• বৃহস্পতিবার   ৩০ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১৬ ১৪২৯

  • || ৩০ জ্বিলকদ ১৪৪৩

মোহাম্মদ নাসিম একটি রাজনৈতিক ইনস্টিটিউটের নাম

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২২  

বাবা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজনীতি থেকে শুরু করে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সামনে থেকে অগ্ৰনী ভূমিকা পালন করেন, বাংলাদেশ সরকার গঠন এবং দক্ষতার সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পালন করেন। বাকশালের গঠিত হলে তিনি দলের জেনারেল সেক্রেটারি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ৩ নভেম্বর কারাভান্তরে অতি উৎসাহী সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী অফিসার গুলি করে ও বায়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর সুযোগ্য সন্তান প্রয়াত জননন্দিত জাতীয় নেতা মোহাম্মদ নাসিম। মোহাম্মদ নাসিম ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছাত্ররাজনীতি করার সময় আয়ুব বিরোধী আন্দোলন করার সময় পাবনা কারাগারে পিতার সাথে কারাবরণ করেন। দীর্ঘ দিন কারাভোগের পর ছাড়া পেয়ে আবার ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর, মোহাম্মদ নাসিম কে গ্ৰেফতার করেন। ১৯৭৫ সালে ৩ শোরা নভেম্বর ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে যখন স্বৈরাচারী জিয়া সরকারের সেনাবাহিনী হত্যা করেন তখন তাঁরা পিতার লাশ পর্যন্ত দেখতে পায়নি। মোহাম্মদ নাসিম ও তাঁর পরিবারের জন্য এই স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। উপায়ান্ত না দেখে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করে কিন্তু তিনি রাজনীতি থেকে পিছু হটেন নি। সেখানে কস্টের সাথে জীবন অতিবাহিত করেন, কলকাতায় আশ্রয় নেওয়া নেতা কর্মীদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দেশের রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকেছেন।

বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা যখন ১৯৮১ সালের ১৭ মে নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফিরে আসেন তখন মোহাম্মদ নাসিম কে বঙ্গবন্ধু কন্যা যে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি গুরুত্বের সাথে পালন করেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির ১ নং সদস্য, সেই সময়ে আওয়ামী লীগের একমাত্র সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব পালন কালে সারা বাংলাদেশে নৌকা পাগল জনগণ কে একটি পতাকাতলে এনে সংগঠিত করেন এবং আমি মনে করি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন সেই পরিশ্রমের ফসল । সাংগঠনিক সম্পাদকদের দায়িত্ব পালনকালে তিনি দিন রাত নিরলসভাবে পরিশ্রম করে গ্ৰাম থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় কাউন্সিল এর মাধ্যমে কমিটি করে সারা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেন। ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত ক্ষমতায় আসলে মোহাম্মদ নাসিম প্রতিটি আনন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

শেখ হাসিনার নির্দেশে তাঁর সাহসী নেতৃত্বে ২০০৬ সালে বিএনপি নিশ্চিত পরাজয় জেনে, নির্বাচন না দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে সেনাশাসিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ১১ /১ তে সেনাবাহিনীর হাতে মোহাম্মদ নাসিম গ্ৰেফতার হন। ২০০৮ সালে ২৯ শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার আবার সরকার গঠন করে। ২০১২ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন।দেশে রাজনৈতিক সংকটের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা মোহাম্মদ নাসিম কে ১৪ দলের সমন্বয়কের দায়িত্ব দেন তিনি ১৪ দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর সারা বাংলাদেশে ১৪ দলকে রাজনীতিতে সক্রিয় করে তোলেন ।

২০১৪ সালে ৫ ই জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি জামায়াত সারা বাংলাদেশে যে আগুন সন্ত্রাস শুরু করে, ১৪ দলকে সাথে নিয়ে সারা বাংলাদেশে উল্কার বেগে ছুটে সেই আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে ২০১৪ সালের ৫ ই জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে। ২০১৪ সালে মোহাম্মদ নাসিম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্ৰহণের পর ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করে, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছেন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে মোহাম্মদ নাসিম পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের কর্মী সভা শেষে ঢাকা ফেরার পথে পাবনার একজন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা তাকে অনুরোধ করলেন বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চান। মোহাম্মদ নাসিম সাথে সাথে না করে দিলেন এবং তিনি বললেন যে আমার কর্মীর পেটে চাকু মেরেছে, আমার কর্মীর বুকে গুলি করেছে এবং আমার ভাইয়ের রক্তে যার হাত রক্তাক্ত তার সাথে আমি কিভাবে হাত মিলাব। আওয়ামী লীগের এতো দুর্দিন আসেনি যে তাদের আওয়ামী লীগে যোগদান করাতে হবে। এটাই মোহাম্মদ নাসিম।

একদিন কাজিপুর কোন এক কলেজের অধ্যক্ষ তিনি নেতার কাছে আসলেন আমি পাশে দাঁড়িয়ে অধ্যক্ষ সাহেব বললেন, স্যার আমার কলেজে বর্তমান যে ভবন সে তুলনায় শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেশি শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা করতে পারছি না। ভবনের ঊর্ধ্বমুখী ২/৩ ছাদ করলে কলেজ এর সমস্যা সমাধান হতো। নেতা সাথে সাথে বললেন আপনি একটা ডিও লেখেন আমি স্বাক্ষর করে দিচ্ছি হয়ে যাবে। অধ্যক্ষ সাহেব বললেন স্যার আমি ডিও লিখতে পারি না। তখন মোহাম্মদ নাসিম নিজে হাতে ডিও লিখে সীল স্বাক্ষর করে তাঁর পিএস কে ফোন করে দিলেন, আমার কলেজের অধ্যক্ষ কাল সকালে আপনার কাছে যাবে আপনি অধ্যক্ষ সাহেবকে নিয়ে শিক্ষা সচিব এর কাছে এই ডিও দিয়ে রিসিভ কপি নিয়ে আসবেন। কতোটা উদার মনের মানুষ হলে একজন জাতীয় নেতা হয়েও নিজ হাতে ডিও লেখেন এখন রাজনৈতিক ইতিহাসে এটা বিরল ঘটনা। মোহাম্মদ নাসিম সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে ঠাই করে নেন এবং মানুষ তাকে ভালোবেসে নাসিম ভাই বলে ডাকতেন।

মোহাম্মদ নাসিম সাহেবের একটা জিনিস খুব লক্ষনীয় কোন মানুষ সমস্যা কথা বললে সাথে সাথে তিনি সমাধানের চেষ্টা করতেন। এভাবেই তিনি বিভিন্ন জেলা থেকে আগত সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান করেন। এটাই ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। রাজনৈতিক সংকট, শিক্ষা, দুর্যোগ ও জাতীয় সমস্যায় মোহাম্মদ নাসিম অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সমাধান করতেন। ২০২০ সালের ২৩ মার্চ সারা বাংলাদেশ সরকার লক ডাউন ঘোষণা করলেন কেউ বাসা থেকে বের হয় না কিন্তু মোহাম্মদ নাসিম সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে চিকিৎসা থেকে শুরু করে ত্রাণ পৌঁছে দিতেন শ্রমিক শ্রেণির মানুষের ঘরে ঘরে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলে ২০২০ সালে ১৯ মে সিরাজগঞ্জবাসীর স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করে পিসিআর ল্যাব স্থাপন করেন। হয়তো সিরাজগঞ্জ থেকেই তিনি করোনা ভাইরাস(COVID-19) নামক মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। ২৮ মে তিনি বাংলাদেশে স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হন ২০২০ সালে ১৩ জুন সকাল ১১:১০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন। রাজপথের অকুতোভয় সৈনিক সাধারণ মানুষের আশার বাতিঘর মানুষের সেবার মাধ্যমেই নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।


তাইতো তার মৃত্যু পর পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেছিলেন ‘আজ আমি আমার এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাকে হারালাম’ শেখ হাসিনা। জানি হাজার বছরেও জাতির এই ক্ষতি পূরণ হবে না, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কাছে আকুল আবেদন দুনিয়াতে যেমন তুমি তাকে সম্মানিত করেছো, আখিরাতেও তাকে সম্মানিত করো, আমিন।

লেখক,
মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান
প্রশাসনিক কর্মকর্তা
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
১৩ ই জুন ২০২২ ইং

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ