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এই আইনের বিধান সাপেক্ষে কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে শূন্য পদে নিয়োগদান করবেন।

দুদকে কমিশন নেই মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে অচল করে রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, দুর্নীতি দমনের যে কথা বলা হয়, তা আসলে আন্তরিক নয়। কমিশন নেই মানে দুদক নেই; ফলে সকল প্রকার দুর্নীতি দমনের কাজ স্থবির হয়ে গেছে। কারণ, অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুসন্ধান, মামলা, তদন্ত ও চার্জশিট অনুমোদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি প্রয়োজন। এমনকি ক্রোক, ফ্রিজ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাসহ যেকোনো জরুরি সিদ্ধান্ত কমিশন ছাড়া সম্ভব নয়। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিটি পদক্ষেপেই কমিশনের অনুমোদন দরকার হয়।দুদকের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম

রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বা সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সার্চ কমিটি গঠন করে থাকে। সার্চ কমিটির কাজ হলো রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগের ক্ষেত্রে সহায়তা করা। কমিটি এসব পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিদের একটি পদের বিপরীতে দুজনের নাম প্রস্তাব করে তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে এবং রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে একজনকে নিয়োগ দেবেন।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে ‘জুলাই সনদে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই সনদের পাশাপাশি দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব প্রস্তাবে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে লিখিত সমর্থন জানিয়েছে, সেগুলোর আলোকে অধ্যাদেশটি দ্রুত সংশোধন করে অবিলম্বে সংসদে আইন হিসেবে অনুমোদনের দাবি জানাচ্ছি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ‘স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের সুপারিশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে একমত হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত পর্যায়ে এই বিধানটি উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করে টিআইবি।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুদকে কমিশন নেই মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে অচল করে রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, দুর্নীতি দমনের যে কথা বলা হয়, তা আসলে আন্তরিক নয়। কমিশন নেই মানে দুদক নেই; ফলে সকল প্রকার দুর্নীতি দমনের কাজ স্থবির হয়ে গেছে। কারণ, অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুসন্ধান, মামলা, তদন্ত ও চার্জশিট অনুমোদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি প্রয়োজন। এমনকি ক্রোক, ফ্রিজ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাসহ যেকোনো জরুরি সিদ্ধান্ত কমিশন ছাড়া সম্ভব নয়। তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিটি পদক্ষেপেই কমিশনের অনুমোদন দরকার হয়।

দুদক অধ্যাদেশ বাতিল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেসব অধ্যাদেশ দিয়ে দুদক আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি ও দেওয়ানি কার্যবিধির মতো বিদ্যমান আইনের বিধানাবলি সংশোধন করা হয়েছে, সেসব অধ্যাদেশের কার্যকরিতা লুপ্ত হয়ে গেলেও পূর্ববর্তী বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হবে না। বরং নতুন আইন দিয়ে পরিবর্তন না করা পর্যন্ত সংশোধিত বিধানাবলি বলবৎ থাকবে। সুতরাং অন্তর্বর্তী সরকারের করা কোনো বিধি বা সংশোধনের কার্যকরিতা বিলোপের প্রশ্ন নেই। এখন দেখার বিষয় সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেয়। 

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট