• শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||

  • শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭

  • || ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

৩৪

‘বারাকাহ’ রাসূলের (সা.) জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পাশে ছিলেন যিনি

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২০  

কে সেই ‘বারাকাহ’, যিনি আমাদের প্রিয় নবীজি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রথম দেখেন, স্পর্শ করেন, কোলে তুলেন এবং জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সঙ্গেই ছিলেন?

নবীজি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পিতা আব্দুল্লাহ একদিন মক্কা শরিফের বাজারে গিয়েছিলেন কিছু কেনা-কাটা করার জন্য। এক জায়গায় তিনি দেখলেন, এক লোক কিছু দাস-দাসী নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিক্রি করছে, আব্দুল্লাহ দেখলেন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, একটা ছোট নয় বছরের কালো আফ্রিকান আবিসিনিয়ার মেয়ে। মেয়েটিকে দেখে উনার অনেক মায়া হলো, একটু রুগ্ন হালকা-পাতলা কিন্তু কেমন মায়াবী ও অসহায় দৃষ্টি দিয়ে তাঁকিয়ে আছে। তিনি ভাবলেন ঘরে আমেনা একা থাকেন, মেয়েটা পাশে থাকলে তার একজন সঙ্গী হবে। এই ভেবে তিনি মেয়েটাকে কিনে নিলেন।

মেয়েটিকে আব্দুল্লাহ ও আমেনা অনেক ভালবাসতেন। স্নেহ করতেন এবং তারা লক্ষ্য করলেন যে, তাদের সংসারে আগের চেয়েও বেশি রহমত ও বরকত চলে এসেছে। এই কারণে আব্দুল্লাহ ও আমেনা মেয়েটিকে আদর করে নাম দিলেন ‘বারাকাহ’।

তারপর একদিন আব্দুল্লাহ ব্যবসার কারণে সিরিয়া রওনা দিলেন। আমেনা এর সঙ্গে সেটাই ছিল উনার শেষ বিদায়। উনার যাত্রার দুই এক দিন পর আমেনা একরাতে স্বপ্নে দেখলেন, আকাশের একটা তারা যেন খুব আলো করে তার কোলে এসে পড়লো। পরদিন ভোরে তিনি বারাকাকে এই স্বপ্নের কথা বললেন। উত্তরে বারাকা মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার মন বলছে আপনার একটা সুন্দর সন্তানের জন্ম হবে’।

আমেনা তখনও জানতেন না তিনি গর্ভধারণ করেছেন কিন্তু কিছুদিন পর তিনি বুঝতে পারলেন, বারাকার ধারণাই সত্যি।

আব্দুল্লাহ আর ফিরে আসেননি, সিরিয়ার পথেই ইন্তেকাল করেছেন। আমেনার সেই বিরহ ও কষ্টের সময়ে, বারাকা ছিলেন একমাত্র সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। একসময় আমেনার অপেক্ষা শেষ হয় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে তাশরীফ আনলেন।

শেখ ওমর সুলাইমানের বর্ণনা অনুযায়ী, সর্বপ্রথম আমাদের নবীজি (সা.)-কে দেখার ও স্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়েছিল যে মানুষটির, সে হলো এই আফ্রিকান ক্রিতদাসী ছোট কালো মেয়েটি। আমাদের নবীজি (সা.)-কে নিজ হাতে আমেনার কোলে তুলে দিয়েছিলেন, এবং আনন্দ ও খুশিতে বলেছিলেন, ‘আমি কল্পনায় ভেবেছিলাম সে হবে চাঁদের মতো কিন্তু এখন দেখছি, সে যে চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’

এই সেই বারাকা। নবীজি (সা.) এর জন্মের সময় উনার বয়স ছিল মাত্র তের বছর। ছোটবেলায় আমেনার সঙ্গে শিশু নবীজির (সা.)  যত্ন নিয়েছেন, গোসল দিয়েছেন, খাওয়াতে সাহায্য করেছেন, আদর করে ঘুম পাড়িয়েছেন। ইন্তেকালের সময় আমেনা বারাকার হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন তার সন্তানকে দেখে শুনে রাখেন।

বারাকা তাই করেছিলেন। বাবা-মা দুজনকেই হারিয়ে, ইয়াতিম নবীজি (সা.) আসলেন দাদা আবদুল মোত্তালিবের ঘরে। উত্তরাধিকার সূত্রে নবীজি রাসূলুল্লাহ (সা.) হলেন বারাকার নতুন মনিব। তিনি একদিন বারাকাকে মুক্ত করে দিলেন, বললেন, ‘আপনি যেখানে ইচ্ছে চলে যেতে পারেন, আপনি স্বাধীন ও মুক্ত।’

সেই শিশুকাল থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা.) ক্রীতদাস প্রথাকে দূর করতে চেয়েছিলেন। বারাকা নবীজি (সা.)-কে ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না। রয়ে গেলেন। মায়ের ছায়া হয়ে পাশে থেকে গেলেন। এমনকি নবীজির (সা.) দাদা উনাকে বিয়ে দেয়ার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। উনার একই কথা, ‘আমি আমেনাকে কথা দিয়েছি, আমি কোথাও যাবো না।’

তারপর একদিন খাদিজা (রা) এর সঙ্গে নবীজির (সা.) বিয়ে হলো। বিয়ের দিন রাসূল (সা.) খাদিজা (রা.) এর সঙ্গে বারাকাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘উনি হলেন আমার মায়ের পর আরেক মা।’

বিয়ের পর রাসূল (সা.) একদিন বারাকাকে ডেকে বললেন, ‘উম্মি! আমাকে দেখাশুনা করার জন্য এখন খাদিজা (রা.) আছেন, আপনাকে এখন বিয়ে করতেই হবে।’ (নবীজি (সা.) উনাকে উম্মি ডাকতেন, নাম ধরে ডাকতেন না)।

তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) ও খাদিজা (রা.) মিলে উনাকে উবাইদ ইবনে জায়েদে (রা.) এর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন।

কিছুদিন পর বারাকার নিজের একটা ছেলে হলো, নাম আইমান। এরপর থেকে বারাকার নতুন নাম হয়ে গেলো ‘উম্মে আইমান’ (রা.)।

একদিন বারাকার স্বামী উবাইদ (রা.) মৃত্যু বরণ করেন, নবীজি (সা.) আইমান ও বারাকাহকে সঙ্গে করে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন এবং সেখানেই থাকতে দিলেন। কিছুদিন যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ একদিন বেশ কয়েকজন সাহাবিকে ডেকে বললেন, ‘আমি একজন নারীকে জানি, যার কোনো সম্পদ নেই, বয়স্কা এবং সঙ্গে একটা ইয়াতিম সন্তান আছে কিন্তু তিনি জান্নাতি, তোমাদের মধ্যে কেউ কি একজন জান্নাতি নারীকে বিয়ে করতে চাও?’

একথা শুনে জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) নবীজির (সা.) কাছে এসে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। রাসূলুল্লাহ উম্মে আইমান (রা.) এর সঙ্গে কথা বলে বিয়ের আয়োজন করলেন।

বিয়ের দিন রাসূল (সা.) জায়েদকে বুকে জড়িয়ে আনন্দে ও ভালোবাসায়, ভেজা চোখে, কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, 
‘তুমি কাকে বিয়ে করেছো, জানো জায়েদ?’
-হ্যাঁ! উম্মে আইমানকে জায়েদের উত্তর।
নবীজি (সা.) বললেন,
‘না, তুমি বিয়ে করেছো, আমার মা-কে।’

সাহাবিরা বলতেন, রাসূল (সা.)-কে খাওয়া নিয়ে কখনো জোর করা যেত না। উনি সেটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু উম্মে আইমান একমাত্র নারী, যিনি রাসূল (সা.)-কে খাবার দিয়ে ‘খাও’..’ খাও’.. বলে তাড়া দিতেন। আর খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাশে বসে থাকতেন। নবীজি (সা.) মৃদু হেসে, চুপ চাপ খেয়ে নিতেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) উনার দুধ মাতা হালিমা (রা.)-কে দেখলে যেমন করে নিজের গায়ের চাদর খুলে বিছিয়ে তার ওপর হালিমা (রা.)-কে বসতে দিতেন ঠিক তেমনি মদিনা শরিফে হিজরতের পর দীর্ঘ যাত্রা শেষে উম্মে আইমান (রা.) যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন নবীজি (সা.) উনার গায়ের চাদরের একটা অংশ পানিতে ভিজিয়ে, উম্মে আইমান (রা.) এর মুখের ঘাম ও ধুলোবালি নিজ হাতে মুছে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘উম্মি! জান্নাতে আপনার এইরকম কোনো কষ্ট হবে না।’

নবীজি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ওফাতের আগে সাহাবিদের অনেক কিছুই বলে গিয়েছিলেন। সেই সব কথার মধ্যে একটা ছিল, উম্মে আইমান (রা.) এর ব্যাপারে। কথাটি হলো, ‘তোমরা উম্মে আইমানে (রা.) এর যত্ন নেবে, তিনি আমার মায়ের মতো। তিনিই একমাত্র নারী, যিনি আমাকে জন্ম থেকে শেষ পর্যন্ত দেখেছেন। আমার পরিবারের একমাত্র সদস্য, যিনি সারাজীবন আমার পাশে ছিলেন।’

সাহাবিরা সেই কথা রেখেছিলেন। গায়ের রং নয়, এক সময়ের কোনো ক্রিতদাসী নয়, তার পরিচয় তিনিই।

-সংগৃহীত

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ
ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর