• মঙ্গলবার   ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ ||

  • মাঘ ১৮ ১৪২৯

  • || ১০ রজব ১৪৪৪

সিরাজগঞ্জের ক্ষিরতলা হতে পারে আরেক কলসিন্দুর

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ৮ ডিসেম্বর ২০২২  

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামের নাম এখন কে না জানে। দেশ-বিদেশে কলসিন্দুর গ্রামটি এখন খুবই পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ায় কলসিন্দুর গ্রামের মেয়েরা বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের মধ্য দিয়ে কলসিন্দুরের মেয়েরা খ্যাতি এ বয়ে এনেছে। উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের মাহাতো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা–অধ্যুষিত ক্ষিরতলা গ্রামটি সুযোগ পেলে হয়ে ওঠতে পারে আরেক কলসিন্দুর।

ক্ষিরতলা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ। সম্প্রতি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ক্ষিরতলার বুরুজ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, জায়গাটি ইতিহাসের সাক্ষী; ঐতিহাসিক বিরাট রাজার বাড়ি ছিল ক্ষিরতলা গ্রামের বুরুজ নামের এই স্থান। রাজার বাড়ির পাদদেশে রয়েছে একটি সমতল মাঠ স্থানীয় লোকজন একে বুরুজ মাঠ বলেন। এই বুরুজ মাঠটিকেই ক্ষিরতলার ছেলেমেয়েরা বেছে নিয়েছে খেলার মাঠ হিসেবে; তারা নিয়মিত এখানেই খেলে। এই এলাকায় ফুটবল খেলার জৌলুশ জিইয়ে রেখেছে এই গ্রামের ছেলেরা। তাদের খেলার বেশ খ্যাতি রয়েছে পূর্ব থেকেই। এই ছেলেদের একটি প্রজন্ম কারও ছোট বোন, কারও মেয়ে, কারও নাতনির খেলার প্রতি প্রবল আগ্রহ। দেখার মতো খেলেও তারা।

কলসিন্দুরের সাফজয়ী আট ফুটবল–কন্যা সানজিদা আক্তার, মারিয়া মান্দা, মার্জিয়া আক্তার, শামছুন্নাহার সিনিয়র, তহুরা আক্তার, শিউলি আজিম, সাজেদা আক্তার ও শামছুন্নাহার জুনিয়র— তাঁদের মতোই ক্ষিরতলার আট কন্যা দারুণ খেলে সিরাজগঞ্জ জেলা দলে। সম্প্রতি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে (বালিকা অনূর্ধ্ব-১৭) নওগাঁ জেলা ও সিরাজগঞ্জ জেলার চূড়ান্ত খেলায় সিরাজগঞ্জ জেলার হয়ে এই গ্রামের ছয়জন ও তার পাশের গ্রামের দুজন অংশগ্রহণ করে। অনাদরে বেড়ে ওঠা  ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এই আট কন্যা হলো অয়ন্ত মাহাতো, অনামিকা ওঁরাও, সুস্মিতা মাহাতো, তিথি মাহাতো, অন্তরা মুরারী, শ্রাবন্তী মাহাতো, তিথি সিং ও রীতা মাহাতো। তারা আজ রাজশাহী বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন। অয়ন্ত মাহাতো সিরাজগঞ্জের হয়ে জয়সূচক একমাত্র গোলটি করে। পুরো খেলায় অনামিকা ওঁরাও, গোলরক্ষক সুস্মিতা মাহাতোসহ সবাই নৈপুণ্য দেখায়।

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মেয়েগুলোর ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি দারুণ ঝোঁক। তবে বাধা হয় তাদের খেলার সঙ্গীর অভাব। কোনো মেয়ে তাদের সঙ্গে খেলে না। শুরুটা হয় পাশের বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে খেলে। কাকা, ভাই ও প্রতিবেশীদের ডেকে ডেকে খেলে তারা। হঠাৎ তাদের নড়বড়ে দরজায় কড়া নাড়ে অপার সুযোগ, তৈরি হয় সম্ভাবনার। স্কুলে স্কুলে শুরু হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জাতীয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। মেয়েরা খেলতে পারে মেয়েদের সঙ্গে। তারা স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এখানে দারুণভাবে লেগে পড়ে। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসে সিরাজগঞ্জ জেলা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক প্রমীলা ফুটবল একাডেমি। তাদের প্রথম কাজ হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ফুটবলে আগ্রহী মেয়েগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের প্রতি সকালে একত্র করে দক্ষ কোচ দ্বারা প্রশিক্ষণ দেওয়া। সিরাজগঞ্জ জেলা ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক প্রমীলা ফুটবল একাডেমি এই কাজ বেশ দক্ষতার সঙ্গেই করে চলেছে। এ জন্য তারা ধন্যবাদ পেতেই পারে।

মেয়েগুলো পাশের বাড়িতে টেলিভিশনে খেলা দেখতে যায়, তাদের ইচ্ছা হয় টিভির সেই মেয়েগুলোর মতো করে  জার্সি ও বুট পরে লাল–সবুজের পতাকা বুকে ধারণ করে খেলার। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাহাতোদের একমাত্র অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুশান্ত কুমার মাহাতো ও স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ইমরুল হোসেন তালুকদারের নজর কাড়ে তাদের খেলা। তারা দুজনেই দুই দফায় গ্রুপের ৩৫ মেয়েকে উপহার দেন বল,  ট্র্যাকসুট, জার্সি, বুটসহ খেলার সামগ্রী। এগুলো পরে তাদের খেলোয়াড় খেলোয়াড় লাগে। প্রতিদিন সকালে স্থানীয় মাঠে একাডেমির উদ্যোগে চলে অনুশীলন। প্রতে৵ক মেয়েই বুকে গভীর স্বপ্ন লালন করে মাঠে খেলতে যায়। অনেক বাধাবিপত্তি তো আছেই; স্থানীয় লোকজন তো কেউ মেয়েদের খেলা পছন্দ করে না, মেয়ে হয়ে আবার খেলা; শুনতে হয় নানা কটু কথা। তারপরেও থেমে নেই এই মেয়েরা।

অয়ন্ত মাহাতোর বাবা স্থানীয় বাজারে মসলার দোকানদার পলিথিনের ছাউনি মাথার ওপর দিয়ে কখনো বসে, আবার কখনো দাঁড়িয়ে তাঁর দোকান পরিচালনা করেন। অনামিকা ওঁরাওসহ বাকি সব মেয়ের বাবা কেউ কৃষক, কেউ দিনমজুর। তাঁরা একবুক স্বপ্ন নিয়ে মেয়েদের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। তাঁদেরও শুনতে হয় নানান কথা। কোনো কথায় কান না দিয়ে মেয়েদের খেলার জন্য প্রস্তুত করে তুলছেন তিলে তিলে। তাঁরা বেশির ভাগ সময়ে মেয়েদের প্রোটিন–সমৃদ্ধ খাবার পর্যন্ত দিতে পারেন না, অনুশীলনের পর মেয়েগুলোর মুখের দিকে তাকানো যায় না। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এই মেয়েদের প্রয়োজন সঠিক পরিচর্যার। সেটি পেলে হয়তো এই মেয়েগুলো একদিন দেশের হয়ে গোল করবে; লাল–সবুজের পতাকা বিশ্ব দরবারে উঁচিয়ে ধরবে; উত্তরসূরি হবে সাফ অথবা নারী ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ের।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ