সংগৃহীত
ব্রাজিলের বাইরে বা বিদেশি ক্লাবে পাড়ি জমানো থেকে বিরত রাখতে মাত্র ২০ বছর বয়সেই সরকারিভাবে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করা হয় তাকে। মাঠে ক্ষিপ্রতা, নিখুঁত কৌশল আর ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন বিশ্বের কোটি ভক্তকে। অথচ বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জেতা এই তারকার আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায় শেষ হয় মাত্র ৩০ বছর বয়সে। বলা হচ্ছে ফুটবলের রাজা-খ্যাত এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো’র কথা, ‘পেলে’ নামেই যিনি সর্বাধিক পরিচিত।
ব্রাজিলের মিনাস জেরাইস রাজ্যের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরে ১৯৪০ সালে তার জন্ম। মার্কিন উদ্ভাবক থমাস এডিসনের নামানুসারে করা হয় নামকরণ। তবে ‘পেলে’ তার ডাকনাম হওয়ার গল্পটা বেশ মজার, যা নিয়ে এখনও রহস্য আছে। কথিত আছে– ছোটবেলায় তিনি তার বাবার দলের গোলরক্ষক ‘বিলে’র ভক্ত ছিলেন, কিন্তু ছোটমুখে নামটি কিছুটা বিকৃত উচ্চারণে বলতেন ‘পিলে’ বলে। ফলে নামটি তার অপছন্দের, কিন্তু সেটিই পরে ‘পেলে’-তে রূপ নেয়, জুড়ে যায় নিজের সঙ্গে
ফুটবল প্রতিভা দেখিয়ে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে অভিষেক হয় পেলের। গোল করেন সেন্ট আন্দ্রের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে, পরে দ্রুততম সময়ে ব্রাজিল জাতীয় দলেও ডাক পেয়ে যান। মাত্র ১৬ বছর ২৫৭ দিন বয়সে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২-১ গোলে হারের ম্যাচে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় তার। সেদিন ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি আসে পেলের পা থেকে।
এরপর সারাবিশ্বের সামনে মহান এই ব্যক্তিত্বের নিজেকে মেলে ধরার পালা। এক বছর পর সুইডেন (১৯৫৮) বিশ্বকাপ দিয়ে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পান পেলে। শুরুতে বেঞ্চে বসে কাটালেও পরে সেই ছোটখাটো জাদুকর ৪ ম্যাচে ৬ গোল করে প্রথম সুযোগেই ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ে দারুণ ভূমিকা রাখেন। স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে ফাইনালে তার ফুটবল নৈপুণ্য, শিল্পময় কারিকুরি ও কৌশল বিশ্বকে মুগ্ধ করে। আর বিশ্বের সামনে বাজতে থাকে এক জাদুকরী তারকার আগমনী সুর।
নিজের শহর ও ব্রাজিল পেলেকে আগেই চিনত। বিশ্বজুড়ে তার জনপ্রিয়তা বেড়ে চলায় ব্রাজিল সরকার তাকে বিদেশে পাড়ি জমানো থেকে আটকাতে ‘জাতীয় সম্পদ’ ঘোষণা করে। এ ছাড়া বাইরে থেকে দেশে ফেরার পর দেওয়া হয় রাষ্ট্রপ্রধানের ন্যায় মর্যাদা।
এদিকে, নিজের দ্বিতীয় বিশ্বকাপটা (১৯৬২) পেলের জন্য ছিল হতাশায় মোড়ানো। দ্বিতীয় ম্যাচেই চোটের কারণে ছিটকে যান চিলি বিশ্বকাপ থেকে। যদিও পেলের অনুপস্থিতিতে অপরাজিত থেকে ব্রাজিল টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
সেই আক্ষেপ মিটিয়েছেন ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে। যেখানে পেলের নেতৃত্বেই ব্রাজিল তৃতীয় বিশ্বমুকুট মাথায় তোলে। ফুটবল গোলের খেলা হলেও সেই আসরে পেলের করা ৪টি গোলের চেয়েও ৩টি ‘ব্যর্থ প্রচেষ্টা’কে ফুটবলবিশ্ব দারুণভাবে স্মরণে রেখেছে। চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে গোলরক্ষক একটু এগিয়ে আছেন দেখে প্রায় নিজেদের অর্ধ থেকে গোলের লক্ষ্যে বুলেটগতির শট নেন তিনি। গোলরক্ষক পেছনে দৌড়ে গিয়ে কোনোমতে বলটি আটকালেও শটটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে যায়।
পেলের আরেকটি বুলেটগতির হেড ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হতে পারত, ইংল্যান্ড গোলরক্ষক গর্ডন ব্যাঙ্কস প্রায় গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন সেই বল। যাকে ‘সেভ অব সেঞ্চুরি’ বলা হয়। এ ছাড়া উরুগুয়ের বিপক্ষে একটি থ্রু বল পায়ের স্পর্শ না করেই শরীরের এক ঝটকায় সেটিকে অন্যদিকে যেতে দিলেন পেলে, পরে নিজে অন্য পাশ দিয়ে ঘুরে বলের নিয়ন্ত্রণ নিলেন। গোলরক্ষক তখন সম্পূর্ণ বোকা বনে গিয়ে উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে! যদিও অল্পের জন্য সেটি বাইরে দিয়ে যাওয়ায় গোল পাননি পেলে
তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের এক বছর পর রিও ডি জেনিরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে ১ লাখ ৮০ হাজার দর্শকের সামনে পেলে ব্রাজিলের হয়ে নিজের ৯২তম ও শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। ৩০ বছর বয়সেই তার আন্তর্জাতিক অবসর ছিল অনেকের মতেই অকাল সিদ্ধান্ত। ৭৭টি আন্তর্জাতিক গোল ও অনন্য খেলার ধরন দিয়ে পেলে তার প্রতিশ্রুতি ও অবদানের ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ রাখেননি।
কেন এত দ্রুত ফুটবলকে বিদায় বললেন ফুটবল-রাজা? এর নেপথ্য কারণ হিসেবে প্রথমে ব্রাজিলের তৎকালীন ফুটবল প্রধান জোয়াও হ্যাভেলেঙ্গের সঙ্গে দ্বন্দ্ব মনে করা হলেও, পেলে রাজনৈতিক বিষয় জড়িত বলে উল্লেখ করেন। যদিও তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এরপরও তিনি খেলে যান সান্তোসের হয়ে। পেশাদার ক্যারিয়ারে তার ১০০০তম গোল (কারও মতে সেটি ১০০২তম) উদযাপন করেছে পুরো ব্রাজিল। তাতে সামিল হয়ে ঘণ্টা ধ্বনি বেজে ওঠে গির্জায়।
পেলে আমেরিকান ফুটবলের প্রসারেও দারুণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সান্তোস থেকে অবসরের বছর খানেক পর এক বন্ধুর প্রতারণায় সব সম্পদ হারিয়ে যোগ দেন নিউইয়র্কের ক্লাব কসমসে। যেখানে বছরে তিনি আয় করতেন মিলিয়ন ডলার, যা সেই সময়ের সর্বোচ্চ চুক্তিমূল্য ছিল বলে ডয়েচে ভেলে’র এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা পেলেকে ‘শতাব্দীর সেরা ফুটবলার’ হিসেবে ঘোষণা করে। আর আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি তাকে স্বীকৃতি দেয় গত শতাব্দীর সেরা ক্রীড়াবিদ হিসেবে। তিনি ছিলেন ফুটবলের রাজা, শারীরিক গঠনে ছোটখাটো হলেও যার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয়। ১৯৭৭ সালে ফুটবল ক্যারিয়ারে বিদায়ের পর ইউনেস্কোর দূত, ব্রাজিলের ক্রীড়ামন্ত্রী–সহ নানা ভূমিকায় দেখা যায় এই সেলেসাও কিংবদন্তিকে। সব মায়া ছিন্ন করে ২০২২ সালে নানা শারিরীক জটিলতা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ফুটবল-সম্রাট পেলে।


.webp)
.webp)
.webp)







.webp)
