সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১

জনপ্রিয় হচ্ছে ঘরে বসে কোরবানি

জনপ্রিয় হচ্ছে ঘরে বসে কোরবানি

সংগৃহীত

কোরবানির ঈদ ঘিরে সারা দেশেই পশুর হাটগুলো এখন জমজমাট। পশু পছন্দ করা, কেনাবেচা চলছে সমানতালে। তবে সবাই যে হাটে যেতে পারেন তা নয়।

হাটে যাওয়া, ঘুরে ঘুরে গরু পছন্দ করা, দরদাম করে যথার্থ দামে গরু কেনা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। এরপর গরু নিয়ে বাসা ফেরার বিরাট ঝক্কি কে পোহাতে চায়। এ ছাড়া বাসায় গরু রাখা এবং ঈদের দিন কোরবানি দিয়ে কাটাকুটির ঝামেলা তো আছেই। তাই অনেকে এখন অনলাইনে কিংবা খামারে গিয়ে গরু দেখে পছন্দ করছেন। খামারেই কোরবানি করে মাংস বাসায় নিয়ে আসছেন। আর দিনে দিনে এভাবে বাসায় বসে কোরবানি দেওয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মশিউর রহমান বলছিলেন, ঈদুল আজহার আগে হাটে গিয়ে পশু কিনে আনুষঙ্গিক সব কাজ করে তার পক্ষে কোরবানি দেওয়া কঠিন। তাই তিনি নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের সহায়তা নিয়েছেন। গত বছরের মতো তিনি এখান থেকে একটি গরু কিনেছেন। তার কেনা গরুটির ওজন ২৬০ কেজি। যার মূল্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু ফার্ম থেকে জবাই করে বাসায় পাঠানো পর্যন্ত আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে তার কেনা গরুর দাম পড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।

মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাট থেকে পশু কেনার অভিজ্ঞতা আছে। তাতে প্রচুর ঝামেলা। বিশেষ করে হাটে আসা গরু-ছাগল-মহিষের অধিকাংশই মোটাতাজাকরণ পদ্ধতিতে বড় করা। এতে করে ত্যাগের কোরবানির পশু কিনে ঠকে যেতে হয়।

তিনি আরও বলেন, কোরবানির পশু কিনে বাসায় আনার পর পশুর দেখাশোনা করা ও জবাই করা পর্যন্ত একটা চিন্তা থাকে। পশু জবাই ও কাটাকাটির জন্য লোক জোগাড় পর্যন্ত অনেক ঝামেলা হয়। তাই গত বছর থেকে কোরবানির জন্য নর্থ বেঙ্গল ডেইরির সহায়তা নিয়েছি। কোম্পানির খামার থেকে পশু পছন্দ করে তা জবাই পর্যন্ত একটা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। তাছাড়া তারা শরিয়তের নিয়ম মেনে পশু কোরবানি দিয়ে খামার কর্তৃপক্ষ বাসায় মাংস পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এসব কারণে টানা দুই বছর পশু জবাই দিতে খামার কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা রেখেছি।’

নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের কর্ণধার ইঞ্জিনিয়ার মো. মকবুল হোসেন। তার খামারটি রাজধানীর ভাটারা থানার ছোলামাইদ এলাকায়। খামারটির যাত্রা শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের দিকে। প্রথম অবস্থায় দুধের খামার গড়ে তোলার জন্য চারটি গাভী নিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে কোরবানি কেন্দ্র করে পশু লালনপালন শুরু করেন। গ্রাহক সুবিধার জন্য ২০১৫ সাল থেকে ঘরে বসে কোরবানির প্রচলন শুরু করে খামার কর্তৃপক্ষ। চলতি বছর এ খামারের প্রায় ২০০টি গরু কোরবানির জন্য বিক্রি হয়েছে। এসব পশু খামারেই কোরবানি হয়। গ্রাহকের উপস্থিতিতেই জবাই ও কাটাকাটি করা হয়।

ইঞ্জিনিয়ার মকবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সেবা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রথম বছর পাঁচটি গরু কোরবানির জন্য বিক্রি হলেও চলতি বছর প্রায় ২০০টি গরু বিক্রি হয়েছে। সব গরু খামারে জবাই করে গ্রাহকের বাসায় মাংস পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

গরু জবাইর প্রক্রিয়া নিয়ে জানতে চাইলে এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘কোরবানির পশু জবাইর জন্য আমাদের নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। আমাদের এখানে ঈদের জামাত হয়। যে ইমাম ঈদের নামাজ পড়ান তাকে দিয়ে গ্রাহকের উপস্থিতিতে কোরবানির পশু কোরবানি করা হয়। এরপর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সব বিধি মেনে নির্দিষ্ট কসাইর মাধ্যমে গরু কাটাকাটি করা হয়।’

প্রায় একই কথা বলেছে আদর্শ প্রাণিসেবা লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যারা মূলত খামার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি কোরবানির জন্য পশু লালনপালন করে অনলাইনে বিক্রি করে। এমনকি চাইলে কেউ কয়েক ভাগেও পশু কিনতে পারেন তাদের কাছ থেকে। ঈদের দিন তারাই মাংস ভাগ করে ক্রেতাদের কাছে দিয়ে দেয়।

আদর্শ প্রাণিসেবা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফিদা হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনলাইনের যেকোনো কিছু ক্রয়ের ক্রেতাই কম। আবার পশুর মূল্যও অনেক। তাই ক্রেতারা অনলাইনে দেখে পশু কেনার সিদ্ধান্ত নিতেও চান না। তারপরও কিছু ক্রেতা পশুর হাটের ভিড়, ময়লা, গন্ধ উপেক্ষা করে পশু কিনতে চান। তারা অনলাইনে পশু দেখে অর্ডার দেন। বিশেষ করে ঢাকার ক্রেতাদের অংশগ্রহণ রয়েছে অনলাইনে পশু কেনার ক্ষেত্রে। দেখেশুনে বিশ^স্ত অনলাইন থেকে পশু ক্রয় করলে ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে এড়াতে পারবেন।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়াও ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও পশু কেনাবেচা দিনে দিনে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

মূলত করোনাভাইরাস শুরু হলে ২০২০ সাল থেকে দেশে অনলাইনের ব্যবহার বাড়ে। বিশেষ করে খাবার সরবরাহসহ নিজের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার শুরু হয়। তারই অংশ হিসেবে ডেইরি ফার্মগুলো অনলাইন হাট কিংবা ফেসবুকের মতো বড় প্ল্যাটফর্মকে বেছে নেয়।

ওই বছরই সরকারি খামারিদের নিয়ে ডিজিটাল হাট চালু করে। এ উদ্যোগে যুক্ত ছিল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, এটুআই, আইসিটি বিভাগ, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ই-ক্যাব ও বিডিএফএ। প্রথম বছরেই এ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ২৭ হাজার পশু বিক্রয় হয়েছিল। পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালে ৩ লাখ ৮৭ হাজার কোরবানির পশু বিক্রির মাধ্যমে রেকর্ড গড়ে এই ডিজিটাল হাট, যার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে এই প্ল্যাটফর্ম ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কারে ভূষিত হয়। এরপর অর্থাৎ ২০২২ সালে করোনার প্রকোপ একেবারেই কম থাকার পরও এই প্ল্যাটফর্মে প্রায় ৬০ হাজার পশু বিক্রি হয়েছিল। চলতি বছরও ডিজিটাল এই প্ল্যাটফর্মে কোরবানি পশু কেনাবেচনা হচ্ছে। তবে গত বছর এই প্ল্যাটফর্মে পশু বিক্রি আরও কমে আসে। ওই বছর মোট পশু বিক্রি হয়েছে ৫৬ হাজার ৮২১টি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৭ হাজার ৭৫৭ ও ছাগল-ভেড়া ৯ হাজার ৬৪টি। এ বছর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হিসাব পাওয়া যায়নি।

তবে ঘরে বসে কোরবানির পশু কেনা ও মাংস বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সেবার পরিসর বেড়েছে। চলতি বছর ২০ থেকে ২৫ ডেইরি ফার্ম ও গরুর খামার এ সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে বেঙ্গলমিট সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটি এ বছর দশমবারের মতো অনলাইন কোরবানি হাট চালু করেছে। অর্ডার করা গরু, ছাগল ও ভেড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধির তত্ত্বাবধানে কোরবানি সম্পন্ন করে এবং কোল্ড চেইন বজায় রেখে সরবরাহ করবে তারা।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি ইমরান হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও খামারিদের নিয়ে ডিজিটাল হাট গড়ে ওঠে। সে বছর ভালো সাড়া পেলেও পরে ডিজিটাল হাটের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই হাট সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে ঝামেলাহীন কোরবানির পশু ক্রয়ে মানুষের আস্থার আরেক নাম হয়ে উঠত ডিজিটাল হাট।’

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ১ কোটি ৩০ লাখ কোরবানি যোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ৭১৬টি গরু-মহিষ, ৭৬ লাখ ১৭ হাজার ৮০১টি ছাগল-ভেড়া ও ১ হাজার ৮৫০টি অন্যান্য পশু রয়েছে। এবার চাহিদা পূরণ করে আরও প্রায় ২৩ লাখ কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। অর্থাৎ আসন্ন কোরবানির ঈদে দেশে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ পশু কেনাবেচা হবে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অনলাইন কন্ট্রোলরুম সমন্বয় কর্মকর্তা আলী রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত করোনার বছর যখন মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়ে, তখন থেকেই অনলাইনে পশু বেচাকেনা শুরু হয়। এর পরের বছরগুলোতে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।’

সূত্র: দেশ রূপান্তর

সর্বশেষ: