বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২

সবুজ পাতার ফাঁকে লাল সম্ভাবনা, স্ট্রবেরিতে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

সবুজ পাতার ফাঁকে লাল সম্ভাবনা, স্ট্রবেরিতে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

সংগৃহীত

জমির চারপাশে জালের বেড়া, এমনকি ওপরেও টানানো হয়েছে। আর এই জালের ভেতরে সারি সারি লাইনে রয়েছে সবুজ গাছ। এসব গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল স্ট্রবেরি। এক সময় শখের বশে চাষ শুরু করলেও, এখন এই ফসল স্থানীয় কৃষকদের কাছে হয়ে উঠেছে যে ‘লাল’ ভাগ্য।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার জামালপুর, চান্দা, কালীবাড়ি, খেজুরতলী, পাকারমাথাসহ কয়েকটি এলাকার মাঠে আবাদ করা এই স্ট্রবেরি চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। উচ্চমূল্যের এই ফসলে স্বল্প সময়ে মিলছে অধিক লাভ। ফলে ধান, আলু বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় স্ট্রবেরি চাষেই বেশি ঝুঁকছেন সেখানকার স্থানীয় চাষিরা।

তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পচনশীল এই ফল দ্রুত বাজারজাত ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি তদারকি আর হিমাগার সুবিধা পেলে জয়পুরহাটের এই স্ট্রবেরি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, হিমাগার সুবিধা থাকলেও কেউ এই ফল রাখেন না।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল হতেই নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা স্ট্রবেরির জমিতে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জমি নিড়ানো, সার দেওয়া, ওষুধ ছিটানোসহ স্ট্রবেরি জমিতে বিভিন্ন কাজ করছেন অনেকেই। আবার দিনের বিভিন্ন সময় গাছ থেকে পাকা স্ট্রবেরি সংগ্রহ করছেন। এসময় স্ট্রবেরি জয়পুরহাট থেকে জামালগঞ্জ এলাকায় চলাচল করা জামালপুর, কালীবাড়ি, খেজুরতলী এলাকার রাস্তার পাশে বসে বিক্রি করা হচ্ছে। বেশিরভাগ স্ট্রবেরি ক্ষেত থেকে উত্তোলনের পর তা যত্ন সহকারে কার্টনে সাজানো হচ্ছে। এসব কার্টন ওজন করার পর ট্রাকে লোড দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠানো হচ্ছে। এখানকার উৎপাদিত স্ট্রবেরি আকারে বড়, সুস্বাদু এবং সুগন্ধযুক্ত হওয়ায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

সেখানকার চাষিরা জানান, বছরের কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের দিকে জমি প্রস্তুত করে স্ট্রবেরির চারা রোপণ করতে হয়। প্রতিটি চারার দাম ১০ টাকা থেকে ২০ টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে ৪-৫ হাজার চারা লাগে। এছাড়া সার, কীটনাশক, সেচসহ অন্যান্য খরচ হয়। এতে স্ট্রবেরি চাষে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বাজারদর ঠিক থাকলে ওই জমি থেকে ফাল্গুন মাস থেকে ফল পাওয়া যায়। টানা একমাস সময় পুরোদমে ফল বিক্রি করা হয়। ভালো স্ট্রবেরি হলে বিঘায় প্রায় তিন লক্ষ টাকার মতো ফল বিক্রি করা যায়। তবে কৃষি বিভাগ থেকে সহায়তা পেলে এ চাষ আরও বাড়বে বলে আশা তাদের।

চাষি সোহেল হোসেন বলেন, স্ট্রবেরি কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে লাগাতে হয়। আমি ধানের বদলে লাভজনক এই ফসল চাষ করি। আমি প্রতি বছরই লাগাই। এ বছর এক বিঘা জমিতে লাগিয়েছি। বিঘায় এক লক্ষ টাকার মতো খরচ হবে। সবমিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ফল বিক্রি করা যায়। এতে আমার প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ হবে।

সুমন হোসেন নামের আরেক চাষি বলেন, এখানকার স্ট্রবেরি ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় যায়। এই ফসল আবাদ করে অনেক সময় লোকসান হয়। তবে লাভ বেশি। আমাদের এলাকার অনেক জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়।

চাষি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্ট্রবেরি চাষ লাভজনক। তবে যদি বৃষ্টি হয় বা আবহাওয়া ঠিক না থাকে তবে এটি চাষ করা কঠিন। বৃষ্টির পানি হলে এতে পচন ধরে। ভালো ফল পাওয়া যায় না। তখন দূরের ব্যবসায়ীরা স্ট্রবেরি কিনতে আসেন না। এসময় কম দামে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাস্তার পাশে বসে অল্প দামে বিক্রি করতে হয়। তখন লোকসানের চিন্তা করতে হয়।

নাসির নামে এক চাষি বলেন, আমি প্রতি বছরই স্ট্রবেরি চাষ করি। এবার ৪৭ শতক জমিতে লাগিয়েছি। স্ট্রবেরি ভালো হয়েছে। বর্তমানে ভালো মানের স্ট্রবেরি ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। কিছুদিন আগে ৩০০ টাকা কেজিতেও বিক্রি করেছি। স্ট্রবেরি কিনতে ঢাকা থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, আমার বাড়ি রাজবাড়ি। সেখান থেকে এসে আমি এখানে স্ট্রবেরি ক্রয় করি। জয়পুরহাটের এই ফলের মান খুবই ভালো। এবার ফলের সরবরাহ অনেক। এই স্ট্রবেরি কেনার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেই। আবহাওয়ার কারণে এবার ফলের ধরণ কম, এজন্য বাজারে দাম একটু বেশি। স্ট্রবেরি তো বেশি দিন রাখা যায় না। সংরক্ষণ করা পারলে ভালো, কিন্তু সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরির চাষ হয়েছে। আর উৎপাদন হয়েছে ১৮১ মেট্রিক টন। এবার ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮০ মেট্রিক টন। ইতিমধ্যে ১৩ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ.কে.এম সাদিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, এ বছর স্ট্রবেরি চাষে মাঠের অবস্থা ভালো। ফল বাজারে আসা শুরু হয়েছে। কৃষক ভাইয়েরা ভালো দাম পাওয়ার কারণে তারা দিনদিন এ চাষে আগ্রহী হচ্ছে। এই চাষ বৃদ্ধিতে আমরা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি আগামী বছর স্ট্রবেরি আবাদ ২০ হেক্টর বৃদ্ধি করতে পারব।

তিনি বলেন, স্ট্রবেরি খুবই সফ্ট। একটু আঘাত পেলে পচনের দিকে চলে যায়। এজন্য আমরা কৃষক ভাইদের পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন উত্তোলনের সময় সাবধানতা অবলম্বন করে এবং বড় ফলগুলোতে একটু সাপোর্ট দেয়। স্ট্রবেরি সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি না হলে আমাদের দুটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ আছে। সেখানে তারা স্ট্রবেরি সংরক্ষণ করতে পারেন।

আরকে

সূত্র: ঢাকা পোষ্ট