শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

সংবিধান রক্ষা করেই নির্বাচনকালীন সরকার

সংবিধান রক্ষা করেই নির্বাচনকালীন সরকার

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সবখানেই আলোচনা চলছে। এখানে রাজনৈতিক দল বা মহল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা পাঁচ বছর যে সরকার দায়িত্ব পালন করেছে, সেই সরকারকে বাদ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা চালু করার কথা বলছেন।

কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে যাঁরা আসেন, নির্বাচনকালে তাঁরা শুধু নির্বাচন নয়, অন্যান্য বিষয়েও যে সিদ্ধান্ত নেন; সেগুলোতে একটার সঙ্গে একটা মেলে না। তাঁদের কার্যক্রমে নিরপেক্ষতার প্রমাণ তাঁরা রাখতে পারেন না। তা ছাড়া এখন উচ্চতর আদালতই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রক্রিয়াটি বাতিল করেছেন।

কারণ আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবস্থানটা সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। সংবিধানের মূল চেতনার মধ্যে আছে– প্রজাতন্ত্রের সকল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা, যাঁরা জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। এই চেতনা অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, যাঁরা পাঁচ বছর সরকার পরিচালনা করলেন; তাঁদের নেতৃত্বেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। এটাই সারা পৃথিবীর রীতি। বাংলাদেশও এখন সেই রীতিতে এগিয়ে চলেছে। এটাও ঠিক, নির্বাচনকালে যে সরকারটি থাকবে, তার আকার ছোট হওয়া বাঞ্ছনীয়। তারা নির্বাচনকালে অর্থাৎ নির্বাচনের আগে থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত কোনো রকম নীতিনির্ধারণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। একই সঙ্গে এমন কোনো সিদ্ধান্তও তারা নেবে না, যা তাদের রুটিন দায়িত্বের বাইরে যায়। তাদের একটাই কাজ– দৈনন্দিন রুটিন কাজগুলো সম্পন্ন করা। আর নির্বাচনকালীন সরকারে কারা কারা থাকবেন– সেটি বিদ্যমান সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বাইরেও যেসব দলের যাঁরা নির্বাচিত সংসদ সদস্য রয়েছেন, তাঁদের মধ্য থেকেও নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আমার মনে হয়, এটা আমাদের সংবিধানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরাও যদি নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তর্ভুক্ত হন, যাঁরা রুটিন দায়িত্বের বাইরে কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না, সেটা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে মিলে যাবে। এতে দেশ পরিচালনার সব দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা– সংবিধানের এই মূল চেতনারও কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।

দ্বিতীয়ত, সুষ্ঠু, বস্তুনিষ্ঠ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা পালনের জন্য তাদের যে আইনকানুন ও নিয়মনীতি আছে, সেগুলো সরকারই নির্ধারণ করে। আরপিওর কথা যখন বলি, তখন এটাও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হয়। অতএব সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং তার সঙ্গে নির্বাচনী আচরণবিধি, আইনকানুন– এগুলোকে একসঙ্গেই দেখতে হবে। খণ্ডিতভাবে দেখার সুযোগ নেই।

তৃতীয়ত, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাই সব রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। হয়তো কোনো কারণে কখনও কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কিছু শর্ত আরোপ করে থাকে, যা আমরা অতীতেও দেখেছি। এটাও দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কিছু শর্ত আরোপ করে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আমার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো সব সময় গণতন্ত্রের কথাই বলে থাকে। সেই বিচারে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও সব সময় গণতন্ত্রের কথা বলবে– এটাই সবার প্রত্যাশা।

চতুর্থত, সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নতুন আরপিওকে ইতিবাচক বলেই আমি মনে করি। বিশেষ করে কেবল কেন্দ্রের ফল বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলেই মনে হয়েছে। কারণ একটি সংসদীয় আসনে অনেক কেন্দ্র থাকে। কিছু কিছু কেন্দ্রে যদি অনিয়ম-দুর্নীতি অথবা জোর করে ভোটকেন্দ্র দখল বা কোনো ধরনের অসৎ পন্থা অবলম্বনের অভিযোগ আসে, তখন ওই কেন্দ্রের ভোট বাতিল অথবা স্থগিত করা– এই ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আছে। কিন্তু একটি বা কয়েকটি কেন্দ্রের ভুল-ভ্রান্তি বা অনিয়মের জন্য পুরো আসনের ভোট বাতিল করে দেওয়া হলে সেটা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এমনকি দেশের বাইরের যাঁরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁদের কাছে মনে হতে পারে, পুরো আসনের ভোট যেহেতু বাতিল হয়েছে, সেহেতু সেখানে ভোট গ্রহণ সঠিক পদ্ধতিতে হয়নি। কিন্তু আমরা জানি, কখনও পুরো সংসদীয় এলাকার সব কেন্দ্রে একই রকম ঘটনা ঘটে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়।

আরেক দিকে, নির্বাচন চলাকালে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটির সঙ্গেও একমত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের যে স্বাধীনতা আছে, সেটা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

আলোকিত সিরাজগঞ্জ

সর্বশেষ: