• বুধবার   ১০ আগস্ট ২০২২ ||

  • শ্রাবণ ২৬ ১৪২৯

  • || ১৩ মুহররম ১৪৪৪

মায়া সভ্যতার কেন্দ্রভূমিতে যেভাবে ছড়াচ্ছে ইসলামের আলো

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ৯ জুন ২০২২  

খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে ওঠা ম্যানুয়েল গোমেজের বর্তমান নাম মুহাম্মদ চেকেভ। তিনি নিজেকে মায়া সভ্যতার উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত মেক্সিকোর সোসিল উপজাতির সদস্য দাবি করেন। স্প্যানিশ সুফিবাদী মুসলিমদের মাধ্যমে যারা ইসলামের পরিচয় পেয়েছে এবং দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করছে। চেকেভ স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, ‘আমি মুসলিম, আমি সত্যটা জানি।

আমি দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি। রমজানে রোজা রাখি এবং মক্কায় সফর (হজ) করেছি। ’

মুহাম্মদ চেকেভ প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান অধ্যুষিত চিয়াপাস শহরের নুয়েভা স্পেরানজা এলাকায় বসবাস করেন। স্থানীয়ভাবে যা সান ক্রিস্টবাল ডে লাজ কাসাস নামে পরিচিত। এটাকে মায়া সভ্যতার কেন্দ্রভূমি বিবেচনা করা হয়। সেখানে তিনি ১৯ জন আত্মীয়ের সঙ্গে একটি যৌথ বাড়িতে বসবাস করেন এবং তাঁদের সঙ্গে কৃষিকাজ করেন। এখানে তিন শ সোসিল বসবাস করে, যারা মূলত মায়ানদের বংশোদ্ভূত। ইসলাম গ্রহণ করলেও তারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানী গাসপার মারকেকোর মতে, চিয়াপাসের তিন লাখ ৩০ হাজার সোসিল জনগোষ্ঠীর ধর্মান্তরের ইতিহাস আছে। খ্রিস্টীয় ১৬ শতকে মেক্সিকোতে স্প্যানিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষের ওপর জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তাদের কিছুসংখ্যক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে।

চেকেভের স্ত্রী নোরা ও পুত্রবধূ শারিফা ঘরেই অবস্থান করেন এবং তাঁরা লম্বা পোশাক পরিধান করেন এবং চুল ঢেকে রাখেন। নোরা একজন প্রটেস্ট্যান্ট আদিবাসী নেতার মেয়ে। যাঁকে ১৯৬১ সালে কয়েক ডজন পরিবারের সঙ্গে সান জুয়ান চামুলা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই অঞ্চলের কাছাকাছি একটি শহরে পিআরআই পার্টি ও ক্যাথলিজম আধিপত্য বিস্তার করেছিল। চেকেভের প্রতিবেশী সুসানা হার্নান্দেজ বলেন, ‘চামুলায় ক্যাথলিক অথবা পিআরআই পার্টির সদস্য না হওয়া অপরাধ ছিল। তারা ক্ষুব্ধ হয়েছিল কেননা প্রটেস্ট্যান্টরা অ্যালকোহল পান করা বন্ধ করে দিয়েছিল, যা ছিল স্থানীয় প্রধান ব্যবসা। ’

চেকেভ আদিবাসী নেতা ডমিংগো লোপেজের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের আগে যিনি একটি ‘অ্যাডভেন্টিস্ট’ চার্চের কর্মকর্তা ছিলেন। ডমিংগো ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন স্পেনের ‘মুরাবিতিন’ সুফি মুসলিমদের আহ্বানে। ১৯৯৩ সালে মেক্সিকোতে মুরাবিতিন ধারার প্রচার শুরু হয়। স্পেনে মুরাবিতিন ধারার সূচনা হয় মুসলিম শাসনামলে। ধারণা করা হয়, মুসলিম স্পেনকে রক্ষা করতে ‘আল-রাবিত’ নামে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এবং যার ভিত্তিতে তাকে ‘মুরাবিতুন’ শাসক বলা হয় তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই মুরাবিতিন নামটি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ‘দ্য মুরাবিতিন ওয়ার্ল্ড মুভমেন্ট’ নামে ১৯৬৮ সালে এই ধারার নবযাত্রা শুরু হয় স্কটিশ নওমুসলিম সুফি আবদুল কাদেরের মাধ্যমে। আত্মিক পরিশুদ্ধি, জাকাতভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচি, পৃথক মুসলিম অর্থব্যবস্থা, আমিরের অধীনে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনযাপন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি এই ধারার মূল প্রতিপাদ্য।

অরেলনিও পেরেজ একজন স্প্যানিশ ধর্মপ্রচারক, যিনি আমির মোস্তফা নামে পরিচিত। তিনিই চিয়াপাসে মুরাবিতিন কমিউনিটির প্রতিষ্ঠাতা। সোসিল আদিবাসীদের ভেতর ইসলাম প্রচারে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। মুহাম্মদ চেকেভও আমির মোস্তফার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। চেকেভ সোসিল উপজাতি ভাষায় কথা বলেন। তিনি স্প্যানিশ বলতে পারলেও লিখতে বা পড়তে পারেন না। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসে তিনি কোরআন পাঠ করতে শেখেন। চেকেভ মনে করেন এটা কোরআনের মুজিজা বা অলৌকিকত্ব। আমির মোস্তফার সহায়তায় চেকেভ ও তাঁর পরিবার ১৯৯৮ সালে হজ করেন। চেকেভের ভাষায়, ‘এটা ছিল স্বপ্নের মতো। আমরা সবাই সাদা পোশাক পরেছিলাম। সেখানে শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি বর্ণের মানুষ ছিল। কিন্তু বর্ণ সেখানে মুখ্য বিষয় নয়। আমরা সবাই ছিলাম সমান। ’ নোরা মক্কা সফর করে গর্বিত বোধ করেন।

স্প্যানিশ মুসলিমদের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করায় চিয়াপাসের মুসলিম স্থাপত্যগুলোতে আল-আন্দালুসের (মুসলিম স্পেন) প্রভাব লক্ষ করা যায়। সোসিল মুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করলে মায়া সভ্যতার ঐতিহ্যগুলো কখনো ত্যাগ করেনি। তারা মায়া ও ইসলামী সভ্যতার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে। চিয়াপাসের বেশির ভাগ মুসলিম সুন্নি এবং তারা ফিকহের ক্ষেত্রে মদিনাবাসীর আমল তথা মালেকি মাজহাবের অনুসরণ করে থাকে।

তথ্যঋণ : ইমাম গাজালি ডটঅর্গ

একাডেমিক ডটকম ও ইয়াহু নিউজ

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ