• শনিবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৯ ১৪২৮

  • || ১৭ সফর ১৪৪৩

ঐতিহ্যের কাটাখালিতে যমুনার স্বচ্ছ পানি

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১  

শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা খালটিতে প্রবাহিত হবে স্বচ্ছ নীল জল। তাতে সাঁতার কাটবে বালকের দল, চলবে ছোট নৌকা, নানা প্রজাতির মাছে ভরে উঠবে কাটাখালি। বিকেল হলেই বিনোদনপিয়াসী মানুষের পদচারনায় মুখর থাকবে খালের দুই পার।  

শহরকে দিখণ্ডিত করা ঐতিহ্যবাহী কাটাখালিকে ঘিরে এমন অনেক স্বপ্ন সিরাজগঞ্জবাসীর। অথচ সেই কাটাখালি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে অপরিচ্ছন্ন নোংড়া শহরে রূপ নিয়েছিল।

অবশেষে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছোট নদী ও খাল পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় কাটাখালি খাল সংস্কারের পর স্বপ্ন পূরণে এক ধাপ এগিয়ে গেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ৫৯ বছর পরে কাটাখালিতে প্রবেশ করেছে যমুনার পানি। ফলে আবর্জনার ভাগাড় কাটাখালিতে প্রবাহিত হচ্ছে স্বচ্ছ পানি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৮০৩ সালে পাটের ব্যবসার জন্য বৃটিশ নীলকুঠিয়ালরা সিরাজগঞ্জ শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বড়াল নামে অতিপ্রাচীন মরা খালটি পুনরায় কেটে সচল করে। তখন কাটাখালি নামে পরিচিত হয় এটি। এর উভয়প্রান্ত যমুনার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। এ খালটি দিয়ে নৌকা ও ছোট জাহাজে করে পাটসহ বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করা হতো।  ১৮৮২ সালে ইংরেজ মহুকুমা প্রশাসক (এসডিও) মি. বিটসন বেল শহরকে উপর থেকে দেখার জন্য নির্মাণ করেন ৩০ ফুট উঁচু দৃষ্টিনন্দন একটি সেতু। বাংলার তৎকালীন ছোটলাট স্যার আলফ্রেড ইলিয়ট সাহেবের নামানুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয় ইলিয়ট ব্রিজ। স্থানীয়রা এটিকে বড়পুল নামেই চেনেন। খুঁটিবিহীন ১৮০ ফুট লম্বা ও ১৬ ফুট চওড়া সেতুটি এখনও স্বকীয়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। স্টুয়ার্ড হার্টল্যান্ড নামে এক বৃটিশ প্রকৌশলীর পরিকল্পনায় সেই সময় এ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা।  

এদিকে ১৯৬২ সালে কাটাখালির বাঐতারা প্রান্তের স্লুইচ গেটের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। পরে যমুনায় বাঁধ দেওয়ার কারণে অপর মুখটিও বন্ধ হয়ে কাটাখালির পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়। ধীরে ধীরে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয় এ খালটি। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে খালের বিভিন্ন জায়গায়। সেই সঙ্গে চলতে থাকে কাটাখালির দুই পাড়ে দখলবাণিজ্য। বেশ কয়েকবার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে কাটাখালি সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু আবর্জনার ভাগাড় থেকে মুক্ত হয়নি কাটাখালি।  

২০১৯ সালে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এটির পূণঃখনন শুরু করে এবং বাঐতারা এলাকায় স্লুইচ গেটের মাধ্যমে যমুনার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। সম্প্রতি যমুনায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্লুইচ গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে কাটাখালিতে প্রবেশ করেছে যমুনার স্বচ্ছ পানি। কাটাখালি হয়েছে দুর্গন্ধমুক্ত। ফলে এ খালটি নিয়ে নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন শহরবাসী।  

কলেজছাত্র আরিফুল, আদনান ও মিতুলসহ অনেকেই বলেন, কাটাখালির উপরে তিনটি দৃষ্টিনন্দন সেতু করা হয়েছে। এছাড়া পুরনো ইলিয়ট ব্রিজও রয়েছে। বিকেলে অবসরে ওইসব সেতুতে আমরা সময় কাটাই। কিন্তু কাটিখালির নোংড়া-আবর্জনা ও গন্ধে সেখানে দাঁড়ানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। কাটাখালিতে যমুনার পানি ঢোকার পর আর গন্ধ নেই। তবে এ পানিপ্রবাহ যাতে অব্যাহত থাকে, কর্তৃপক্ষ যেন সে ব্যবস্থা নেয়।

আমিনুল, হাবিব, মোস্তফা, আবু তালেবসহ বেশ ক’জন রিকশাচালক বলেন, কাটখালিতে ময়লার গন্ধে মুক্তিযোদ্ধা গলি সড়ক আর মেছুয়া বাজার রোড দিয়ে রিকশা নিয়ে যাতায়াত করাও মুশকিল ছিল। এখন আর গন্ধ নেই।  

বড় বাজারের ইলেকট্রিক পণ্যের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন বলেন, কাটাখালিতে যমুনার নতুন পানি দেখে আমাদের অনেক ভালো লাগছে। ক’দিন ধরে আর দুর্গন্ধ পাওয়া যায় না।  

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা খ.ম. আখতার হোসেন বলেন, কাটাখালি দিয়ে যমুনার পানি প্রবেশ করায় আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা একমাত্র খালটিকে তার পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ খালে যাতে পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।   

সিরাজগঞ্জ স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ডা. জহুরুল হক রাজা বলেন, কাটাখালি সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহ্য। পরিকল্পনাহীনতায় এটি আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেষ্টায় দীর্ঘদিন পর এ খালটির আবার খনন করা হয়েছে। প্রবেশ করেছে যমুনার পানি। পৌর কর্তৃপক্ষও ওয়াকওয়ে ও তিনটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করেছে। পাউবো ও পৌরসভার সমন্বয়ে এটিকে বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তরের দাবি জানাই। 

সিরাজগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তা বলেন, আমরা এরই মধ্যে কাটাখালি দখলমুক্ত করে এর দু পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিয়েছি। এ খালটির সৌন্দর্য্য বাড়াতে আরও বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। নেটের বেড়া স্থাপন, বৃক্ষরোপণ, শুকনো মৌসুমে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে পানি প্রবাহ সচল রাখা এবং পাশে একটি রেস্টুরেন্ট স্থাপন করা হবে।  

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, দেশের ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালে কাটাখালি খনন শুরু হয়। সদর উপজেলার বাঐতারা থেকে শহরের মিরপুর হয়ে সিরাজগঞ্জ সরকারী কলেজের পাশ দিয়ে বাহিরগোলা ও চন্দ্রকোণা হয়ে ইছামতি নদী নদীতে এটি মিলিত হয়েছে। ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২২ কিলোমিটার এ খালটির খননকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বাঐতারা স্লুইচ গেট খুলে দিয়ে যমুনার পানি প্রবেশ করানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন পর স্বস্তি ফিরেছে সিরাজগঞ্জবাসীর মনে।  

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, কাটাখালির বাঐতরা চ্যানেল দিয়ে যমুনার পানি প্রবেশ করেছে। এ খালের উত্তরে গয়লা এলাকায় যমুনার সঙ্গে সংযুক্ত আরও একটি মুখ ছিল। যেটি শহর রক্ষা বাঁধ দেওয়ার কারণে বন্ধ হয়েছে। আমরা সেই চ্যানেলটিও সচল করে খাল ও যমুনার সংযোগস্থলে একটি রেগুলেটর স্থাপনের জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এছাড়া কাটাখালির কাঠেরপুল অংশের পশ্চিমে আরও একটি পুরনো মরা চ্যানেল খনন করে সচল করা হবে। যেটি খোকশাবাড়ি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনের খালে মিলিত হবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কাটাখালিতে সব সময়ই স্বচ্ছ পানি প্রবাহ থাকবে।  

তিনি বলেন, আমরা কাটাখালির যৌবন ফিরিয়ে দিতে কাজ করছি। শহরবাসীকে সচেতন থাকতে হবে কোনোভাবেই যেন এতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা না হয়। স্বচ্ছ পানি প্রবাহ ধরে রাখতে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছাড়া হয়েছে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ