• বৃহস্পতিবার   ০৬ অক্টোবর ২০২২ ||

  • আশ্বিন ২১ ১৪২৯

  • || ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

যেসব ফলের বাগান করে বিদেশফেরত মাফি এখন কোটিপতি

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২২  

মিশ্র ফলের বাগান করে এক অর্থবছরে ৬ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নীট আয় করেছেন ফরিদপুরের বিদেশফেরত যুবক কৃষক পরিবারের সন্তান মফিজুর রহমান মাফি (৩৮)। একইসময়ে বিভিন্ন ফলের চারা বিক্রি করে তিনি নীট আয় করেছেন এক কোটি তিন লাখেরও বেশি। বাংলা ভিশনের প্রতিবেদক হারুন আনসারী-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিস্তারিত।

ফরিদপুরের সদর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের হাটগোবিন্দপুর গ্রামে ১০৩ বিঘা প্রায় ৩৪ একর জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন দেশিবিদেশী নানা জাতের মিশ্র ফলের বাগান। এরপর সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

মাফির এই মিশ্র বাগানে এখন প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার নানা জাতের দেশি-বিদেশী ফলের গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার কুল, ৩২শ’ পেয়ারা, ১২শ’ আম, মাল্টা ১২শ’, ৭শ’ কমলা, ১৮শ’ লেবু, ৩২শ’ ড্রাগন, ৩ হাজার পেপে, ৩শ’ শরুফাসহ আরো অন্যান্য ফলের গাছ রয়েছে।

তার এই মিশ্র ফলের বাগানে রয়েছে বিদেশী প্রজাতির সুমিষ্ট আম কিউযাই, কিং অব চাকাপাত, মিয়াজ্যাকি, চ্যাংমাই, রেড আইভরি, ব্রুনাই কিং- ৫ কেজি। এর প্রতিটি আমই উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং বেশ দামি। এছাড়া দেশী প্রজাতির বারি-৪, গৌড়মতি, বানানাসহ বিভিন্ন প্রজাতির আম গাছ রয়েছে তার এই বাগানে। রয়েছে থাইল্যান্ডের বারোমাসী পেয়ারা গাছ।

মফিজুর রহমান মাফির এই ফলের বাগান করার অভিজ্ঞতা খুব বেশি দিন আগের নয়। পারিবারীক পেশা কৃষিতে মনোনিবেশ করে ২০১৯ সালে তিনি পৈত্রিক ১০ বিঘা জমি আর সাথে আরো জমি লীজ নিয়ে ১৬ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেন নাহিদ অ্যাগ্রো নামে এই বাগান।

তৎকালীন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শে তিনি বাগানে কাশ্মীরি কুল, আম ও পেয়ারার চারা লাগিয়ে একটি মিশ্র বাগান গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তিন বছরের মধ্যে এখন দেশিবিদেশী বিভিন্ন রকমের নামিদামি ফলের গাছ শোভা পাচ্ছে তার বাগানে।

শুরুর বছরে তিনি তার এই মিশ্র ফলের বাগানের সামনের অংশের সাত বিঘা জমিতে তিনি ভারত থেকে সংগ্রহ করে আনা ১ হাজার ৮৬০টি কাশ্মীরি কুলের চারা লাগিয়েছিলেন। তাতেই বাজিমাত করেন। প্রথম বছরে তিনি শুধু কাশ্মীরি কুল থেকেই আয় করেন ৬০ লাখ টাকা। যা তার অনুমানেরও বাইরে ছিলো।

শুরুর বছরে বাগানে বিভিন্ন গাছ রোপন ও অন্যান্য খরচ বাবদ তার ব্যয় হয়েছিলো ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো। বিনিময়ে কাশ্মীরি কুল, পেয়ারা, মাল্টা ও আমের বাগান করে ওইবার তার নীট আয় হয়েছিলো ৮০ লাখ টাকারও বেশি।

দ্বিতীয় বছরে তিনি বাগানের পরিধি বাড়িয়ে আগের গাছগুলোর পাশাপাশি ড্রাগন, কমলা, শরিফা, লেবুসহ আরো কয়েক জাতের দেশী ও বিদেশী আমের গাছ লাগান। এবছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে এ থেকে তার নীট আয় আসে ৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

লাভের মুখ দেশে পরের বছর তিনি বাগানের পরিসর আরো বাড়িয়ে নেন। এখন তার বাগানের আয়তন ১০৩ বিঘা প্রায় ৩৩ দশমিক ৯৯ একর। এরমধ্যে অনেকের নিকট থেকে জমি লীজ নিয়েও তিনি বাগান করেছেন।

ফলের বাগান তৈরির পাশাপাশি মাফির বাগানে তিনি বিভিন্ন গাছের চারাও তৈরি করছেন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তিনি কুল, পেয়ারা ও আমের ২ লাখ ৩১ হাজারটি চারা বিক্রি করে নীট আয় করেছেন ৩৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। ওই বছর শুধু কুলের চারাই বিক্রি করেছেন ১ লাখ ৮০ হাজারটি। যা থেকে তিনি পেয়েছেন ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে কুল, পেয়ারা, আম, লেবু, শরীফা, মাল্টা, ড্রাগন ও কমলার ৪ লাখ ৪৫ হাজারটি চারা বিক্রি করে পেয়েছেন ১ কোটি ৩ লাখ ৭ হাজার ৫শ’ টাকা। এর বিপরীতে গত বছর তিনি ফল গাছের জন্য ৩৫ লাখ টাকা এবং চারা উৎপাদনে ৪৬ লাখ ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন।

সফল এই বাগানচাষী মফিজুর রহমান মাফি একজন কৃষক পরিবারের সন্তান। তার পিতা কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের হাট গোবিন্দপুর গ্রামের গৃহস্থ কৃষক মো: আক্কাস আলী সরদার। পড়াশুনায় মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোতে না পেরে ভাগ্যের অন্বেষণে কুয়েত গিয়েছিলেন। সেখান থেকে কিছু টাকা পয়সা উপার্জন করে কয়েকবছর পর দেশে এসে কিছু করার চেষ্টা করেন।

এরপর ভূষিমাল, রাখিমাল ও গরুর ব্যবসা করে একপর্যায়ে ব্যবসায় বেশ লোকসান গুনে কাশ্মীরি কুলের মাধ্যমে তার এই বাগান করা শুরু। একাজে আপন ছোট ভাই রিয়াজ সরদার সহ আরো প্রায় ৩০ জনের মতো নারী-পুরুষ কাজ করছেন। নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি তাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে।

ফরিদপুরে কাশ্মীরি কুলের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ তিনিই প্রথম শুরু করেছেন। এরপর এই কুলের কলম করে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। মফিজুর রহমান মাফি জানান, প্রথম বছর তিনি ভারত থেকে কাশ্মীরি কুলের চারা সংগ্রহ করে ১ হাজার ৮৬০ টি চারা দিয়ে তিনি এ বাগান তৈরি শুরু করেন। বাগানের পরিচর্যায় তিনি বিভিন্ন জৈব সার, সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন। তার মতে, কৃষিকাজের মধ্যে একধরনের প্রশান্তি রয়েছে। এই কাজে পরিশ্রম করতে পারলে কাউকে বিফল হতে হয় না।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ