• মঙ্গলবার   ১৬ আগস্ট ২০২২ ||

  • ভাদ্র ১ ১৪২৯

  • || ১৯ মুহররম ১৪৪৪

ঢাবি’র প্রমা এখন ক্যাম্পাসের বিরিয়ানিওয়ালি

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২২  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে গেলে ছোটখাটো অনেক খাবারের দোকানই চোখে পড়ে। কিন্তু ছোটখাটো এই দোকানগুলোর মাঝে ছোট্ট টেবিলে বিরিয়ানির প্যাকেটের পসরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী বিক্রেতা দৃষ্টি আকর্ষণ করছে প্রায় সবার। সুস্বাদু হোমমেড এই বিরিয়ানির চাহিদা আশেপাশের অন্যান্য দোকানের চেয়ে অনেক বেশি। 

সংস্কার আর প্রথাকে তোয়াক্কা না করা এই নারী বিরিয়ানি বিক্রেতার নাম প্রমা সরকার। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে  তিনি এখন ‘বিরিয়ানিওয়ালি’ নামেই পরিচিত। ‘বিরিয়ানিওয়ালি’র জনপ্রিয়তায় প্রমা সরকারের এই কাগুজে নাম অনেকটাই চাপা পড়েছে।

নেত্রকোনার মেয়ে প্রমা বর্তমানে পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারে। নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং হলিক্রস কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করে ২০২০ সালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রমার বাবা রণধীর সরকার নিতাই একজন প্রবাসী এবং মা জলি দাস সরকারি চাকরিজীবী। পরিবারের সাথে নেত্রকোনাতেই বেড়ে ওঠেন প্রমা।

দুই-ভাই বোনের মাঝে বড় প্রমা ২০১৭ সালে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় আসেন এবং ভর্তি হন হলিক্রস কলেজে। ঢাকায় আসার পর পরিবারের কাছ থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সে হাত খরচের জন্য পেতেন। মূলত তখন থেকেই তার মনে হতে থাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যেই ভাবা সেই কাজ। স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্দেশ্যে কলেজে থাকা অবস্থাতেই টিউশনি শুরু করেন। জুনিয়র এমনকি সহপাঠীরাও ছিলেন প্রমার ছাত্র। এভাবে দু বছর কাটার পর ২০১৯ সালে হোস্টেলের এক বড় আপুর থেকে প্রমা শেখেন কাপড়ের ব্লক বাটিক করার কাজ।

তারপর ফেসবুকে পেইজ খুলে নিজস্ব ডিজাইনে জামা-কাপড় তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। প্রমার সাথে কথা বলে জানা যায়- ঈদের সময় তার অনলাইন শপ থেকে জামা-কাপড় বিক্রি করে সে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করেছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার চাপের কারণে প্রমা তার শখের অনলাইন বুটিক শপকে বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি।

এইচএসসি এবং ভর্তিযুদ্ধের মত কঠিন যাত্রা প্রমা কৃতিত্বের সাথে শেষ করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ভাল হওয়ার কারণে সে অনেক টিউশনের প্রস্তাব পেতে থাকেন। প্রমা জানান- টিউশনির পাশাপাশি সে অনেক কোচিং সেন্টারে কোর্স ইন্সট্রাক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০২০ সালে সে প্রমা সরকার নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলেন।

সেখানে সে নিয়মিত শিক্ষা ও অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও আপলোড করতে থাকেন। বর্তমানে তার ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা প্রায় পনেরো হাজার। ইউটিউব চ্যানেলের সুবাদে শিক্ষক হিসেবে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তার টিউশনির সংখ্যাও বাড়তে থাকে। প্রমা জানান- ২০২০ সালের মার্চে করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের আগ পর্যন্ত টিউশনি করিয়ে সে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা আয় করেন। পরবর্তীতে করোনাকালীন স্থবিরতা তাকে নতুন করে ভাবার অবকাশ করে দেয়। সে ভাবতে থাকে টিউশনি করে অর্থ উপার্জন সম্ভব হলেও নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা সম্ভব না।

নিজস্ব পরিচয় তৈরি ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চিন্তা থেকেই ফুড বিজনেসের বিষয়টি মাথায় আসে প্রমার। করোনার বিশাল অবসরে সে ইউটিউব দেখে শিখতে থাকেন বিভিন্ন রকম রান্না। অনেক রান্না শিখলেও প্রমার রান্না করা বিরিয়ানিই পরিবারসহ বন্ধুবান্ধব বেশি পছন্দ করেন। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে প্রমা ঢাকায় ফিরে আসেন এবং চিন্তা করতে থাকেন তার রান্না করা বিরিয়ানি যেহেতু সবাই পছন্দ করছেন তাহলে এই বিরিয়ানি মানুষের কাছে পৌঁছালে ভালো সাড়া পাওয়া যাবে। সেই চিন্তা অনুযায়ী প্রমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বিরিয়ানি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। ক্যাম্পাসেই কেন বিরিয়ানি বিক্রি করছেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রমা বলেন- ক্যাম্পাসের চেয়ে নিরাপদ কোনো জায়গা আসলে নেই।

এছাড়া ক্যাম্পাসে হোমমেড খাবারের চাহিদাও বেশ। এরপর প্রমা ফেসবুকে একটি পেইজ খোলেন এবং তার উদ্যোগের নাম দেন বিরিয়ানিওয়ালি নিজেকে বিরিয়ানিওয়ালি হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে গর্বের সাথে প্রমা বলেন- ‘আমাদের সমাজে খেটে খাওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো কেবল পুরুষ করবে এমন চিন্তা করা হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখি এই খেটে খাওয়া শ্রেণীর নামের পিছনেই কেবল ওয়ালা শব্দটি লাগানো হয় এবং এটিই প্রচলিত। আর আমি যেহেতু এত স্ট্রাগল করে আমার উদ্যোগ হিসেবে বিরিয়ানি বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাহলে আমিতো বিরিয়ানিওয়ালিই’।  

প্রথমদিন প্রমা নিতান্তই খেলার ছলে বিরিয়ানির প্যাকেট সাজিয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে প্রথমদিনেই তার বিরিয়ানি মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। প্রমা তার উদ্যোক্তা জীবনের জার্নি সম্পর্কে বলেন-‘ নারী হয়ে বিরিয়ানি বিক্রির যাত্রাটা মোটেই সোজা ছিল না। পুরুষের থেকে নারীর শারীরিক গঠন ভিন্ন। নারীদের হাড়ের গঠন পুরুষদের তুলনায় পাতলা। তাই খেটে খাওয়া কাজগুলো মেয়েদের পক্ষে করাটা একটু কঠিন। সেখান থেকে সব ব্যাপার গুছিয়ে এতদূর আসতে বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে।

তিনি আরো বলেন- নারী হিসেবে আমি আমার স্বপ্নটাকেই বড় করে দেখেছি। নিজেকে নারী হিসেবে না দেখে আমি নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখেছি এবং মানুষ হিসেবে আমি আমার স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়েছি’। যে সকল নারী উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন কিন্তু সামাজিক বাস্তবতাকে ভয় পাচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে প্রমা বলেন - ‘যেই কাজটা আসলে আমরা শুরু করতে চাচ্ছি তা শুরু করে দিতে হবে। কারণ ভাবতে থাকলে শুধু ভাবনাই হবে কোনো কাজ আর হবে না। তাই মাথায় প¬্যান আর মনে সাহস থাকলে নির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করে অবশ্যই আমাদের নিজের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে হবে’।

প্রমা তার সাধের উদ্যোগ 'বিরিয়ানিওয়ালি' কে নিয়ে যেতে চান বহুদূর। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রমা বলেন - আমার 'বিরিয়ানিওয়ালি' হয়তো আজ ছোট একটি চারাগাছ। তবে এই চারাগাছ একদিন বড় হয়ে আমাকে ছায়া দিবে, আমার পরিবারকে ছায়া দিবে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করবে।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ
আলোকিত সিরাজগঞ্জ