শুক্রবার   ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৮ ১৪২৬   ২৬ জমাদিউস সানি ১৪৪১

১০

হাদিস ইনসাফ ও নীতিবান পরিবার: সুখ সমৃদ্ধির ভূস্বর্গ

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

নু’মান ইবনু বশীর (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন যে, তার পিতা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, আমার এই পুত্রকে আমি আমার একটি কৃতদাস দান করেছি। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, তুমি কি তোমার সকল সন্তানকে এরুপ দান করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লা (সা.) বলেন, তাহলে তুমি ফেরত নাও। (সহিহ বুখারী, হা: ২৫৮৬)।

রাবীর পরিচয়: নুমান ইবনু বশীর ইবনু সা’দ (রা.)  খাজরাজ গোত্রের লোক এবং আনসার সাহাবী। তিনি বদর উহুদ এবং তার পরবর্তী যুদ্ধসমূহে অংশ গ্রহণ করেন। তিনিই সর্বপ্রথম আবূ বকর সিদ্দিক (রা.) এর হাতে খিলাফতের  বাইয়াত গ্রহণ করেন। তার পুত্র নুমান (রাযিয়াল্লা-হু ‘আনহু) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ইন্তেকালের ছয় বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন।

কোনো কোনো হাদিস বিশারদদের মতে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে সরাসরি হাদিস শুনেছেন এ কথা ঠিক নয়। আমীর ম‘আবিয়াহ্ (রা.) তাকে প্রথমে হিমস অতঃপর কুফায় গভর্নর নিয়োগ করেন। ইয়াযীদের মৃত্যুর পর তিনি সিরিয়াবাসীদের ‘আব্দুল্লাহ ইবনু জুবায়িরের খিলাফত স্বীকার করে নেয়ার আহ্বান জানান। এতে হিমসবাসীরা ৬৪ হিজরী সনে তাকে হত্যা করে। (উসুলুল গাবা) তার পুত্র মুহাম্মদ আবূ সাঈদ সিকাহ তাবীই ছিলেন। (তাহারীবুত তাহ যীব গৃহীত: মুআত্তা ইমাম মুহাম্মদ মূসা‘র টীকা, পৃ: ৫১১)।

হাদিসের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা: দান করার ক্ষেত্রে বা সন্তানদের মাঝে বন্টনের ক্ষেত্রে কোনো সন্তানকে অতিরিক্ত দেয়া একটি অপচ্ছন্দনীয় কাজ উক্ত পরিচ্ছেদে হাদিসটি স্থান পেয়েছে। পারিবারিক জীবনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় হাদিসটির গুরুত্ব অপরিসীম। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ বন্টন সম্পর্কিত নীতিমালা আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। এতদ্ব্যতীত, পিতা-মাতার জীবিতাবস্থায়ও সন্তান-সন্ততিরা স্বীয় পিতা-মাতার কাছ থেকে ইনসাফ ভিত্তিক কিছু পাওয়ার অধিকারী-যার বর্ণনাা হাদিসটিতে এসেছে।

এ হাদিসখানা পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার এক বিরাট উদাহরণ। সন্তান-সন্ততির প্রতি ইনসাফপূর্ণ ব্যবহার করার তাগিদ দেয়া হয়েছে হাদিসটিতে। স্নেহের আতিশয্যে কোনো সন্তানের প্রতি পক্ষতামূলক আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়, বরং তা ইনসাফের পরিপন্থী। সুফইয়ান, আহমাদ, ইমাম বুখারী প্রমুখের মতে দান ও উপটৌকনের ব্যাপারে সন্তানদের মধ্যে সমতা বিধান করা আবশ্যক।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ

অর্থাৎ: ‘তুমি নিকটাত্নীয়কে তার হক্ব পরিপূর্ণরুপে আদায় করো।’(সূরা: সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৬)।

আল্লাহ তায়ালা যেমন তার সৃষ্টজগতের প্রতি সমানভাবে করুণা বর্ষণ করেন, তেমনি মা-বাবারও উচিত সন্তান-সন্ততির মাঝে সব ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।

অবশ্য যদি কোনো সন্তান বিশেষ অসুবিধায় পড়ে অথবা রোগাক্রান্ত হয় কিংবা কন্যা সন্তান বিধবা হয়ে পড়ে, তখন অবস্থার বিবেচনায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা পিতা-মাতার ওপর আবশ্যক। এই বিশেষ অবস্থায় কোনো সন্তানদের জন্য অধিক খরচ করা সমতার বিধানে গণ্য হবে না।

পিতার প্রতি সন্তানের স্বাভাবিকভাবেই অধিকার রয়েছে। কিন্তু যখন কোনো সন্তান অসহায় বা নিরুপায় হয়ে পড়ে তখন তার প্রতি পিতার দায়িত্ব আরো বেড়ে যায়। যখন কেউ বিধবা হয়ে পড়ে এবং তার কোনো অবলম্বন থাকে না, তখন পিতার দায়িত্ব হয়ে পড়ে তার সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া। এই ভালোবাসাকে মহানবী (সা.) উত্তম দান বলে অভিহিত করেছেন।

হাদিসের ব্যাখ্যা: এ হাদিসটিতে পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল  ব্যবস্থা উল্লেখ করা হয়েছে। যখনই কোনো পরিবারে মা-বাবার পক্ষ থেকে কোনো সন্তানদের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বা স্নেহ-মমতার লক্ষণ দেখা যায়-যদিও তার পেছনে যথেষ্ঠ ন্যায্য কারণ বিদ্যমান থাকে-তবুও সে পরিবারে দ্বন্দ্ব ও অশান্তি নেমে আসে। সূরা ইউসুফ এর দিকে তাকালে এ সত্য ফুঠে ওঠে। তাই প্রতি পরিবারের মা-বাবার উচিত, সন্তান-সন্ততির মাঝে ইনসাফ ভিত্তিক আচরণ করা। আমাদের সমাজে অনেক বাবা-মা কন্যা সন্তানের তুলনায় পুত্র সন্তানকে অধিক গুরুত্ব দেন, সম্পত্তি থেকে মাহরুম করেন-যা শরীয়াতের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। যে কারণে অনেক পরিবারেই দ্বন্দ্ব কলহ লেগে থাকে। তাই পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকলের এ হাদিসের প্রতি আমল করা প্রয়োজন।

এ হাদিসটিতে সন্তান-সন্ততিদের জন্য একই সঙ্গে দু‘টি শিক্ষা বিদ্যমান

প্রথমত: যদি কোনো বাবা-মা তাদেরই কোনো ভাই-বোনের প্রতি দান বা উপটৌকন ব্যতীত প্রয়োজনের তাগিদে বেশি সম্পদ ব্যয় করেন তবে তাদের উচিত হবে না ওই সব ভাই-বোনদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়া, বরং তাদের উচিত, ওই সব অসুবিধায় পতিত ভাই-বোনদের প্রতি অদিকতর দরদী হওয়া এবং এ কাজ তাদের জন্য উত্তম মর্যাদা কারণ হবে।

দ্বিতীয়ত: যদি কোনো পিতা-মাতা কোনো সন্তানকে অধিক ভালোবেসে অন্যায়ভাবে অন্য সন্তানদের হক্ব নষ্ট করেন, সম্পত্তির কোনো অংশ লিখে দেন, তবে বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে তার প্রতিবাদ করতে হবে।

দুর্বল কমজোর সন্তানদের জন্য ব্যয় অতি পূণ্যের কাজ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সেই ব্যক্তির চেয়ে পূর্ণ ও পুরস্কার লাভের যোগ্যতর কে হতে পারে নিজের কমজোর সন্তান-সন্ততির জন্য ব্যয়করে। (সহিহ মুসলিম, হা: ১৬৬০)।

সর্বোপরি হাদিসটির মূল শিক্ষা হলো এই যে, পিতা-মাতার ওপর সন্তানদের এ অধিকার রয়েছে যে, লেনদেন তার সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ ও সমতা বিধান করবে।

এ ব্যাপারে এক যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শাইখ বিন বায (রা.) বলেন: নিশ্চয়ই প্রতিটি অভিবাবকের উচিত তাদের সন্তানদের ওপর ন্যায্য বিচার করা, বিশেষত সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে-চাই পুত্র অথবা কন্যা সন্তান হোক। যদি কোনো কারণে সম্পদের বন্টনের ক্ষেত্রে কিছু কমবেশি করার প্রয়োজন পড়ে তবে অবশ্যই অন্য ওয়ারিশদের সন্তুষ্টিচিত্তে তা হতে হবে, যদি তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে। তিনি আরো বলেন, অবশ্যই এই সন্তুষ্টি অভিভাবকদের কোনো প্রকার ভয়ভীতির কারণে হবে না। আর সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে সন্তানদের মাঝে বৈষম্য না করাটাই উত্তম এবং অন্তরের পরিশুদ্ধতা। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,

‘তোমরা মহান আল্লাহকে ভয় করো ও সন্তানদের মাঝে ন্যায্য বিচার করো।’ (ফাতাওয়া শাইখ বিন বায (রা.) ২০/৫১)।

হাদিসের শিক্ষাসমূহ-

(১) পরিবারে ইনসাফ; শান্তি ও সমৃদ্ধির পূর্ব শর্ত। যারা পরিবারে  ইনসাফ কায়েম করতে পারবেন, তারাই সুখী পরিবার বলে বিবেচিত হবেন।

(২) সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তায়ালা। তাই তাঁর বিধান ছাড়া ইচ্ছা মতো সম্পদ ব্যয-বন্টন করা নিষিদ্ধ; বরং গর্হিত অপরাধ।

(৩) সাধ্যমত পরিবারের ন্যায়সঙ্গত দাবী পূরণ কর্তার প্রতি আবশ্যকীয় দায়িত্ব। এ দায়িত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

(৪) পরিবারে ভরণ-পোষণ এর মাঝে অনেক সওয়াব রয়েছে। বিশেষত: অক্ষম সন্তানের প্রতি দয়া করার পরিণাম খুবই ভালো এবং বড় নেকীর কাজ।

(৫) পিতা-মাতার প্রতি অবিচার  করলে সে সন্তান যেমন মহান আল্লাহর বিরাগভাজন হয়; ঠিক তেমনি সন্তানদের প্রতি অবিচার করলে পিতা-মাতাও জালিম হিসেবে পরিগণিত হবেন।

অতএব, ব্যক্তি ও পরিবার আদর্শ সমাজের মূলভিত্তি। যদি পরিবার সুখী হয়, তাহলে এর সু-প্রভাব সমাজে প্রতিফলিত হয়। ফলে সমাজের অন্যরাও এর দ্বারা উপকার লাভ করে। এবাবে পুরো সমাজ আদর্শ ও নিষ্ঠার ওপর প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়। আর এ জন্য চাই- সততা, ইনসাফ ও সৌন্দর্য।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এ হাদিসটি অনুসারে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
এই বিভাগের আরো খবর