সংগৃহীত
আমি মূলত সিনেমার মধ্যে বাস করি। সারাটা দিন যা কিছু ঘটে, সেটা ভালো কিংবা মন্দ, সবকিছুর ভেতর থেকেই আমি সিনেমার এসেন্স খুঁজে বেড়াই। হয়তো কারওয়ান বাজারের জ্যামে আমার হাত থেকে দামি মোবাইল ফোনটি টান দিয়ে নিয়ে গেছে ছিনতাইকারী, আমি তার পেছনে ছুটি, ধরতে পারি না।
ছিনতাইকারী মিলিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। কিছু সময় মন খারাপ করে থাকার পর আমি চিন্তা করি ছিনতাইকারী ছেলেটির ভেতরকার গল্পের কথা। এর আগে কী ঘটেছে, পরে কী ঘটবে, সেটা আমার কাজে লাগবে কোনো গল্প কিংবা সিনেমায়। এমনকি যেদিন আমার মা মারা গেলেন, সেদিন তীব্র মন খারাপের পর ভেবেছি, মানুষের মৃত্যুর পরে কী ঘটে? মৃত মানুষ কী চিন্তা করতে পারে?
যতই দেখছি বাংলা সিনেমা, ততই বিস্মিত হচ্ছি দিনকে দিন। নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা বিস্ময়কর সব আইডিয়া নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সিনেমার ওপর। তারা এর নারী-নক্ষত্র খাবলে দেখতে চায়। সাম্প্রতিক ঈদে পাঁচটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। তার মধ্য থেকে দুটো সিনেমা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই দুটো সিনেমার ওপরে খানিকটা আলাপ আলোচনা করবো।
বনলতা এক্সপ্রেস (২০২৬)
বনলতা এক্সপ্রেস ২০২৬ সালের একটি বাংলাদেশি অ্যাডভেঞ্চার কমেডি জনরা (Genre)-এর শতভাগ দেশি সিনেমা। তানিম নূর পরিচালিত ও প্রযোজিত। প্রযোজনা করেছে বুড়িগঙ্গা টকিজ ও সহ-প্রযোজনা করেছে হইচই স্টুডিওস এবং সার্বিক সহযোগিতা করেছে ডোপ প্রোডাকশন্স। এটির মূল গল্প নেওয়া হয়েছে হুমায়ূন আহমেদ রচিত উপন্যাস কিছুক্ষণ থেকে। ২০২৬ সালের ঈদ-উল-ফিতরে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে (মূলত মাল্টিপ্লেক্সে) সিনেমাটি মুক্তি পায়।
এক কথায় বলতে গেলে, বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমায় আমরা দেখতে পাবো, এখানে গন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ না, পথটাই যেন হয়ে ওঠে মূল গল্প। ট্রেনে চেপে বসা মানুষগুলো ভ্রমণের মধ্য দিয়ে খোলস বদলে অন্য মানুষে পরিণত হয়।
হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের হিউমার নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। সুতরাং তার গল্পে ব্যাপক বিনোদন থাকবে এটাই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এখন ২০২৬ সাল, এখনকার দর্শকদের রুচি ভীষণ রকম বদলে গেছে।
তারা কিন্তু এখন আর বহুব্রীহি নাটকের মতো হিউমারাস স্টোরি টেলিং দেখতে চাইছে না। তাদের অন্য কিছু প্রয়োজন, যেটার অনেকটাই অভাব পূরণ করেছে বনলতা এক্সপ্রেস। ট্রেনে চেপে বসুন এবং নিজেকে সমর্পণ করুন এই অভিযাত্রায়।
‘ইনটু দ্য ওয়াইল্ড (২০০৭)’, ‘লাইফ অফ পাই (২০১২)’, ‘দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরি (২০০৪)’, ‘জিন্দগি না মিলেগি দোবারা (২০১১)’ প্রত্যেকটি ভীষণ রকম সফল এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিনেমা। এইসব চলচ্চিত্রের সঙ্গে বনলতা এক্সপ্রেস-এর মিল হচ্ছে সবগুলোই ভ্রমণ বিষয়ক। কিন্তু বনলতা এক্সপ্রেস ইচ্ছে করেই যেন এইসব সিনেমার থেকে ভীষণ রকম আলাদা।
স্টোরি টেলিং, ক্যারেক্টার বিল্ড আপ, সিনেমাটিক মোমেন্ট সবকিছুই নির্মাণ হয়েছে খুব সূক্ষ্ম মেধাবী চিত্রনাট্যকার ,পরিচালক এবং গোটা টিমের সৎ চেষ্টা ও উদ্যমে। একটা ট্রেন, তার ভেতরে সরু প্যাসেজ, কয়েকটা কামরা এইতো সর্বসাকুল্যে স্পেস। তার মধ্যে দুই ঘণ্টা প্লাস একটা সিনেমাকে ডিল করা খুব সহজ কাজ নয়।
কয়েকটি মাত্র আউটডোর সিকোয়েন্স বাদ দিলে গোটা সময়টাই এই ছোট্ট পরিসরের মধ্যে গল্প এগিয়ে চলে, কিন্তু কখনো সেটা আমাদের একঘেয়ে করে তোলে না, বরং কৌতূহল আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতির ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণের যাত্রা শেষ হয়। আমরা ট্রেনের ভেতরে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক (১৯৬৬)’ সিনেমা দেখেছিলাম, সেটাও ছিল গল্প, ক্যারেক্টারাইজেশন সবকিছু মিলে ওয়েল ম্যানেজড। তবে সেটা নির্মাণের সময়কাল আর বনলতা এক্সপ্রেস নির্মাণের সময়কাল এক নয়। সে জায়গা থেকে টেকনিক্যালি অনেকটা অ্যাডভান্টেজ পেয়েছে বনলতা এক্সপ্রেস।
আমরা ভয়েস ওভারের যে কমন প্যাটার্ন দেখি, সেটা থেকে এখানে নুহাশ হুমায়ূনের দেপয়া ভয়েস ওভারের বাচনভঙ্গি ছিল একেবারেই ভিন্ন। বালখিল্য ভঙ্গিতে অচেনা গল্প, চেনা ভাবে বলে যাচ্ছে কামরায় থাকা অনুপস্থিত অন্য কেউ। বর্ণনাকারীর শেষ পরিণতি যে এখানে এসে দাঁড়াবে, তা কে জানতো?
এবার আসি অভিনয় প্রসঙ্গে। একঝাঁক গুণী এবং মেধাবী অভিনয়শিল্পী এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকটি চরিত্রের জন্য যেন ঠিক লোকটি বেছে নিয়েছেন পরিচালক। মূল উপন্যাসে যদিও এটা ছিল চিত্রার নিজস্ব ভ্রমণ। কিন্তু সিনেমায় পরিচালক চিত্রার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সহযাত্রীদেরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন।
প্রত্যেকটি চরিত্রেই ভীষণ রকম মনোযোগ দিয়েছে বনলতা টিম। স্বভাব সুলভভাবে মোশাররফ করিম তার সঙ্গে যায় এমন একটি চরিত্র পেয়েছিলেন এবং তিনি এর যথার্থ ব্যবহার করে ছেড়েছেন। মোশাররফ করিম যে একজন জাত অভিনেতা, এখানে সেটি তিনি পুনর্বার প্রকাশ করেছেন। চঞ্চল চৌধুরী ও দারুণ করেছেন, কিন্তু তার খুব বেশিকিছু করার ছিল না।
এক কথায় বলতে গেলে, বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমায় আমরা দেখতে পাবো, এখানে গন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ না, পথটাই যেন হয়ে ওঠে মূল গল্প। ট্রেনে চেপে বসা মানুষগুলো ভ্রমণের মধ্য দিয়ে খোলস বদলে অন্য মানুষে পরিণত হয়।
উপন্যাস পড়ার সময় আমাদের মনে হয়েছিল, মন্ত্রীর বয়স খানিকটা বেশি হবে। হয়তো স্টার কাস্টিং করার জন্য নির্মাতা চঞ্চল চৌধুরীকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এই চরিত্রে যদি ফজলুর রহমান বাবু, আজাদ আবুল কালাম, শহীদুজ্জামান সেলিমকে নেওয়া হতো, হয়তো তারা ভিন্ন কোনো উপস্থাপন দেখাতে পারতেন। চিত্রা চরিত্রে সাবিলা নূর যথেষ্টই সাবলীল অভিনয় করেছেন।
এছাড়াও শ্যামল মাওলা, জাকিয়া বারী মম, আজমেরী হক বাঁধন, ইন্তেখাব দিনার এবং অন্যান্যরা অভিনয় বেশ চমকপ্রদ স্বাক্ষর রেখেছেন। বাচ্চা মেয়েটির অভিনয় ছিল যেন এই সিনেমার প্রাণ। পাকা বাচ্চা বলতে যা কিছু বুঝি, সেটি এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। বাচ্চাটির জন্য হাততালি! এতটুকু বয়সে কি সুন্দর সাবলীল অভিনয়।
শামীমা নাজনীনের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়, তিনি ডাক্তারের মা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এমনিতেই তিনি যথেষ্ট দক্ষ অভিনেতা, কিন্তু এখানে যেন সুযোগ পেয়ে নিজেকে নিজেই ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। বাংলার লেডি কমেডিয়ান শামীমা নাজনীনকে ধন্যবাদ।
তবে তিনটি চরিত্র আমার মন সবচেয়ে বেশি কেড়েছে, তারা যদিও সাইজে ছোট ছিল (উপস্থিতির দিক থেকে) লুক ওয়াইজ এবং ক্যারেক্টারে ডিগনিটি হান্ড্রেড পার্সেন্ট ক্যারি করে গেছে এই তিনজন। প্রথমজন হলেন জাহাঙ্গীর আলম, যিনি একজন ছিঁচকে চোর কিংবা ছিনতাইকারীর ভূমিকা অবতীর্ণ হন সিনেমায়।
পরবর্তী জন মন্ত্রীর পিএস চরিত্রে শঙ্খ। যদিও তিনি কোনোভাবেই প্রফেশনাল অভিনেতা নন, তবুও দেখতে মনে হয়েছে এই লোকটি ছাড়া এই চরিত্র আর কেউ করতে পারতো না। আরেকটি চরিত্র ভীষণ রকম ইম্প্যাক্টফুল। মন্ত্রীর কক্ষের চাপরাশি বা বেয়ারা। থিয়েটার অভিনেতা মনিরুল ইসলাম রুবেল, সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কিছু এক্সপ্রেশনের কাজ করেছেন যেগুলো দেখে আমার ভীষণ রকম জোরালো ক্যারেক্টারাইজেশন মনে হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে অভিনয় ডিপার্টমেন্ট সাকসেসফুল।
ডিরেকশন, রাইটিং, এডিটিং এবং অন্যান্য কারিগরি দিক সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। সবসময় বলা হয়ে থাকে, একটি সিনেমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় তার রাইটিং টেবিলে। আয়মান আসিব স্বাধীন এবং সামিউল ভূঁইয়া চিত্রনাট্যকার হিসেবে বেশ আধুনিকতার পরিচয় দিয়েছে সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতেই পারে। তানিম নূরের উৎসব সিনেমাটা দেখেছিলাম, বেশ হালকা মেজাজের উপভোগ্য সিনেমা। বনলতা এক্সপ্রেস দেখে মনে হলো, এটি তার সিগনেচার প্যাটার্ন।
অনেক বেশি আঁতলামি না করে, নরম করে সিনেমাটা বানান তিনি, দর্শক যেন খুব আরাম করে তা গলাধঃকরণ করতে পারেন এবং হজমেও যেন কোনো অসুবিধা না হয়। হল থেকে বের হওয়া দর্শকেদের দেখে মনে হয়েছে তারা যেন এ ধরনের সিনেমাই দেখতে চায়, সমস্যা পীড়িত রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটুখানি প্রশান্তির বাতাস বনলতা এক্সপ্রেস।
শিল্পনির্দেশনা খুবই মানসম্মত। টেকনিক্যাল পার্সন হিসেবে হয়তোবা টুকটাক ভুল বের করা যেতে পারে, কিন্তু একজন দর্শকের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে একে কোনোক্রমে ট্রেনের বগি ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশ ছিল না। শব্দ এবং সংগীত শ্রুতিমধুর না বলে, যথোপযুক্ত বলাটা বোধহয় ঠিক।
বরকত হোসেন পলাশ খুবই অভিজ্ঞ একজন সিনেমাটোগ্রাফার। আগে পরে তার অনেক কাজ আমি দেখেছি, তার কাজে এক ধরনের সিম্পলিসিটি লক্ষ্য করা যায়। তবে এই কাজটাতে তার খুব বেশি চ্যালেঞ্জ ছিল স্পেস ম্যানেজমেন্ট। সেটা তিনি এতটাই সফলভাবে অতিক্রম করেছেন, কখনো আমাদের মনে হয়নি আমরা সিনেমা দেখছি, মনে হচ্ছিল আমরা ট্রেনের যাত্রী। যেন অলক্ষ্যে সবার ওপরে নজর রাখছি।
সিনেমা সমালোচনা লিখতে গেলে সিনেমার কিছু দুর্বল অংশের কথা উল্লেখ করতে হয়, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু আমি ভিন্ন ধারণা পোষণ করি। সিনেমা কিংবা টেলিভিশন ফিকশন হলো আর্ট ফর্ম। এটা কোনো জ্যামিতি কিংবা ত্রিকোণমিতি নয় যে এখানে ভুল থাকবে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তোবা সিনেমা নির্মাতার সঙ্গে আমি ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, সেরকম কয়েকটা পয়েন্ট তুলে ধরবো।
যেমন প্রথমেই আমার মনে হয়েছে মেকাপের কথা। শরিফুল রাজ, মোশাররফ করিম এদের দুজনার মেকআপ খুবই দৃষ্টিকটু লেগেছে। এছাড়া অন্যদের মেকআপ ছিল বেশ রিয়েলিস্টিক। এখানে বেশ কয়েকটি গান সংযোজন করা হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল, সিনেমাটাতে গান তো দূরের কথা, কোনোরকম কোনো সংগীতের ব্যবহার না করা হলেও কিছু আসতো যেত না। বরং অন্য মাত্রা পেত সিনেমাটি।
সবাইকে মহৎ বানানোর যে প্রচেষ্টা করেছেন পরিচালক, এটা হয়তো মূল উপন্যাসে ছিল না। সবাই যেন যবনিকা পতনের পূর্ব মুহূর্তে বলতে চেয়েছেন, আমি ভালো, আমাকে দেখো, আমাকে খারাপ ভেবো না।
জাকিয়া বারী মম’র যখন বাচ্চা পৃথিবীর আলো দেখেন এবং পিতা শ্যামল মওলা যখন বাচ্চার কানে আজান দেন, হতে পারতো এটি সিনেমার শেষ মুহূর্ত। পরবর্তী অংশে যেসব নাটকীয়তা দেখানো হয়েছে, এটি হয়তোবা অন্যভাবেও ডিল করতে পারতেন পরিচালক।
আরও একটি ছোট্ট অবজারভেশন, ট্রেনটির জানালা থেকে বাইরের দৃশ্যমান জগৎ খুব একটা দেখা যায়নি। আমার সবসময় ট্রেনের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে খুব ভালো লাগে। হয়তোবা এই দাবিটি সেজন্যই করা। এরকম দু-একটা জিনিস আমার সঙ্গে হয়তো মেলেনি, কিন্তু বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমাটি আমাদের সিনেমা জগতের রিকন্ডিশন ইঞ্জিন, এ কথাটি খুব জোরালোভাবেই বলা যেতে পারে। এই ধরনের সিনেমা আরও বেশি বেশি করে প্রত্যাশা করি, নতুন এবং পুরোনো নির্মাতাদের কাছ থেকে।
প্রেশার কুকার (২০২৬)
রায়হান রাফি পরিচালিত ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা প্রেশার কুকার। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এবং কানন ফিল্মসের ব্যানারে প্রযোজনা করেছে ফরিদুর রেজা সাগর ও রায়হান রাফি। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন শবনম বুবলী, নাজিফা তুষি, ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, মিশা সওদাগর, গাজী রাকায়েত, রিজভী রিজু, মারিয়া শান্ত, স্নিগ্ধা চৌধুরী এবং আরও অনেকে। এটি মূলত নারীকেন্দ্রিক সিনেমা। সিনেমাটি প্রয়াত পরিচালক তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
“We are all connected… the problem is we are not aware of it.”
আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত, কিন্তু সেই সংযোগটা আমরা বুঝতে পারি না।
—আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু
হাইপার লিংক ধারার সিনেমার অন্যতম সফল প্রয়োগ করেছেন পরিচালক ইনারিতু। এবার বাংলা সিনেমাতেও সেই একই ধারার প্রয়োগ আমরা দেখতে পেলাম। হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে এর আগেও বেশ কয়েকটি হাইপার লিংক ধারার মুভি বাংলাদেশে প্রদর্শিত হয়েছে, কিন্তু সেটা হয়তো সেভাবে আলোচনা উঠে আসেনি।
পরিচালক রায়হান রাফি তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ভীষণ দর্শক প্রিয়। স্বভাবতই তার উচিত ছিল তুফান (২০২৪), তাণ্ডব (২০২৫)-এ জাতীয় শিওর শট ধারার সিনেমাতে নিজেকে যুক্ত রাখা। কিন্তু সে সেই পথে তিনি হাঁটেননি, বরং ভীষণ রকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছেন এক অন্যরূপে।
নারী বিদ্বেষ যার গায়ে একটা ট্যাগের মতো লেগে গেছে, তিনি এবার নির্মাণ করলেন নারীদের অন্তর্গত সৌন্দর্য নিয়ে সিনেমা। সফলতা কিংবা ব্যর্থতা সময় বিচার করবে। কিন্তু আমি তার নির্মিত প্রেশার কুকার সিনেমাটির ভেতরের মাংস কতটা সেদ্ধ হলো তা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করব।
ডার্ক থ্রিলার জনরার সিনেমা প্রেশার কুকার। রান টাইম প্রায় তিন ঘণ্টা। কালার প্যালেটে ব্যবহার করেছেন ভিন্টেজ, বার্ন সিয়েনা টোন। পটভূমি ঢাকা, আবদ্ধ প্রেশার কুকারের মতোই যেন জোর করে সেদ্ধ করা হচ্ছে এ শহরের প্রতিটি প্রাণকে। মূল চরিত্র একজন নারী, যিনি হয়তোবা নোয়াখালী কিংবা এরকম কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।
কাজ করেন একটি বিউটি পার্লারে, প্রকারান্তরে তাকে ম্যাসেজ পার্লারও বলা যেতে পারে। এটি একটি ১৮+ সিনেমা, বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে বলেই, হয়তোবা আরও কিছু বাস্তব চিত্র সংযোজন করতে পারেননি পরিচালক। এটা একটা ব্রেভ এটেম্পট নিঃসন্দেহে।
আরও একটা ভালো দিক হলো, সিনেমাতে কোনো মারামারি, আইটেম সং, অপ্রয়োজনীয় ড্রামা না থাকলেও সিনেমাটি দর্শককে হলের সিটে বসে থাকতে বাধ্য করে।
নারী বিদ্বেষ যার গায়ে একটা ট্যাগের মতো লেগে গেছে, তিনি এবার নির্মাণ করলেন নারীদের অন্তর্গত সৌন্দর্য নিয়ে সিনেমা। সফলতা কিংবা ব্যর্থতা সময় বিচার করবে।
চিত্রনাট্যকার সিয়াম শামস তুষ্ট, মেহেদী হাসান মুন এবং রায়হান রাফি। আমি যতটুকু জানি এটি মূলত রায়হান রাফির গল্প। পরবর্তীকালে বাকি দুইজন কো-রাইটার তাকে গল্পের গভীরতায় প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে। চিত্রনাট্য বেশ অ্যানালিটিক্যাল।
হয়তো চিত্রনাট্যকাররা শহরের নানান শ্রেণিপেশার নারীদের জীবনের পরিণতি এবং প্রাপ্তি তুলে ধরতে গিয়ে বিবিধ নারী চরিত্রকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু আমি এবং আমরা দেখতে পেয়েছি, শুধুমাত্র রেশমা এবং পাখিকে। রেশমার বদলে যাওয়া পাখিরূপ ধরতেই যেন প্রেশার কুকার সিনেমার পুরোটা সময় কেটে গেছে। অনুষঙ্গ হিসেবে অন্যান্য নারী চরিত্রদের আগমন এবং প্রস্থান গল্পে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি।
রেশমার সন্তান মাদ্রাসা পড়ুয়া বালকটি দেখে মনে হয়েছে যেন, পরিচালক নিজেই দাঁড়িয়ে আছেন প্রান্তর বিস্তৃত সরিষা ক্ষেতের মাঝে। মাদ্রাসা পড়ুয়া সন্তানটি অন্য এক মেটাফোরের জন্ম দেয়। এরকম অসংখ্য কর্মজীবী মা আছেন, যারা তাদের সন্তানকে প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে রেখে এসে জীবন যুদ্ধে লিপ্ত।
শহরের সংঘাতময় কম্পোজিশন আমাদের যে রকম বিব্রত করে, ঠিক ততটাই প্রশান্তি পাই যখন ক্যামেরা এবং দর্শক প্রবেশ করে পাহাড়ি পথে। সিনেমাটোগ্রাফির অদ্ভুত ব্যালেন্স এখানে দৃশ্যমান। সিনেমাটিকে ওয়াও! বলতে না পারলেও, সন্তুষ্টির হাততালি দিতে কোথাও কোনো বাধা থাকে না একজন দর্শক হিসেবে।
যারা ফর্মুলা সিনেমা ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই সিনেমাটি নয়। প্রেশার কুকার-এ প্রবেশ করলে আপনাকে চাপে তাপে দগ্ধ হতে হবে, একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
এবার প্রেশার কুকারের সিটির জন্য অপেক্ষারত ভেতরকার চরিত্রদের সম্পর্কে দু-চার কথা বলা যাক। রেশমা এবং পাখি, যারা এখনো সিনেমাটি দেখেননি তারা হয়তো বুঝতে পারবেন না, আমি মূলত একটি নারী চরিত্রের কথাই বলছি। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক যেভাবে চরিত্রটি এঁকেছেন, হয়তো নাজিফা সেটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তার অভিনয় দক্ষতা দ্বারা। সাবলীলভাবে বলতে পারা নোয়াখালীর ভাষা এতে আরও রং চড়িয়েছে।
এরপরে যার কথা বলতে হয়, তিনি হলেন ফজলুর রহমান বাবু। অনেক পরে সিনেমায় এন্ট্রি নিলেও তিনি যখন কোনো দৃশ্যে অভিনয় করেন, তখন যেন আর কেউ তার সামনে দাঁড়াতে না পারে এর একটা অদ্ভুত কৌশল তিনি বহু আগে থেকেই জানেন এবং এই সিনেমায় তার সফল প্রয়োগ তিনি করেছেন। তার ক্ষেত্রে একটি কথা বলতেই হয়, তিনি শরীর দিয়ে অভিনয় করেন না অভিনয়টা করেন আত্মা দিয়ে।
শবনম বুবলী, বাংলাদেশের অত্যন্ত গুণী অভিনয় শিল্পী এবং নায়িকা। সিনেমায় তিনি যে চরিত্রটি পেয়েছেন, সেখানে তার যে খুব বেশি কিছু করার ছিল সেটা বলা যাবে না। তবে তার যতটুকু কাজ ছিল, সেটা তিনি খুব দারুণভাবেই পুল অফ করেছেন। আগাগোড়া এই চরিত্রটি দেখে আমার মনে হচ্ছিল, ভীষণ রকম চতুর একজন মহিলা। যেটা বুবলী অসামান্য দক্ষতায় সম্পন্ন করেছেন।
রিজভী রিজু তথাগত অভিনেতা নন। এর আগে হয়তো হাওয়া সিনেমায় ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, কিন্তু তার সরল চেহারা এই চরিত্রটির জন্য এতটাই উপযুক্ত ছিল যেটা পর্দায় আমাদের ভীষণ রকম আবেগ তাড়িত করেছে। রিজুর সততা পর্দা প্রত্যাখ্যান করেনি।
চঞ্চল চৌধুরী একটা ক্যামিও চরিত্রে ছিলেন। যে কয়েকবার তিনি পর্দায় এসেছেন, তার অভিনয় দক্ষতার ঝলক আমাদের কখনো হাসিয়েছে, কখনোবা চিন্তিত করেছে। এছাড়াও শহীদুজ্জামান সেলিমের অল্প খানিকটা অভিনয় বেশ বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। অন্যান্য অভিনয় শিল্পীরাও ছিলেন সাবলীল এবং এপ্রোপিয়েট।
পিঙ্কভিলা পার্লারের মালিক শেউতি এবং রেশমার বন্ধু মেয়েটি অত্যন্ত মানানসই ভাবে অভিনয় করেছেন। তাদের দেখে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, উনারা সত্যি সত্যি ওই পার্লারে কাজ করে। তাদের দেহভঙ্গি এবং স্পষ্ট কথাবার্তা চরিত্রগুলো ম্যাচিউর করেছে।
চিত্রগ্রাহক জোয়াহের মুসাব্বির-এর ক্যামেরার কাজ গল্পটিকে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে গেছে। ঢাকা শহরের যে প্যাঁচানো কম্পোজিশন তিনি দেখিয়েছেন, মাঝে মাঝে আমাদের মনে পড়ে গেছে ‘সিটি অফ গড (২০০২)’ সিনেমার চিত্রগ্রাহক চেসার কার্লনের কথা। অন্যান্য সব সিনেমার চেয়ে এই সিনেমার সাউন্ড ডিজাইন, আমার নজর কেড়েছে।
বিশেষ করে যখন রেশমা তার ভাইয়ের বাড়িতে কথাবার্তা বলেন তখন পেছন থেকে ভেসে আসা বাচ্চাটির ছোট ছোট কবিতা পড়া কিংবা কথা বলা একটা ভিন্ন আবহ সৃষ্টি করেছে। ধন্যবাদ রিপন নাথকে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং গানগুলো মানানসই। সম্পাদনা অন পয়েন্ট। জানিনা এগুলো পরিচালকের পরিকল্পনা, নাকি সিমিত রায় অন্তরের এডিটিং-এর কৌশল! সিনেমাটাকে একটা অন্য ফিল দিয়েছে সম্পাদনা। এছাড়া অন্যান্য টেকনিক্যাল টিমের কাজ আশাপ্রদ ছিল।
এবার কিছু মতভিন্নতা নিয়ে আলোচনা করা যাক। যদিও এগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। কেন যেন মনে হয়েছে সিনেমার গল্পটা আরও খানিকটা ছোট করলে গল্পটা আরও উপভোগ্য হতো। অনেকগুলো চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন পরিচালক, কিন্তু সবগুলো চরিত্র কি এতটা গুরুত্বপূর্ণ এই গল্পের পরিণতির জন্য?
যে মেয়েটি বাড়িতে বসে লাইভ ভিডিও করে, তার এবং ওই পরিবারটির উপস্থিতির কারণ আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। এরকম আরও অসংখ্য সাব প্লট এবং ক্যারেক্টার আছে যাদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে মনে দ্বিধা তৈরি হয়। হয়তো পরিচালকের অন্য কিছু পরিকল্পনা ছিল, যেটা দর্শক হিসেবে আমরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি।
বারংবার মনে হয়েছে এই গল্প থেকে অনেকগুলো চরিত্রকে বাদ দিলেও রেশমার পাখি হয়ে ওঠা এবং তার সংকটের এতটুকু কমতি হতো না। টেকনিক্যাল দিকের কথা যদি বলি, তাহলে আমি বলব প্রায় অনেকগুলো দৃশ্যে ফোকাস নিয়ে এক ধরনের ঝামেলা দেখা গেছে। হতে পারে আমার চোখের দোষ অথবা পরিচালকের!
এটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত সিনেমা, সুতরাং পাবলিসিটিতে খুব ফলাও করে বিষয়টি প্রচার করা উচিত ছিল। কেননা অনেক দর্শক তাদের বাবা-মা কিংবা সন্তান নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে বেশ বিব্রত হয়েছেন।
আমি নিজে বেশ কয়েকটি সিনেমা তৈরি করেছি। সুতরাং আমি জানি একটা সিনেমা তৈরি করা কতটা দুরূহ কাজ। সুতরাং টুকটাক ভুল তো থাকবেই। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে প্রেশার কুকার একটা নতুন ধরনের প্রেশার তৈরি করে আমাদের মনোজগতে। আমরা বারবার করে বলতে চাই, বাংলা ভাষায় বাংলা স্টাইলে সিনেমা তৈরি হোক। আমরা আর তামিল, তেলেগু, হিন্দি সিনেমার দ্বারস্থ হতে চাই না। আমাদের নিজস্ব সিনেমা ভাষা তৈরি হোক।
অনিমেষ আইচ : চলচ্চিত্র নির্মাতা
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট












