সংগৃহীত
কৃষি খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনার মতো সুবিধা কৃষকের কাছে সহজলভ্য করতে কৃষকদের কার্ডের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ৪ বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কৃষক কার্ড বিতরণ করবে সরকার। মৎস্যচাষি ও দুগ্ধ খামারিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন। এর মাধ্যমে কৃষকদের কাঠামোগত বঞ্চনার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে বিএনপি সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে তাদের ভাষ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। সুবিধার মধ্যে থাকছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি, সরকারি প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য ও রোগবালাই দমনে পরামর্শ।
এই ধরনের উদ্যোগের উদাহরণ পেতে দূরে যেতে হবে না। সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ভারত এই ধরনের কার্যক্রমকে এক অসামান্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। কিষাণ ক্রেডিট কার্ড এবং পরবর্তী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভারত কৃষি খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক সহায়তা কাঠামো তৈরি করেছে।
১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই ক্রেডিট কার্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের আওতায় আনা, যাতে তারা মহাজন বা অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার উপর নির্ভরশীল না থাকে। এর মাধ্যমে কৃষকরা ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরাসরি পেতে শুরু করে এবং ঋণ পরিশোধের সময়ও ফসলের চক্র অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। ফলে কৃষি অর্থায়নে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি যোজনা কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সরকার সরাসরি কৃষকদের ব্যাংক হিসাবে নগদ অর্থ প্রদান শুরু করে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমে যায় এবং কৃষক সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পায়। একইসাথে রায়তু (কৃষক) বন্ধু যোজনা-এর মতো আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো কৃষকদের মৌসুমি ইনপুট খরচ বহনে সহায়তা করে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও স্থিতিশীল করে। এই ধরনের সরাসরি নগদ সহায়তা কৃষকদের ঝুঁকি কমাতে এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর পাশাপাশি সয়েল হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে কৃষকদের জমির মাটির গুণগত মান সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদান করা হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে সার ব্যবহারের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়, যা একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, অন্যদিকে খরচ কমায় এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। অর্থাৎ, শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, তথ্যভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনাও এখানে সমান্তরালে গড়ে ওঠে।
এইসব কর্মসূচি একত্রে একটি সমন্বিত কৃষি সহায়তা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে ঋণ, নগদ সহায়তা, ভর্তুকি এবং তথ্য, সবগুলো উপাদান একসাথে কাজ করে। এর ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, এই তিনটি লক্ষ্য একসাথে অর্জনের একটি কার্যকর মডেল তৈরি হয়েছে। ভারতের এই অভিজ্ঞতা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম কৃষক সহায়তা ব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখন বাংলাদেশে সাফল্য পেতে হলে করণীয় ও বর্জনীয় কী কী? তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ১৪ এপ্রিল ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে জানানো হয়েছে। যা বেশ দ্রুত বলা যায়। স্পষ্ট যে, সরকার এই উদ্যোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখন কিছুটা বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
আসলে ‘কৃষক কার্ড’ অর্থাৎ ‘স্মার্ট কৃষক কার্ড’ উদ্যোগটি মূলত সব নিবন্ধিত কৃষকদের জন্যই তৈরি করা হচ্ছে। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো এর মাধ্যমে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। যদিও কার্ডটি নিবন্ধিত সব কৃষকের জন্য, তবে কার্ডের মাধ্যমে যেসব আর্থিক প্রণোদনা বা ভর্তুকি (যেমন সার, বীজ বা নগদ অর্থ) দেওয়া হবে, সেখানে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বড় মাপের জোতদার বা ধনী কৃষকরা কার্ড পেলেও সব ধরনের সরকারি ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা সচরাচর পাবেন না।
নতুন এই কার্ডের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে বর্গাচাষিদের নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে শুধু জমির মালিকরা সুবিধা পেতেন, কিন্তু এখন যারা প্রকৃতপক্ষে মাঠে কাজ করছেন (প্রান্তিক চাষি), তাদের নিবন্ধিত করে কার্ড দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। কৃষক কার্ড বা এই ধরনের কৃষি ভর্তুকি ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন।
মূলত এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষিতে কোনো বিপ্লব আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। এটি মূলত তথ্য হালনাগাদ করে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করার প্রয়াস।
প্রথমত, লিকেজ রোধ। আগে ভর্তুকিযুক্ত সার বা বীজ ডিলারদের মাধ্যমে বিতরণে অনিয়ম হতো। নতুন ডিজিটাল ডাটাবেজের ফলে কৃষকের প্রোফাইল যাচাই করে সরাসরি কার্ডের মাধ্যমে ইনপুট দেওয়া হচ্ছে, যা অপচয় রোধ করছে।
দ্বিতীয়ত, সরাসরি নগদ স্থানান্তর। বর্তমানে নগদ সহায়তা সরাসরি কৃষকের মোবাইল ওয়ালেটে (বিকাশ/নগদ) পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী কমিশন কাটার সুযোগ পাচ্ছে না।
নতুন এই কার্ডের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এতে বর্গাচাষিদের নিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে শুধু জমির মালিকরা সুবিধা পেতেন, কিন্তু এখন যারা প্রকৃতপক্ষে মাঠে কাজ করছেন (প্রান্তিক চাষি), তাদের নিবন্ধিত করে কার্ড দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তৃতীয়ত হলো টার্গেটিং। ডাটাবেজের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের (বিশেষ করে বর্গাচাষিদের) চিহ্নিত করা সহজ হয়েছে, যা আগে বড় জমির মালিকদের কব্জায় থাকত। তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা।
আগামী ৪ বছরে ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কৃষক কার্ড বিতরণ করার যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছে, তার সফলতা নির্ভর করছে এই বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি আদৌ প্রকৃত কৃষক কিনা তার ওপর।
তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তা অনুধাবন করতে নিচের বিশ্লেষণটি বোঝা প্রয়োজন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২৫,০০০ কোটি থেকে ২৭,০০০ কোটি টাকা (এটি প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামের ওপর ভিত্তি করে কিছুটা পরিবর্তিত হয়)।
ভর্তুকির সিংহভাগ, অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় সরাসরি রাসায়নিক সার (ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি) আমদানিতে। অন্য খাতগুলোয় বাকি অংশ ব্যয় হয় সেচে বিদ্যুৎ ভর্তুকি, বীজ সহায়তা এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে (কম্বাইন হারভেস্টার বা পাওয়ার টিলার কেনায় ২৫-৫০ শতাংশ সরকারি ছাড়)।
মাথাপিছু সরাসরি সার ভর্তুকি দেওয়া হয় প্রায় ১২,০০০-১৫,০০০ টাকা। এটি কৃষক সরাসরি হাতে পান না, বরং সারের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয়। বন্যা ও খরায় নগদ সহায়তা হিসেবে ১,৫০০-২,৫০০ টাকা বিশেষ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ ও সেচ সহায়তায় ৮০০-১,২০০ টাকা সেচ পাম্পের বিলের ওপর বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়।
তথ্যগুলো বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট (২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬-এর প্রাক্কলন), কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিবেদনের সমন্বিত বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া।
যেহেতু এই প্রক্রিয়াটি ছিল পরোক্ষভাবে সুবিধা প্রদানের একটি প্রক্রিয়া, তাই এর অপচয় ও দুর্নীতির মাত্রা বেশি ছিল। সরকার ডিলারদের সস্তায় সার দিত, আর ডিলাররা কৃষকদের কাছে বিক্রি করত। এতে প্রান্তিক কৃষক অনেক সময় ন্যায্যমূল্যে সার পেতেন না বা ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করত।
ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের হাতে লেখা তালিকা থাকত, যেখানে অনেক সময় প্রকৃত কৃষকের চেয়ে ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তিদের নাম বেশি থাকত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকার যখন নগদ টাকা দিত, তখনো অনেক ক্ষেত্রে তা চেয়ারম্যান বা মেম্বারদের মাধ্যমে পৌঁছত, যা দেরি হতো বা মাঝপথে অনিয়ম হতো।
এখন এই প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আসতে চলেছে। ২০২৬ সাল থেকে এই কার্ডের মাধ্যমে সুবিধাগুলো হবে ব্যক্তিভিত্তিক এবং ডিজিটাল। সরকার সরাসরি কৃষকের কার্ডে ভর্তুকির পরিমাণ বা কোটা নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে। সার কিনতে গেলে কার্ড পাঞ্চ করলে বা তথ্য দিলে ডিলারকে নির্ধারিত সরকারি মূল্যে দিতে বাধ্য থাকতে হবে।
আগে যারা জমির মালিক ছিলেন না, তারা তালিকায় আসতেন না; এখন এই কার্ডের মাধ্যমে বর্গাচাষিরাও নিবন্ধিত হয়ে সরাসরি সুবিধা পাবেন, যা আগে তারা পেতেন না। যেকোনো প্রণোদনা বা ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে যাবে। অর্থাৎ সব সেবায় ‘মাঝপথের লিকেজ’ বন্ধ হবে কি না, তা নির্ভর করবে তথ্য হালনাগাদকরণ ও নির্ভুলতার ওপর।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট কৃষি পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৬৮ লাখের মধ্যে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৯২%)।
প্রায় ৪০ লাখের বেশি ভূমিহীন কৃষক পরিবার রয়েছে, যারা মূলত অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। যেহেতু প্রায় সবাই প্রান্তিক কৃষক, তাই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ৪ বছরে সবাইকে আওতায় আনা একটি চ্যালেঞ্জ। এর ফলে চাহিদার চাপ প্রতীয়মান হবে এবং সেই সুযোগে দুর্নীতির একটি নতুন দ্বার উন্মোচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই সমস্যার সমাধানও মূলত হালনাগাদ ও নির্ভুল তথ্যের ওপরই নির্ভর করছে।
...এই কার্ডের সফল বাস্তবায়নও সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে সঠিক তথ্য এবং নিয়মিত হালনাগাদ রাখার ওপর। কারণ পুরো ব্যবস্থাটির ভিত্তিই হলো: কে প্রকৃত কৃষক, কার কত জমি, কী ফসল উৎপাদন করে এবং তার আর্থিক অবস্থান কী—এইসব তথ্যের ওপর।
এই কার্ডের সফল বাস্তবায়নও সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে সঠিক তথ্য এবং নিয়মিত হালনাগাদ রাখার ওপর। কারণ পুরো ব্যবস্থাটির ভিত্তিই হলো: কে প্রকৃত কৃষক, কার কত জমি, কী ফসল উৎপাদন করে এবং তার আর্থিক অবস্থান কী—এইসব তথ্যের ওপর। যদি এই ডাটাবেজে ত্রুটি থাকে, তাহলে পুরো নীতিগত কাঠামো ভেঙে পড়বে। ভর্তুকি ভুল মানুষের কাছে যাবে, প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটবে।
বাস্তবে, এই ধরনের প্রকল্পে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, বরং ‘ডাটা ইন্টেগ্রিটি’। গ্রাম পর্যায়ে জমির মালিকানা, বর্গাচাষ, মৌখিক চুক্তি, এসব জটিল বাস্তবতা সঠিকভাবে ডিজিটাল রেকর্ডে আনা কঠিন। যদি স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে অবহেলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতি ঢুকে পড়ে, তাহলে কার্ডটি কার্যত অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। তখন এটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প না হয়ে একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতায় পরিণত হবে।
বাংলাদেশে তথ্য সংগ্রহ ও ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বহু ক্ষেত্রেই নীতিগত কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে, যার প্রমাণ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে দেখা যায়। যেমন, ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটাবেইজ (এনএইচডি)-এ প্রায় ৩.৫ কোটি মানুষের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বিভিন্ন মূল্যায়নে ২০–৩০ শতাংশ অন্তর্ভুক্তি ত্রুটি এবং ১০–২০ শতাংশ বর্জন ত্রুটি পাওয়া গেছে; অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত এবং প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়েছে। একইভাবে, ভিজিএফ প্রোগ্রাম ও ভিজিডি প্রোগ্রাম-এর উপকারভোগী তালিকায় বহু ক্ষেত্রে ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভুল নির্বাচন দেখা গেছে, যা স্থানীয় পর্যায়ের পক্ষপাত এবং দুর্বল যাচাই ব্যবস্থার ফল।
কৃষি ভর্তুকি বিতরণেও জমির মালিক ও প্রকৃত চাষির মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। আবার, কোভিড-১৯ সময়কালে নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে ভুয়া নাম, মৃত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি এবং একই নম্বরে একাধিক নিবন্ধনের মতো গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে ডাটা সংগ্রহ, যাচাই ও হালনাগাদ প্রক্রিয়া কাঠামোগতভাবে দুর্বল; ফলে যেকোনো ডাটাভিত্তিক নীতি, যেমন কৃষক কার্ড, নির্ভুল তথ্য ছাড়া কার্যকর হওয়া কঠিন।
বিগত ব্যর্থতার শিক্ষাকে পুঁজি করে, যদি নিয়মিত আপডেট, যাচাই এবং ক্রস-চেকিং নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই কার্ড একটি শক্তিশালী টুলে পরিণত হতে পারে। তখন সরকার সরাসরি প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারবে, নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক হবে এবং কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে। না হলে এটি থেকে যাবে আরও একটি ভোটের রাজনীতির সফল হাতিয়ার হিসেবে।
পরিশেষে বলা যায়, কৃষক কার্ড যেমন একটি দুরারোগ্য ব্যাধির তাৎক্ষণিক উপশম মাত্র, যেখানে ব্যাধি নির্মূলের কোনো প্রয়াস নেই; কৃষক কার্ড তা নয়। এটি বরং তার বিপরীত। তাই এর সাফল্য দেশের জন্য কাম্য।
ড. এ কে এম মাহমুদুল হক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: ঢাকা পোষ্ট
.webp)


.webp)

.webp)





