শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২

আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে অংশীজনদের করণীয়

আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে অংশীজনদের করণীয়

সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কার্যকারিতা এবং মানব মর্যাদা রক্ষার জন্য আইনের শাসন ও সুশাসনের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এই নীতিগুলো সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তব প্রয়োগে তা সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার এবং বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে, বাংলাদেশ কীভাবে কার্যকরভাবে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ধারণাগত স্পষ্টতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও তুলনামূলক অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আইনের শাসন বলতে এমন একটি ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং স্বাধীনভাবে বিচার করা হয়। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, রাষ্ট্রসহ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

এই ধারণার ভিত্তি মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR )-এ নিহিত, যেখানে আইনের সামনে সমতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। একইভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এ ন্যায্য বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনগত সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, সুশাসন একটি বিস্তৃত ধারণা, যা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বিশ্বব্যাংক-এর মতে, সুশাসনের মূল উপাদান হলো অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতা। এছাড়াও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR) অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তাও সুশাসনের অংশ।

ফলে, আইনের শাসন যেখানে মূলত আইনি কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেয়, সেখানে সুশাসন, রাজনৈতিক ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সব দিককে অন্তর্ভুক্ত করে। আইনের শাসন ও সুশাসন একটি বহুমাত্রিক ধারণা, যা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শাসন কাঠামোতে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-এর মতে, সুশাসনের মূল উপাদান হলো অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়সঙ্গত আচরণ ও আইনের শাসন। এই উপাদানগুলো নির্দেশ করে যে সুশাসন কেবল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ নয় বরং জনগণের অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সেবা প্রদান ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (WJP) আইনের শাসনকে পরিমাপ করে বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে, যেমন সরকারের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রক কার্যকারিতা এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা।

এই কাঠামো দেখায় যে আইনের শাসন কেবল আইন থাকা নয়, বরং তার কার্যকর প্রয়োগ, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে, বিশ্বব্যাংক তাদের বিশ্বব্যাপী গভর্নেন্স ইন্ডিকেটর (WGI)-এর মাধ্যমে সুশাসনের ছয়টি প্রধান মাত্রা চিহ্নিত করেছে, ভয়েস ও অ্যাকাউন্টেবিলিটি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকারের কার্যকারিতা, নিয়ন্ত্রক মান, আইনের শাসন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। এসব সূচক নির্দেশ করে যে সুশাসন রাজনৈতিক পরিবেশ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানগত শক্তির সমন্বয়ের ফল।

ইউরোপীয় দেশসমূহে আইনের শাসন ও সুশাসন

ইউরোপীয় দেশসমূহে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃঢ় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফলাফল, যা শক্তিশালী আইনগত কাঠামো, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

জার্মানি একটি শক্তিশালী নিয়ম-ভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে আইন সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে কাজ করে। এখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোর আইনি নিয়ম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামো নিশ্চিত করে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়।

নেদারল্যান্ডস একটি কনসেনসাস-ভিত্তিক বা ঐকমত্যের শাসন মডেল অনুসরণ করে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ করা হয়, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।

সুইডেন এবং অন্যান্য নর্ডিক দেশসমূহ যেমন নরওয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং সামাজিক বিশ্বাস-ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা-এর জন্য পরিচিত। এই দেশগুলোয় উন্মুক্ত সরকার ব্যবস্থা কার্যকর, যেখানে নাগরিকরা সহজেই সরকারি তথ্য পেতে পারে এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে।

বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কার্যকর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক আস্থা অর্জনের ওপর সমান গুরুত্ব প্রদান করা অপরিহার্য।

ফিনল্যান্ড, বিশেষভাবে শক্তিশালী দুর্নীতি দমন ভিত্তিক মডেল এবং আমলাতান্ত্রিক পেশাদারিত্ব-এর জন্য পরিচিত। এখানে যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা এবং ন্যূনতম রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করে। ডেনমার্কে গুণমান এবং কল্যাণভিত্তিক সরকার নিশ্চিত করে যাতে করে রাষ্ট্রীয় সেবা নাগরিকদের কাছে সমানভাবে পৌঁছে যায়, যা সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশকিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা, যেখানে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রভাব, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়েছে।

দুর্নীতি আরেকটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এখনো বিদ্যমান। এটি জনআস্থা নষ্ট করার পাশাপাশি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারও সীমিত।

মামলার জট, দীর্ঘসূত্রিতা এবং ব্যয়বহুল আইনি প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে কঠিন করে তোলে, যা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এর ন্যায্য বিচারের নীতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

একইসঙ্গে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কিত কিছু উদ্বেগ বিদ্যমান, যা মৌলিক অধিকারের সুরক্ষায় ঘাটতি নির্দেশ করে। এছাড়া, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সুশাসনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে দুর্বল করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানে বৈষম্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR)-এর পূর্ণ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক অভিজ্ঞতা নেওয়া যায়। সুইজারল্যান্ডে বিকেন্দ্রীকরণ এবং সরাসরি গণতন্ত্র নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রশাসন আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়।

অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর কঠোর দুর্নীতি দমন এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে একটি কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। শক্তিশালী আইনি প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা জনআস্থা বৃদ্ধি করেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, যেমন সুইডেন এবং নরওয়ে, সুশাসনের সঙ্গে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েছে। সমতা, স্বচ্ছতা এবং উন্নত সামাজিক সেবা এই দেশগুলোর শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে।

ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রক প্রয়োগ এবং মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এসব দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট আইনের শাসন পরিমাপে সরকারি জবাবদিহিতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সরকার এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারকে মূল সূচক হিসেবে বিবেচনা করে।

এই সূচকগুলো নির্দেশ করে যে, আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, সামাজিক আস্থা সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত উপাদান। যেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্র এবং তার প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখে, সেখানে আইন মানার প্রবণতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃদ্ধি পায়। অতএব, বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি, কার্যকর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক আস্থা অর্জনের ওপর সমান গুরুত্ব প্রদান করা অপরিহার্য।

সুশাসনের আলোচনায় সমতার পাশাপাশি ন্যায়সংগত আচরণ অপরিহার্য নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। সমতা যেখানে সবার জন্য একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করে, সেখানে ন্যায়সংগত আচরণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য এবং কাঠামোগত বৈষম্যকে বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য ফলাফল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR), আইনের সামনে সমতা এবং বৈষম্যহীনতার নীতি প্রতিষ্ঠা করলেও, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, বাস্তবিক অর্থে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ফলাফলভিত্তিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়।

একইভাবে, বিশ্বব্যাংক তার উন্নয়ন বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে, কেবল আনুষ্ঠানিক সমতা নয়, বরং সুযোগের ন্যায্য বণ্টন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য হ্রাস টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের পূর্বশর্ত। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ধারণাও এই ন্যায়সংগত ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যেখানে কাউকে পেছনে না ফেলার নীতির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে জাতিকেন্দ্রিকতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিকেন্দ্রিকতা এমন একটি প্রবণতা, যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মূল্যবোধ ও মানদণ্ডকে সর্বজনীন ধরে নিয়ে আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয়, যার ফলে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়।

এর বিপরীতে, সাংস্কৃতিক মোজাইক এবং মেল্টিং পট (ভিন্ন সংস্কৃতিগুলো মিশে একাকার হয়ে একটি সাধারণ সংস্কৃতি তৈরি করা) ধারণাসমূহ অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নির্দেশ করে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে সমন্বিতভাবে সহাবস্থানের সুযোগ তৈরি করা হয়।

...দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR)-এর বৈষম্যহীনতার নীতি এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR)-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক অধিকারের ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

একইভাবে, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বিশ্বব্যাংক-এর শাসন কাঠামো ন্যায়সংগত এবং বৈচিত্র্য-সংবেদনশীল নীতিনির্ধারণকে কার্যকর সুশাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। অতএব, বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে জাতিকেন্দ্রিক প্রবণতা পরিহার করে সংস্কৃতি মোজাইক ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি, যেখানে সব গোষ্ঠীর পরিচয়, অধিকার এবং অংশগ্রহণ সমানভাবে স্বীকৃত হয়।

উন্নয়নের পথ

বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আদালত নির্বাহী প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যকারিতা ও স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করতে হবে। আইনি সহায়তা সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চতুর্থত, মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

পঞ্চমত, অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দ্বারা সমর্থিত।

অধিকন্তু, সুইজারল্যান্ডের মতো বিকেন্দ্রীকরণ ও নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা হলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা উন্নত হবে। দক্ষিণ কোরিয়া দেখায় যে, গণতান্ত্রিক সংহতি কীভাবে সুশাসন উন্নত করতে পারে। দেশটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করতে সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে, সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশন (ই-গভর্ন্যান্স) সম্প্রসারণ করেছে এবং তথ্যপ্রাপ্তির উন্মুক্ততা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছতা-সংক্রান্ত আইন শক্তিশালী করেছে।

পাশাপাশি, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জাপান, শক্তিশালী আইনগত প্রতিষ্ঠান এবং পেশাদার আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে আইনের শাসন নিশ্চিত করেছে। তাদের শাসনব্যবস্থা আইনের পূর্বানুমান যোগ্যতা, নিম্নমাত্রার দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা একটি শক্তিশালী অনুশাসনমুখী প্রশাসনিক সংস্কৃতির দ্বারা সমর্থিত।

মালয়েশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে শাসন সংস্কারের দিকে অগ্রসর হয়েছে, যেখানে দুর্নীতি দমন কাঠামোকে শক্তিশালী করা, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বৃদ্ধি-বিশেষত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

বাংলাদেশে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আইনগত ও নীতিগত কাঠামোর অভাব নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়ন। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (UDHR ), নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR), অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICESCR) একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে, আর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দিকনির্দেশনা ও মূল্যায়নের কাঠামো প্রদান করে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ব্যবধান দূর করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা নির্দেশ করে যে সুশাসন কোনো একক নীতির ফল নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার সমন্বয়ে গঠিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

তাই বাংলাদেশে আইনের শাসন শক্তিশালী করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন এবং জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন একসাথে বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট