• শনিবার   ২৮ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪২৯

  • || ২৭ শাওয়াল ১৪৪৩

শেখ হাসিনা, একজন কান্ডারির গল্প

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২  

“যদি তুমি সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে চাও,

তাহলে আগে সূর্যের মতো পুড়তে হবে”

এ পি জে আবদুল কালাম আজাদ

সোনা নাকি পুড়ে পুড়েই খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। বঙ্গদেশে কথাটির বেশ প্রচলন। তবে এই কথাটি শুধু স্বর্ণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, হেমরূপী মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। আজ বলতে এসেছি তেমনি এক নিখাঁদ রত্নের কথা, যে রত্নের কারিগর আর কেউ নয়; স্বয়ং এই বাঙালির জাতির জনক, এই বঙ্গদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর পরিবার ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে হারিয়ে গেছে বটে; কিন্তু শিবরাত্রির সলতেটি যে এখন রয়ে গেছে সবার অগোচরে! বলাই বহুল্য, দয়াময় যদি চান, তবে দৈত্যের কী সাধ্য তার ব্যত্যয় ঘটায়। বঙ্গবন্ধু তার শাহাদাতের সময় যেমন সদ্য স্বাধীন এক নাজুক বাংলাদেশকে দেখে গেছেন, ঠিক তেমনি রেখে গেছেন তার এক খণ্ড হৃদয়কে। তার স্নেহময়ী কন্যাদ্বয় অলৌকিকভাবেই বেঁচে গিয়েছিলেন সেদিন। সময়ের পরিক্রমায় শত বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে যিনি আজ হয়ে উঠেছেন একজন দক্ষ কান্ডারি, একজন জাত যোদ্ধা। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধুর লেগ্যাসি শেখ হাসিনা।

বাংলার মানুষের কাছে যার রয়েছে তার বহু পরিচয়, বিশ্বের মানুষ তাকে চেনেন বহু উপাধি ও উপনামে। কখনো তিনি জোয়ান অব আর্ক, কখনো তিনি মাদার অব হিউম্যানিটি। আবার কখনো তিনি প্রাচ্যের নতুন তারকা। বিশ্ব সংস্থায় আবার তিনি পরিচিত শান্তি বৃক্ষ (পিস ট্রি) নতুবা চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ। কিন্তু এসব উপাধিকে ছাড়িয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর হাচু বা হাচিনা আর বাঙালির হৃদয়ে তিনি প্রোথিত হয়ে আছেন ‘শ্যাখের বেটি হাচিনা’ (শেখের বেটি হাসিনা) হয়ে, যা আর সব উপাধিকে নিঃসন্দেহে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে।

কিন্তু এই শেখের বেটির গল্পটি রচিত হয়েছে মাত্র কয়েক দশকে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠলেও, আশির দশকের আগে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন আর ১০ জন বাঙালি মেয়ের মতোই। বাংলা সাহিত্যের এই মেয়েটি ছিলেন মূলত শেখ ওয়াজেদের সহধর্মিণী, জয় আর পুতুলের মমতাময়ী জননী আর ছোট চার ভাইবোনের ‘হাচু আপা’। কণ্টকাকীর্ণ এই রাজনৈতিক ময়দানে তার আবির্ভাবের কথা আমরা তার মুখ থেকেই শুনতে পাই। “আমার ৭২ বছর জীবনের ৬০ বছরই কেটেছে রাজনীতিতে। স্কুল থেকে রাজনীতি শুরু করেছি, এখনো অব্যাহত। রাজনীতিতে কে কী করেছে অনেক ঘটনা নিজ চোখে দেখেছি।”

আজ তাই বলছি বাঙালির ফিনিক্স পাখিটির কথা। যে সবকিছু হারিয়ে ধ্বংসস্তূপ হতে আবারও নতুন প্রাণ সঞ্চার করে জেগে উঠেছেন, তার পিতার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করে সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। কারণ, ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতি শুধু জাতির জনককেই হারায়নি, হারিয়েছে তাদের স্বপ্ন ও ভরসার আশ্রয়স্থলকেও। ঘাতকের বন্দুক থেকে ২৪টি বুলেট শুধু শেখ মুজিবের বিশাল বুককেই রক্তাক্ত করেনি, রক্তাক্ত করেছে এই জাতির ভবিষ্যতকেও।

ক্ষণজন্মা এই বঙ্গকন্যা জন্মেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সেই নিভৃত পল্লী গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়, যখন ১৯৪৭ সালে বাঙালি মুসলমানরা বহু স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেখ হাসিনার ব্যক্তি-জীবনে তার গ্রাম টুঙ্গিপাড়া যে মায়াবি ভূমিকা রেখেছে, আমরা তার ছোঁয়া পাই তার প্রবন্ধ সাহিত্যে। স্মৃতির দখিন দুয়ার প্রবন্ধে তিনি শিল্পির নিপুণ তুলিতে মানসপটে এঁকেছেন তার শৈশবের দিনগুলো। এ যেন বাংলা সাহিত্যের আরেক বিভূতিভূষণ। যিনি অপু-দুর্গার নিশ্চিন্দপুর গ্রামকে তুলে এনেছেন টুঙ্গিপাড়ায়। মাঠ, ঘাট পুকুর পাড়, আমের মুকুল, ভাঁটফুল কী নেই তার বর্ণনায়। কিছুটা শুনি এই বর্ণনাতেই, “গ্রামের বড় তালাবের (পুকুর) পাড়ে ছিল বিশাল এক বরুই গাছ। ঝাঁকুনির ফলে লালের আভা লাগা সব থেকে টলটলে বরুইটা পুকুরের গভীরে পড়ত এবং কারো পক্ষে যখন সেটা তুলে আনা সম্ভব হতো না। তখন সেই বরুইটার জন্য মনজুড়ে থাকা দুঃখটুকু এখন ভুলতে পারলাম কই?” সেদিন কে জানত, এই লাল বরুই না পাওয়ার দুঃখে কাতর কিশোরীটিই হবে একদিন এই জাতির কান্ডারি!

একজন দেশপ্রেমিক সংগ্রামী প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা হয়েও তার রয়েছে অপর আরেকটি পরিচয়। তিনি একজন লেখিকা। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’, ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’, ‘দারিদ্র্য বিমোচন’, ‘কিছু ভাবনা’, ‘সাদা কালো’, ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’, ‘পিপল অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’এর মতো বেশকিছু গ্রন্থের প্রণেতা এই রাষ্ট্রনায়ক। বাংলার মুকুটমণি এই শেখের বেটি বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে আরও উঁচু সোপানে পৌঁছে দেবেন, বাংলার জনগণ সেই প্রত্যাশা করে।

লেখক :  ফাতেমা ইয়াছমিন মনি
সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ