রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩

টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন, পরিবর্তন আনা যায় কীভাবে

টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন, পরিবর্তন আনা যায় কীভাবে

সংগৃহীত

দেশের পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট বা টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোয় প্রতিদিন লাখো যাত্রী বাস, লঞ্চ ও ট্রেন টার্মিনালের মাধ্যমে যাতায়াত করেন।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে, অধিকাংশ টার্মিনাল এখনো সুশৃঙ্খল ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ভুগছে, যা যাত্রী ভোগান্তির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট এখনো কাঠামোগতভাবে দুর্বল, রয়েছে সমন্বয়ের অভাব এবং প্রযুক্তি-নির্ভরতার ঘাটতি। অথচ একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাকে একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন, যাত্রীকেন্দ্রিক ও তথ্যনির্ভর সিস্টেমে রূপান্তর করেছে। এই ব্যবধান বোঝা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করায় এখন আমাদের প্রধান কাজ।

বাংলাদেশের বাস টার্মিনালগুলো বিশেষ করে ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ বা মহাখালী পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এগুলো মূলত ‘হোল্ডিং স্পেস’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু একটি কার্যকর ‘অপারেশনাল হাব’ হিসেবে গড়ে ওঠেনি।

যানবাহনের নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম বরাদ্দ অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মিত, সময়সূচি কার্যত অকার্যকর এবং যাত্রীদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তি সীমিত। ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি অপারেশনাল অদক্ষতার কারণে যানজট ও সময় অপচয়ও বাড়ছে।

এর বিপরীতে, সিঙ্গাপুরের টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট একটি সম্পূর্ণ ডাটা-ড্রিভেন সিস্টেম। প্রতিটি বাসের অবস্থান জিপিএস-এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা হয় এবং সেই তথ্য যাত্রীদের মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল ডিসপ্লেতে সরাসরি প্রদর্শিত হয়।

এখানে অনিশ্চয়তা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশে এই ধরনের প্রযুক্তি প্রথমে আংশিকভাবে শুরু করে ধাপে ধাপে পরিধি বাড়াতে হবে। জাপানের উদাহরণ আরও নিয়মানুবর্তী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। সেখানে টার্মিনাল ম্যানেজমেন্ট মূলত ‘নির্ভুলভাবে পরিচালিত কার্যপ্রণালী’-এর ওপর নির্ভরশীল।

ট্রেন বা বাসের সময়সূচি নির্ভুলভাবে পরিচালিত হয়। প্ল্যাটফর্মে যাত্রী কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে উঠবে—সবকিছু পূর্বনির্ধারিত। এই শৃঙ্খলা শুধু প্রযুক্তির কারণে নয়, বরং শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা, সংস্কৃতি ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনের ফল।

বাংলাদেশে এই ধরনের অপারেশনাল ডিসিপ্লিন এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এসব উন্নত দেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখি একটি ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম, যেখানে বাস, ট্রেন এবং ট্রাম একই নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করে।

একটি টিকিট ব্যবহার করে যাত্রী সহজেই বিভিন্ন মাধ্যমে যাতায়াত করতে পারে। এর ফলে টার্মিনালগুলো শুধু যানবাহন পরিবর্তনের স্থান নয়, বরং একটি বিরামহীন গতিশীল হাব-এ পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের মধ্যে এই সমন্বয় অত্যন্ত দুর্বল।

বর্তমানে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা আধুনিক অবকাঠামো ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। সেখানে স্মার্ট গেট, স্বয়ংক্রিয় টিকিটিং, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নিরাপত্তা ও সেবা, দুই দিকেই সমউচ্চমান বজায় রাখা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের উন্নয়ন সম্ভব হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার প্রধান সমস্যাগুলো আমি তিনটি স্তরে দেখি—

প্রথমত, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—যেখানে পর্যাপ্ত জায়গা, সঠিক লেআউট এবং পৃথক প্রবেশ-প্রস্থান ব্যবস্থা নেই।

দ্বিতীয়ত, অপারেশনাল দুর্বলতা—যেখানে সময়সূচি, প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত ভাবে পিছিয়ে থাকা, যেখানে ডিজিটাল টিকিটিং, রিয়েল-টাইম তথ্য এবং ডাটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার সীমিত।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপকে অত্যন্ত জরুরি মনে করি—

প্রথমত, প্রতিটি বড় টার্মিনালে একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন করতে হবে, যেখানে থেকে যানবাহনের আগমন-প্রস্থান, প্ল্যাটফর্ম বরাদ্দ এবং যাত্রী প্রবাহ মনিটর করা হবে।

দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে ডিজিটাল টিকিটিং ও রিয়েল-টাইম ইনফরমেশন সিস্টেম চালু করতে হবে, যাতে যাত্রীরা আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারে। যাত্রীরা যদি আগেই জানতে পারেন তাদের বাস কখন আসবে বা ছাড়বে, তাহলে অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও বিশৃঙ্খলা অনেকাংশে কমে যাবে। একইসঙ্গে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সেবা চালু করলে যাত্রী অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হবে।

তৃতীয়ত, টার্মিনালের ভৌত কাঠামো পুনঃনকশা করতে হবে, যেখানে যানবাহন ও পথচারীর চলাচল আলাদা করা হবে। যাত্রীসেবার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা দরকার। আধুনিক ওয়েটিং এরিয়া, পরিষ্কার শৌচাগার, নিরাপদ খাবারের ব্যবস্থা এবং স্পষ্ট নির্দেশনাসহ সাইনেজ একটি মানসম্মত টার্মিনালের অপরিহার্য উপাদান। এই বিষয়গুলো উন্নত না হলে যাত্রীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়।

এছাড়া, মানবসম্পদ উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলোয় টার্মিনাল ম্যানেজমেন্টে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োজিত থাকে, যারা নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে কাজ করে। বাংলাদেশে এই ধরনের পেশাদার ব্যবস্থাপনা এখনো সীমিত, যা উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সিসিটিভি, স্ক্যানিং সিস্টেম এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ইমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেম থাকতে হবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল পেমেন্ট ও অটোমেশন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

এখানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে। বেসরকারি খাতের দক্ষতা ও বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত আধুনিক টার্মিনাল গড়ে তোলা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এখন একটি জাতীয় এবং জনমুখী বিষয়। এটি শুধু যাত্রীসেবার উন্নয়ন নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সময় সাশ্রয় এবং নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রযুক্তিনির্ভর, সমন্বিত এবং যাত্রীকেন্দ্রিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অপরিহার্য।

যদি আমরা বিশ্বের সফল মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে তা স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের টার্মিনালগুলোও একসময় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে এবং সেটিই হবে একটি কার্যকর, টেকসই ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার ভিত্তি।

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট

সর্বশেষ

অনলাইন জরিপ

২৬ এপ্রিল ২০২৬ || ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩

উত্থাপিত ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই ও যুগোপযোগী করে সংসদে তোলার সরকারি সিদ্ধান্তকে আপনারা কি সমর্থন করেন ?

মোট ভোটদাতা: ১২৯জন