মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩২

জয়পুরহাটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় স্থবিরতা, অফারেও নেই ক্রেতা

জয়পুরহাটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় স্থবিরতা, অফারেও নেই ক্রেতা

সংগৃহীত

একদিকে তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অন্যদিকে কঠিন নিয়ম- সব মিলিয়ে জয়পুরহাটে মোটরসাইকেল চালকদের ভোগান্তি এখন চরমে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল। এমনকি তেলের এই সংকটের প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বাজারেও, নতুন মোটরসাইকেল কেনায় আগ্রহ হারাচ্ছেন ক্রেতারা। ফলে শোরুমগুলোতে বিক্রি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এতে বড় ধাক্কা খেয়েছে জয়পুরহাটের মোটরসাইকেল ব্যবসা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের ২০টি জ্বালানি তেলের পাম্পের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ পাম্প তেল সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। যেসব পাম্পে তেল দেওয়া হচ্ছে, সেখানে সকাল থেকে দিনব্যাপী শত শত মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে গ্রাহকদের তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে জ্বালানি নিতে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট বাধ্যতামূলক করায় সাধারণ চালকরা যেমন চাপে পড়েছেন। তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বিক্রিতে। তবে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য বিআরটিএ অফিসে বাড়তি কোন চাপ পড়েনি।

বিআরটিএ জয়পুরহাট সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক রাম কৃষ্ণ পোদ্দার বলেন, এ জেলায় জ্বালানি তেলচালিত ৫০ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হাজারের বেশি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নেই। এছাড়া এর বেশি সংখ্যক চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। বর্তমানে জ্বালানি পাম্পগুলোতে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও হেলমেট না দেখাতে পারলে তেল পাবে না। এমন পরিস্থিতিতেও বিআরটিএতে তেমন আবেদন পড়েনি। আগের মতো স্বাভাবিক আবেদন পড়ছে। গত ১০ দিনে ২৯টি মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনের আবেদন পড়েছে। আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনও তেমন পড়েনি। তবে তেল নিতে এমন শর্ত থাকলে আগামীতে রেজিস্ট্রেশন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন বাড়বে।

জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতায় জয়পুরহাটের মোটরসাইকেল শোরুমগুলোতে বড় ধরনের মন্দা তৈরি করেছে। সরেজমিনে জেলা শহরের বিভিন্ন কোম্পানির মোটরসাইকেল বিক্রির শোরুম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে জানা গেছে, তেল সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শোরুমগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। আগে যেখানে সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাইক বিক্রি হতো, এখন তা এক-তৃতীয়াংশে ঠেকেছে। আর ঈদের মৌসুমে বিগত বছরের তুলনায় একেবারে বিক্রি কম। টাকা কমের অফার থাকার পরেও ক্রেতারা মোটরসাইকেল কিনছেন না। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে জয়পুরহাটের মোটরসাইকেল ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা করছেন তারা।

দি ফ্রেন্ডস মটরস শোরুমে ইয়ামাহা কোম্পানির মোটরসাইকেল বিক্রয় করা হয়। এই শোরুমের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে ৫০টি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৪০টির মতো মোটরসাইকেল বিক্রয় করা হয়েছে। আর মার্চ মাসে ঈদ হওয়ার কারণে এ মাসে ৭০টির মতো গাড়ি বিক্রি হয়েছে। তবে ঈদের পর গত ৩-৪ দিনে কোন গাড়ি বিক্রি হয়নি। তেল সংকটের কারণে এমনটা হচ্ছে।

হোন্ডা কোম্পানির শোরুম এ-ওয়ান ইমপেক্সের স্বত্ত্বাধিকারী শ্যামল কুমার ঘোষ বলেন, আমরা বিগত ঈদ মৌসুমে একশটির বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি করি। কিন্তু এবার ৭০টি বিক্রি হয়েছে। ঈদের পর গত সাতদিনে মাত্র ৩টি গাড়ি বিক্রি হয়েছে। যেখানে ১৫টির মতো গাড়ি বিক্রি হওয়া কথা। আমাদের ২ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা কম নেওয়া হবে এমন অফারও আছে। তবু ক্রেতারা আসছেন না। তেলের একটা ক্রাইসিস আবার রেজিস্ট্রেশন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া তেল পাবে না। এটি আরও বেশি প্রভাব পড়ছে।

হাসান ট্রেডিংয়ের মালিক মেহেদী হাসান বলেন, আমার এখানে বাজাজ কোম্পানির মোটরসাইকেল বিক্রি করা হয়। ঈদ মৌসুমে প্রতিবছর ১৫০-২০০টির মতো গাড়ি বিক্রি করা হতো। কিন্তু এবার মাত্র ৪১টি গাড়ি বিক্রয় হয়েছে। আমাদের জয়পুরহাট এলাকা কৃষি নির্ভর। এখানকার মানুষ আলু ও ধান বিক্রি করে মোটরসাইকেল কেনে। কিন্তু এবার আলুর দাম কম। তারপর আবার তেলের একটি প্রভাব পড়েছে। এতে বিক্রি একেবারে কমেছে। একই ধরনের কথা বলেন বাজাজ কোম্পানীর আরেকটি শোরুম ইয়ানাত ট্রেডার্সের পরিচালক তারিকুল ইসলাম এবং হিরো হোণ্ডা কোম্পানির শোরুম ফাহিম মটরসের ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম।

সুজুকি মোটরসাইকেল ডিলার নেওয়া রাসেল ট্রেডিংয়ের সেলস্ এক্সিকিউটিভ হামিম হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন ধরে গাড়ি বিক্রি নেই বললেই চলে। মানুষ গাড়ি দেখতেও আসছে না। ঈদের মধ্যে ১০ হাজার টাকা কম নেওয়ার অফার দেওয়া একটি গাড়ি ৬২টি বিক্রি হয়েছে। এখনও সেই অফার আছে। কিন্তু ঈদ পরবর্তী সময়ে কোন গ্রাহক নেই। তেল সংকটের জন্য এমনটা হচ্ছে। আবার রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়িতে তেলও দিচ্ছে না। আমরা নতুন গাড়িতে কিছু তেল দিয়ে থাকি। কিন্তু সেই তেলও দিতে পারছি না। নতুন গাড়ি পাম্পে নিয়ে গেলে রেজিস্ট্রশন ছাড়া তেলও দিচ্ছে না।

এদিকে খোলা বাজারে পেট্রোল তেল না পাওয়ায় বিক্রি কমেছে সেচযন্ত্রেরও (পানি তোলার মেশিন)। মেসার্স বেঙ্গল মেশিনারীজের স্বত্ত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিদিন ৪-৫টি সেচ মেশিন বিক্রি করা হতো। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে কোন মেশিন বিক্রি যায়নি। গ্রাহকও দাম শুনতে আসছে না। সকল মেশিনারীজে এমন পরিস্থিতি হচ্ছে। দ্রুত জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি এই ব্যবসায়ীর।

জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-মামুন মিয়া জানিয়েছেন, জ্বালানি পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং চালকের হেলমেট না থাকলে পেট্রোল বা অকটেন সরবরাহ করা হবে না। প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রম তদারকির জন্য ২০ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিদিন জ্বালানি তেল বিক্রি কার্যক্রম পরিচালনা তদারকি করবেন।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট